shono
Advertisement
Hindenburg

নাৎসিদের গর্ব 'আকাশের রানি' হিন্ডেনবার্গ ধ্বংস হয় ৩৪ সেকেন্ডে! নেপথ্যে হিটলারেরই চক্রান্ত?

আজও এই দুর্ঘটনা ঘিরে রহস্যের অন্ত নেই।
Published By: Biswadip DeyPosted: 05:07 PM Feb 21, 2026Updated: 05:15 PM Feb 21, 2026

৬ মে ১৯৩৭। সন্ধে ৭টা। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে সুদূর দূরত্ব পেরিয়ে আমেরিকার নিউ জার্সিতে নেমে আসছে হিন্ডেনবার্গ। নাৎসিদের গর্ব 'আকাশের রানি'। বহু মানুষ জড়ো হয়েছে অতিকায় সেই এয়ারশিপের অবতরণ দেখতে! বিশ্বে এর চেয়ে বড় এয়ারশিপ আর ছিল না! দৈর্ঘ্যে যে ছিল টাইটানিকের থেকে মাত্র ২৪ মিটার ছোট। কিন্তু আচমকাই সব বিস্ময় বদলে গেল আতঙ্কে। অকস্মাৎ বিস্ফোরণের শব্দে সবাই তাকিয়ে দেখল আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে সেই স্বপ্নযান! মাত্র ৩৪ সেকেন্ডে, অর্থাৎ এক মিনিটেরও অর্ধেক সময়ের মধ্যেই ভস্মীভূত হয়ে যায় হিন্ডেনবার্গ। আজও এই দুর্ঘটনা ঘিরে রহস্যের অন্ত নেই। কিন্তু কেন এমন মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছিল হিন্ডেনবার্গের? বেশ কয়েকটি তত্ত্ব রয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে আলোড়ন ফেলে দেওয়া দাবি, হল এর নেপথ্যে ছিলেন খোদ অ্যাডলফ হিটলারই! সত্যিই তাই?

Advertisement

সে বিষয়ে কথা বলার আগে বোঝা দরকার এয়ারশিপ বস্তুটা ঠিক কী। বিমান তথা এরোপ্লেনের সঙ্গে এর বিস্তর ফারাক। প্রধান ফারাকটা মেজাজে! এয়ারশিপ তথা হাওয়াজাহাজের আকার বিমানের চেয়ে অনেক বড়। হিন্ডেনবার্গের আকারের কথা আগেই বলা হয়েছে। যাত্রীদের জন্য আলাদা আলাদা কামরা ছিল। ছিল বিরাট বড় ডাইনিং রুম, লেখাপড়ার ঘর... এমনকী ছিল অতিকায় লাউঞ্জও। যেখানে রাখা থাকত বিরাট পিয়ানো। যে কোনও এয়ারশিপই কিন্তু কমবেশি এমনই অতিকায়। এমন বিলাসব্যাসন থেকেই পরিষ্কার ভাড়াও ছিল চোখ কপালে তোলার মতোই। হিন্ডেনবার্গে সফর করতে হলে গুনতে ৭০০ ডলার! আজকের নিরিখে তা কয়েক গুণ বেশি মূল্যের। তাহলে ভারতীয় মুদ্রায় তা কত হিসেব কষতে বসলে আঁতকে উঠতে হবেই। বোঝাই যায়, তুমুল ধনী ছাড়া সেখানে ওঠা যেত না। হিন্ডেনবার্গে যাত্রীসংখ্যা ছিল ৩৬। অথচ ক্রু সদস্য ছিলেন ৬১ জন। এর থেকেই পরিষ্কার, যাত্রীস্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করাটাই ছিল প্রথম শর্ত।

টাইটানিকের থেকে মাত্র ২৪ মিটার ছোট ছিল হাইডেনবার্গ!

আজও এই দুর্ঘটনা ঘিরে রহস্যের অন্ত নেই। কিন্তু কেন এমন মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছিল হিন্ডেনবার্গের? বেশ কয়েকটি তত্ত্ব রয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে আলোড়ন ফেলে দেওয়া দাবি, হল এর নেপথ্যে ছিলেন খোদ অ্যাডলফ হিটলারই! সত্যিই তাই?

হেনরি গিফার্ড নামের এক ফরাসি ব্যক্তি ১৮৫২ সালে নির্মাণ করেছিলেন পৃথিবীর প্রথম এয়ারশিপ। গতিবেগ ছিল মোটামুটি ছয় মাইল প্রতি ঘণ্টা। যানটির আবিষ্কারক কাউন্ট ফার্দিনান্দ ভন জেপলিনের নামে অনেকে এই ধরনের আকাশযানকে 'জেপলিন' নামেও ডাকতেন। কয়েক দশকে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এয়ারশিপ। তবে নিশ্চিত ভাবেই সবচেয়ে বড় এয়ারশিপ হিন্ডেনবার্গই ছিল। এবার ফের তার গল্পে ফেরা যাক।

নিউ জার্সির লেকহার্স্টে অবতরণ করার সময় আগুন ধরে যায় হিন্ডেনবার্গের শরীরে। তখনও সে আকাশেই। এরপর ২০০ ফুট নিচে মাটিতে আছড়ে সেটি। দ্রুত আগুনে পুড়ে ধ্বংসও হয়ে যায়। সব মিলিয়ে প্রাণ হারান ৩৫ জন। বাকিরা প্রাণে বাঁচলেও জখম হয়েছিলেন সকলেই। কিন্তু কেন ধ্বংস হয়েছিল হিন্ডেনবার্গ? এই নিয়ে কম জলঘোলা হয়নি। যে তিনটি প্রধান সম্ভাবনা উঠে আসে, তাতে প্রথমেই হিটলারের নাম!

হুগো একনার প্রকাশ্যে হিটলারের বদনাম করতেন।

কিন্তু কেন হিটলার নাৎসিদের গর্ব হয়ে ওঠা অতিকায় আকাশযানকে ধ্বংস করতে চাইবেন? আসলে হুগো একনার নামের একজন ছিলেন হিন্ডেনবার্গের নির্মাতা সংস্থার মালিক। তিনি ছিলেন হিটলারের চক্ষুশূল। সেকালে জার্মানিতে বসে হিটলারের বিরুদ্ধাচরণ করা চাট্টিখানি ব্যাপার ছিল না। হুগো একনার প্রকাশ্যে হিটলারের বদনাম করতেন। এবং সেটা একেবারে তাঁর উত্থানের সময় থেকেই। যে কারণে ১৯৩৩ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করে গারদে পুরতে চেয়েছিলেন ফুয়েরার! তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রক্ষা না করলে জেলে যাওয়া আটকানো যেত না। প্রেসিডেন্টের নামটা এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি হিন্ডেনবার্গ। কৃতজ্ঞতা থেকেই ১৯৩৬ সালে নির্মিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় এয়ারশিপের নাম তাঁর নামে রাখাই মনস্থ করেন একনার। অথচ নাৎসিদের আবদার ছিল, হিটলারের নামেই রাখা হোক বিমানটির নাম। মোটেই সেই আবদারে কান দেননি একনার। স্বাভাবিক ভাবেই হিটলার ব্যাপারটা মোটেই ভালো ভাবে নেননি।

হুগো একনার

নিউ জার্সির লেকহার্স্টে অবতরণ করার সময় আগুন ধরে যায় হিন্ডেনবার্গের শরীরে। তখনও সে আকাশেই। এরপর ২০০ ফুট নিচে মাটিতে আছড়ে সেটি। দ্রুত আগুনে পুড়ে ধ্বংসও হয়ে যায়। সব মিলিয়ে প্রাণ হারান ৩৫ জন।

তার উপর নাৎসি বাহিনীর তত্ত্বাবধানে চাটুকারদেরই সুযোগ দেওয়া হয় বিমানটির কর্মী হিসেবে। পরবর্তী সময়ে সেটাও মেনে নেননি একনার। ফলে হিটলারের রাগের যথেষ্ট কারণ ছিল। কিন্তু ধ্বংসাবশেষে সন্দেহজনক এমন কিছু মেলেনি যা এই তত্ত্বকে মান্যতা দেয়। কোনও বোমা বা কোনও ধরনের বিস্ফোরকের চিহ্নমাত্র ছিল না। সুতরাং শেষপর্যন্ত যতই চাঞ্চল্যকর হোক, এই তত্ত্ব ধোপে টেকেনি।

এছাড়াও অন্য থিয়োরি ছিল। দুর্ঘটনার দিন আকাশ ছিল মেঘলা। হিন্ডেনবার্গের অবতরণের সময় তার উপরে বাজ পড়েই আগুন ধরে গিয়েছিল! এমনটাও মনে করেন অনেকে। কিন্তু এই দুই তত্ত্ব শেষপর্যন্ত স্বীকৃতি পায়নি। বরং এখন সবচেয়ে বেশি মান্যতা দেওয়া হয় তৃতীয় তত্ত্বকেই।

কী সেই তত্ত্ব? কয়েক দশকের গবেষণা থেকে উঠে এসেছে হাইড্রোজেন লিক করার বিষয়টি। মনে করা হয়, সেদিন এই বিপত্তির কারণেই মুহূর্তে আগুন লেগে গিয়েছিল। এমন অকস্মাৎ দুর্ঘটনাকে আর রোখার সময়টুকুও মেলেনি। চোখের সামনে ধূলিসাৎ হয়ে যায় হিন্ডেনবার্গ। এই দুর্ঘটনাই যেন এয়ারশিপের ভবিতব্য নির্ধারিত করে দিয়েছিল। অতিকায় বিলাসযান হয়েও দুর্ঘটনার আশঙ্কার মেঘে লুটোপুটি খেতে হয়েছিল এয়ারশিপকে। তুলনায় এরোপ্লেনে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে ভাড়া, সবই কম!

হাইড্রোজেন লিক করার ফলেই ঘটেছিল এই দুর্ঘটনা!

যত সময় গিয়েছে, ততই তাই পিছিয়ে পড়েছে এয়ারশিপ। কিন্তু সে থেকে গিয়েছে ইতিহাসে। ঢিমেতালের ভ্রমণে বিলাসের তুমুল আয়োজনের সেই আশ্চর্য যাত্রা আজ অতীতের গর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। কিন্তু গল্পকথার মতো রয়ে গিয়েছে হিন্ডেনবার্গ। রয়ে গিয়েছে আচমকা বিস্ফোরণে তার বিলীন হয়ে যাওয়ার করুণ আখ্যানও।

কয়েক দশকের গবেষণা থেকে উঠে এসেছে হাইড্রোজেন লিক করার বিষয়টি। মনে করা হয়, সেদিন এই বিপত্তির কারণেই মুহূর্তে আগুন লেগে গিয়েছিল। এমন অকস্মাৎ দুর্ঘটনাকে আর রোখার সময়টুকুও মেলেনি।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement