shono
Advertisement
Hilsa Fish

লাগামহীন শিকারে ছোট হচ্ছে পদ্মার ইলিশ! উদ্বেগে বাংলাদেশ, মনখারাপ মাছপ্রেমীদের

নদীতে অতিরিক্ত মাছ ধরার ফলেই বড় মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়। এর বিপরীতে সাগরের ইলিশ কোনও বাধা ছাড়াই তাদের জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে, যা তাদের যথাযথ বৃদ্ধি ও প্রজননে সহায়ক হয়। এছাড়াও সাগরে দূষণের মাত্রা কম হওয়াও এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে।
Published By: Kishore GhoshPosted: 06:58 PM Apr 10, 2026Updated: 07:15 PM Apr 10, 2026

'মৎস্য মারিব, খাইব সুখে', বাঙালির সেদিন বুঝি আর নেই। এমনকী রুপোলি শস্য ইলিশ মাছ নিয়েও আশঙ্কা বাড়ছে। নেপথ্য নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে লাগামহীন শিকার ইলিশের। এর ফলেই বাঙালির প্রিয় স্বাদের গড় আকার ছোট হয়ে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে ডিম উৎপাদনও। এর জন্য মূলত দায়ী খোকা ইলিশ ও মা ইলিশের অতিরিক্ত শিকার এবং নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার। ঢাকায় খোকা ইলিশ সংরক্ষণ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে এমনটাই জানালেন মৎস্য বিশেষজ্ঞ মহম্মদ আশরাফুল আলম। বাংলাদেশে ৭-১৩ এপ্রিল জাটকা (খোকা ইলিশ) সংরক্ষণ সপ্তাহ ২০২৬ পালিত হচ্ছে। এই উপলক্ষে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল মিলনায়তনে এক সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এই সপ্তাহের প্রতিপাদ্য ছিল 'জাটকা ধরা থামাই যদি, ইলিশে ভরবে সাগর-নদী'।

Advertisement

সেমিনারে বলা হয়, নদীতে অতিরিক্ত মাছ ধরার ফলেই বড় মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কমে যায়। এর বিপরীতে সাগরের ইলিশ কোনও বাধা ছাড়াই তাদের জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে, যা তাদের যথাযথ বৃদ্ধি ও প্রজননে সহায়ক হয়। এছাড়াও সাগরে দূষণের মাত্রা কম হওয়াও এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক তথা কর্মকর্তা মহম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, অঞ্চলভেদে ইলিশের আকারের ক্ষেত্রে একটি তারতম্য লক্ষ্য করা যায়, যা মূলত পরিবেশগত অবস্থা এবং ইলিশের 'পরিযান' বা মাইগ্রেশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য ৩৫ দশমিক ৭ সেন্টিমিটারে স্থির ছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৭ সেন্টিমিটার এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৭ দশমিক ২ সেন্টিমিটার হয়। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে এই ধারার পরিবর্তন ঘটে। ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কমে ৩৬ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৪ দশমিক ৭ সেন্টিমিটার এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও হ্রাস পেয়ে ৩৪ দশমিক ৩ সেন্টিমিটারে দাঁড়ায়।

আলম জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য সামগ্রিকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে মানুষের হস্তক্ষেপ, পরিবেশগত পরিবর্তন, জলের গুণমান হ্রাস এবং নদীতে খাদ্যের অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, কক্সবাজারের মতো এলাকাগুলোতে মাছ সমুদ্রেই তাদের পূর্ণ জীবনচক্র সম্পন্ন করতে পারে। ফলে তারা অধিকতর পরিপক্বতা লাভ করে। তাদের গড় দৈর্ঘ্য ও ওজন বেশি হয়। দেশের সবচেয়ে বড় আকারের ইলিশ কক্সবাজার অঞ্চলে পাওয়া যায়, যার গড় দৈর্ঘ্য ৩৮ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার এবং গড় ওজন ৭৮০ গ্রাম। অন্যদিকে, সবচেয়ে ছোট আকারের ইলিশ পাওয়া যায় রাজশাহী অঞ্চলে। গড় দৈর্ঘ্য ২৯ সেন্টিমিটার এবং গড় ওজন ৩৪০ গ্রাম।

মৎস্য বিশেষজ্ঞ যোগ করেন, এখানকার মাছগুলো মূলত নদী ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, যেখানে তাদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ তুলনামূলক কম অনুকূল। অবৈধ জালের ব্যবহারের কারণে বড় মাছগুলো নিয়মিত ধরা পড়ছে। ফলে জলাশয়ে শুধু ছোট মাছই অবশিষ্ট থাকছে। তিনি আরও জানান, দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে বেছে বেছে বড় মাছ শিকারের ফলে নদীতে বড় আকৃতির ইলিশের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। সমুদ্র থেকে নদীতে আসার পথে উপকূলীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত মৎস্য আহরণের ফলে পরিপক্ব ইলিশের সংখ্যা আরও হ্রাস পাচ্ছে। তিনি বলেন, বংশবিস্তারের আগেই অনেক মাছ ধরা পড়ে যাওয়ার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া নদীতে ক্রমবর্ধমান দূষণ এবং খাদ্যের অভাবও ইলিশের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য সামগ্রিকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে মানুষের হস্তক্ষেপ, পরিবেশগত পরিবর্তন, জলের গুণমান হ্রাস এবং নদীতে খাদ্যের অভাব রয়েছে।

গত কয়েক বছরে ইলিশের ডিম উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছে। ২০১৫ সালে যা ছিল পাঁচ লাখ ৯৯ হাজার ৭২০ কেজি, তা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০২১ সালে সাত লাখ ৮৬ হাজার ৩১৪ কেজি, ২০২৩ সালে আট লাখ পাঁচ হাজার ৫১৫ কেজি এবং ২০২৪ সালে আট লাখ ১১ হাজার ৭১১ কেজিতে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালে এই পরিমাণ ৮ লাখ ৮৪ হাজার ৮০২ কেজিতে পৌঁছায়। তবে ২০২৫ সালে মিশ্র প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছে। একটি হিসাবে আট লাখ ৮৪ হাজার ৮০২ কেজি উৎপাদনের মাধ্যমে বৃদ্ধির আভাস পাওয়া গেলেও অন্য একটি হিসেবে তা সাত লাখ ৯১ হাজার ৫৬৪ কেজিতে নেমে আসার আশঙ্কা করা হয়েছে।

আলম আরও জানান, ডিম উৎপাদনের এই সাম্প্রতিক পতনের পেছনে পূর্বোক্ত কারণগুলিই দায়ী। কারণ বড় ও পরিপক্ব প্রজননক্ষম মাছের সংখ্যা কমে গেলে তা সরাসরি ইলিশের বংশবিস্তার ও ডিম উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলে। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষিমন্ত্রী মহম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, জাটকা উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিতে এবং ইলিশের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় আরও সক্রিয় হতে হবে। বিশেষ করে ইলিশের ডিম থেকে পোনা তৈরির প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিতভাবে নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন।

মন্ত্রী আরও বলেন, দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ইলিশের স্বতন্ত্র স্বাদ ও গুণমান বজায় রেখে কীভাবে এর উৎপাদন বাড়ানো যায়, বিজ্ঞানীদের সেই পথ খুঁজে বের করতে হবে। ইলিশের সংকটকে একটি জাতীয় সমস্যা হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য এই মাছ সহজলভ্য করতে উৎপাদন বৃদ্ধির কোনও বিকল্প নেই। বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, জাটকা ধরা সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব হলে ইলিশের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, যা দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে বড় ধরনের অবদান রাখবে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement