shono
Advertisement
Pakistan

বালোচিস্তান, কেপি থেকে পিওকে, ৪ ফ্রন্টে জ্বলছে জিন্নার 'লঙ্কাপুরী', বদলে যাবে পাকিস্তানের মানচিত্র?

বর্তমানে চারটি ফ্রন্টে আগুন জ্বলছে পাকিস্তানের। আগুনের শিখা এতটাই লেলিহান আকার নিয়েছে যে তা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শাহবাজ শরিফ, আসিম মুনিরদের।
Published By: Amit Kumar DasPosted: 05:37 PM Aug 12, 2026Updated: 12:23 AM Aug 13, 2026

সৌদি, তুরস্কের সঙ্গে ন্যাটোর মতো প্রতিরক্ষা চুক্তি, ইরান যুদ্ধে মধ্যস্থতা, ট্রাম্পে সঙ্গে দহররম মহরম, সব মিলিয়ে পাকিস্তানের বিদেশ নীতি এই মুহূর্তে বেশ ভালো বলেই ধরা হয়। তবে বিদেশ নীতি নজর কাড়লেও, ভিতর থেকে ক্ষতবিক্ষত জিন্নার লঙ্কা। রিপোর্ট বলছে, বর্তমানে চারটি ফ্রন্টে আগুন জ্বলছে পাকিস্তানের। আগুনের শিখা এতটাই লেলিহান আকার নিয়েছে যে তা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে শাহবাজ শরিফ, আসিম মুনিরদের।

Advertisement

পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ বালোচিস্তানের ৮৫ শতাংশ এলাকার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দাবি করছে বিএলএ (BLA) ও টিটিপি (TTP), খাইবার পাখতুনখোয়ায় চলছে উপজাতীয় বিদ্রোহ এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীর 'পিওকে' (PoK)-তে চলছে বিক্ষোভ। এই পরিস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি স্বীকার করেছেন যে রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। জোর গুঞ্জন চলছে, অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ক্ষমতা দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আইএমএফের দাবি, দেশে দুর্নীতি এতটাই গুরুতর আকার নিয়েছে যে শুধুমাত্র দুর্নীতির জেরে পাকিস্তানের জিডিপির ক্ষতি হয় ৫-৬ শতাংশ। সেনা এখানে সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী।

প্রথম ফ্রন্ট, বালোচিস্তান
পাকিস্তানের মোট চারটি প্রদেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রদেশ বালোচিস্তান (Balochistan)। গোটা দেশের ৪৪ শতাংশ অংশ এই প্রদেশের মধ্যে পড়ে। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের অংশ হয় বালোচিস্তান। এর ঠিক পর বালোচ নেতা মীর করিম খান বিদ্রোহ শুরু করেন। সেখান থেকেই অশান্তির আগুনে জ্বলছে এই অঞ্চল ১৯৫৮-৫৯, ১৯৬৩-৬৯, ১৯৭৩-৭৭ দফায় দফায় অস্ত্র হাতে তুলেছে বালোচ। তবে ২০০০ সালে 'বালোচ লিবারেশন আর্মি' গঠনের পর ২০০৫ থেকে বিদ্রোহ চরম আকার নিয়েছে। যা সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পাক সেনাকে। গেরিলা যুদ্ধে অত্যন্ত দক্ষ বিএলএ। পাকসেনা, ট্রেন এবং জনবহুল স্থানে আত্মঘাতী হামলা এদের প্রধান অস্ত্র। সংগঠনের দাবি ২০২৫ সালে তারা ৫২১ টির বেশি হামলা করেছে। যেখানে ১০৬০ জন পাকিস্তানি সেনার মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে কট্টরপন্থী সংগঠন টিটিপিও এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। রিপোর্ট বলছে জানুয়ারি থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত বালোচিস্তানে ৭৬৫টির বেশি হিংসাত্মক হামলা ঘটনা ঘটেছে। যেখানে ১৬০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বালোচদের রয়েছে নিজস্ব সেনা, নৌসেনা, বায়ুসেনা ও পুলিশ বাহিনী। যেখানে নিযুক্ত ৫ লক্ষের বেশি যোদ্ধা। বালোচিস্তানের জনগণ নিজেদের স্বাধীন হিসেবে ঘোষণা করেছে। ১১ আগস্ট দিনটিকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করেছে তাঁরা।

বালোচ বিদ্রোহী

দ্বিতীয় ফ্রন্ট, খাইবার পাখতুনখোয়া
আফগান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখোয়া বা কেপি পাকিস্তানের দ্বিতীয় ডুবন্ত সূর্য। উপজাতি অধ্যুষিত এই অঞ্চলের জনগণ পাকিস্তানের শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলতে মরিয়া। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP) নামের কট্টরপন্থী সংগঠন এখানে ব্যাপকভাবে সক্রিয়। যাদের লক্ষ্য পাকিস্তানের সরকারকে উপড়ে ফেলে ওই অঞ্চলে ইসলামি শাসন কায়েম করা। ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এখানে ৫৭৪টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। মৃত্যু হয়েছে ১১৯৬ জনের। এই অঞ্চলের সংঘাতের বীজও রোপণ করা হয়েছিল ইংরেজ জমানায়। ইতিহাস বলে, দেশভাগের সময় আফগান সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলকে এমনভাবে ভাগ করা হয়েছিল যার জেরে পশতুনরা দু'ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এই ডুরান্ড লাইনই সমস্যার মূল। পশতুনদের দাবি ছিল, তাঁদের আফগানিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।

এই অঞ্চলে কট্টরপন্থী সংগঠন টিটিপি-র উৎপত্তির নেপথ্যেও রয়েছে পাকিস্তানের হাত। ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত আফগানিস্তানে ঢুকলে আমেরিকার সাহায্যে পাকিস্তানই খাইবার পাখতুনখোয়ায় মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ দেয়। তারা ছিল তালিবান। সোভিয়েত চলে যাওয়ার পর এই তালিবান আমেরিকাকে দেশছাড়া করে। বর্তমানে তালিবানই আফগানিস্তানের শাসক। এদিকে খাইবার পাখতুনখোয়ার সমস্ত গোষ্ঠী মিলে তৈরি হয় টিটিপি। এরাই এখন হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের মাথা ব্যাথা। পরিস্থিতি এতটা গুরুতর যে, টিটিপির বিরুদ্ধে লড়তে আফগানিস্তানে হামলা চালাতে হচ্ছে পাকিস্তানকে। 

কট্টরপন্থী তেহরিক-ই-তালিবান

তৃতীয় ফ্রন্ট, পাক অধিকৃত কাশ্মীর
অধিকৃত কাশ্মীরে লাগাতার বঞ্চনা, সেনা অত্যাচারের প্রতিবাদে সোচ্চার সেখানকার নাগরিকরা। এই পরিস্থিতিতেই ২০২৩ সালে অধিকৃত কাশ্মীরে তৈরি হয় জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি (JAAC)। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার লক্ষ্যে লাগাতার আন্দোলন শুরু করেছে এই সংগঠন। শাহবাজ সরকার এদের উপর সীমাহীন নির্যাতন চালালেও কোনওভাবেই এদের দমানো যাচ্ছে না। জেএএসি-র অভিযোগ, পিওকে আসন সংখ্যা ৫৩টি, যার মধ্যে ১২টি আসন সংরক্ষিত। এই সংরক্ষণ দেশভাগের সময় যাঁরা ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে আসেন তাঁদের জন্য। তবে অভিযোগ, পিওকে ছেড়ে যারা মূল পাকিস্তানের বাসিন্দা হয়ে গিয়েছেন তাঁদেরও এখানে নির্বাচন লড়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এই ১২ আসনে রাজনৈতিক কারচুপি করছে পাকিস্তান সরকার। সংরক্ষণ তুলে দেওয়ার দাবির পাশাপাশি জেএএসি-র অভিযোগ, খাতায় কলমে পাকিস্তান এই অঞ্চলকে 'আজাদ জম্মু-কাশ্মীর' বললেও, বাস্তবে এর সুতো ইসলামাবাদের হাতে। পাক সরকার তাঁদের ব্রাত্য করে রেখেছে। চরম দুর্নীতি, অপশাসন, মূল্যবৃদ্ধি, দারিদ্র গিলে খাচ্ছে পিওকে-কে। সম্প্রতি এখানে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শতাধিক মৃত্যুর ঘটনা সামনে এসেছে। পাকিস্তানের থেকে মুক্তি চাইছে অধিকৃত কাশ্মীর। বিনিময়ে আরও রক্ত দিতেও প্রস্তুত তারা।

চতুর্থ ফ্রন্ট, আর্থিক দুর্দশা ও অপশাসন
পাকিস্তানের তিনটি প্রান্তে ভয়াবহ বিদ্রোহের পাশাপাশি গোটা পাকিস্তান জুড়ে অর্থনৈতিক সংকট চরম আকার নিয়েছে। যার ফল ভুগছে দেশের সাধারণ জনগণ। জায়গায় জায়গায় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ মাথাচাড়া দিয়েছে। রিপোর্ট বলছে, বর্তমানে পাকিস্তানের এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা দারিদ্রসীমার নিচে বাসকরে। গোটা দেশ ঋণে ডুবে রয়েছে। দেশটির আভ্যন্তরীণ ঋণ পাকিস্তানি মুদ্রায় ৫৮ লক্ষ কোটি এবং বিদেশি ঋণ ২৩ লক্ষ কোটি। মোট ঋণের পরিমাণ ৮১ লক্ষ কোটি। অর্থাৎ পাকিস্তানি টাকার তুলনায় দেশটির ঋণের পরিমাণ বেশি। দুর্দশা কাটাতে ২০২৪ সালে ২৪তম বার আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়েছে পাকিস্তান। ১ ডলার পিছু পাকিস্তানি মুদ্রার দাম ২৭৭। পেট্রোলের দাম ৩৩০ টাকা, ডিজেল ৩৮০ টাকা। চালের দাম ৪০০ টাকা প্রতি কিলো পেরিয়েছে। আইএমএফের দাবি, দেশে দুর্নীতি এতটাই গুরুতর আকার নিয়েছে যে শুধুমাত্র দুর্নীতির জেরে পাকিস্তানের জিডিপির ক্ষতি হয় ৫-৬ শতাংশ। সেনা এখানে সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ী। সাবান থেকে সোনা সবকিছু বিক্রি হয় সেনার মোড়কে। পরিস্থিতি যে পথে এগোচ্ছে তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করছে বিশেষজ্ঞমহল। পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি বলেন, পাকিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা বা ‘গভর্ন্যান্স মডেল’ মৌলিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতি ও ব্যাপক বেকারত্বের প্রসঙ্গ টেনে তিনি ক্ষমতাসীন অভিজাত শ্রেণি এবং হতাশ তরুণ প্রজন্মের মধ্যকার দূরত্বের কথা বলে। এমনকী সরকার পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও করেন তিনি। শোনা যাচ্ছে, যেভাবে গোটা দেশে বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তাতে আবারও সেনা অভ্যুত্থান হতে পারে পাকিস্তানে। তবে বিদ্রোহ যে ভয়াবহ আকার নিয়েছে তাতে পাকিস্তানের মানচিত্র ধরে রাখাই সেনা সর্বাধিনায়ক আসিম মুনিরের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement