জঙ্গি কার্যকলাপ নিয়ে কখনও বলা হয়, দেশে কোনও অস্তিত্ব নেই। আবার কখনও বলা, তাদের অবস্থান কোনওভাবেই সহ্য করা হবে না। সম্প্রতি নানা প্রান্তে উগ্রবাদীদের সক্রিয়তার খবরে আবারও বাংলাদেশের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। তা নিয়ে 'জিরো টলারেন্স' বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ১৫ জুলাই জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী বেশ জোরের সঙ্গে বলেছেন, উগ্রপন্থা ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তার সরকারের অবস্থান হবে ‘জিরো টলারেন্স’ অর্থাৎ কোনও ছাড় নয়। তবে এই চ্যালেঞ্জ শুধু একটি সরকার বা একটি রাজনৈতিক পক্ষের বিষয় নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশ কী পদক্ষেপ নেবে, তার উপর দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক সম্প্রীতির ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে।
আসলে বাংলাদেশের জন্য স্থিতিশীলতা শুধু রাজনৈতিক লক্ষ্য নয়। অর্থনৈতিকভাবেও সমানভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীরা বাজারের সম্ভাবনার পাশাপাশি দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, জননিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থাকেও গুরুত্ব দেন। এ প্রসঙ্গে বেশ কয়েকটি পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি ইউনুস সরকারের আমলে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বহুত্ববাদী ধারার প্রতিনিধিত্বকারী উদীচী ও ছায়ানটের মতো সংগঠনে উগ্রবাদীদের হামলার কথাও বলা হয়। এনিয়ে বিশিষ্টদের মত, সংস্কৃতি চর্চার পরিসর আরও ছোট করতে চেয়ে এমন মৌলবাদী আক্রমণ। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট, জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) দেশের ৬৩টি জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালায়। অল্প সময়ের মধ্যে তারা ৪৫০টিরও বেশি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এসব হামলার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এই ঘটনা দেশে সংঘবদ্ধ জঙ্গিবাদের বড় ধরনের উত্থানের ইঙ্গিত দেয়।
গত বছর ঢাকার সংস্কৃতি চর্চা কেন্দ্র ছায়ানটে হামলা, তছনছ সমস্ত বাদ্যযন্ত্র
ওই কাণ্ডের এক দশক পর, ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার অভিজাত পল্লি গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে ক্ষতিকর সন্ত্রাসী ঘটনা হয়ে ওঠে। হামলায় বেশিরভাগ বিদেশি নাগরিক-সহ ২০ জন পণবন্দি এবং দুই পুলিশ আধিকারিক নিহত হন। বাংলাদেশ যখন বাণিজ্য, বিদেশি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পথে এগোচ্ছিল তখন এই হামলা দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের আঘাত হানে। সহিংস উগ্রবাদের অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক সময় তাৎক্ষণিক মানবিক ক্ষতির মতো চোখে পড়ে না। সন্ত্রাসী হামলা ও উগ্রবাদী তৎপরতা অনিশ্চয়তা তৈরি করে, নিরাপত্তা ব্যয় বাড়ায় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয়। আর এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। শুধু কূটনৈতিক মিশন কিংবা গণমাধ্যম নয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর চাপের মুখে পড়েছে।
২০১৬ সালে ঢাকার অভিজাত হোলি আর্টিসান ক্যাফেতে জঙ্গি হামলা, ফাইল ছবি
বাংলাদেশে এখনও জনপরিসরে উগ্রবাদী বক্তব্য ও প্রচারের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বলা হচ্ছে, এই চ্যালেঞ্জ এখন ডিজিটাল জগতেও ছড়িয়ে পড়েছে। উগ্রবাদী প্রচার এখন আর শুধু গোপন সংগঠন বা সরাসরি নেটওয়ার্কের উপর নির্ভর করে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী খুব দ্রুত ভুল তথ্য, উসকানিমূলক বার্তা এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে দিতে পারে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের প্রভাব যে কতটা, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
ড. মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মৌলবাদীরা কার্যত সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। সেসময় আন্তর্জাতিক স্তরে কড়া সমালোচনার মুখে পড়ে তিনি জানিয়েছিলেন, ইসলামপন্থী উগ্রবাদীদের ফিরে আসার কোনও সুযোগ নেই। নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা তাদের অগ্রাধিকার। তবে সমালোচক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে যে প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সমন্বয়ের দুর্বলতা উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলিকে আরও সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাফ জানালেন, তাঁর সরকারের অবস্থান এ বিষয়ে 'জিরো টলারেন্স'।
