১৮ মাস ক্ষমতায় থাকাকালীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ডঃ মহম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলিকে সুবিধা পাইয়ে দিয়েছিলেন, এই অভিযোগে নতুন করে শোরগোল শুরু হয়েছে। এতে আর্থিক অস্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কাঠগড়ায় করছাড়, শর্ত লঙ্ঘন ও কর সংক্রান্ত বিরোধ গ্রামীণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে আর্থিক স্বচ্ছতা ও অন্যায়ভাবে সুবিধা প্রদান। তদন্তে উঠে এসেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ড. মহম্মদ ইউনুসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন সুবিধা পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা অন্তত ৭টি মামলা থেকে অব্যাহতি, ই-ওয়ালেট লাইসেন্স অনুমোদন এবং জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স প্রাপ্তি - যেগুলি অস্বাভাবিক দ্রুততায় সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ।
২০২৪ সালে মাত্র একমাসের ছাত্র-জনতার প্রবল গণ-অভ্যুত্থানের মুখে টানা ১৬ বছর ক্ষমতাসীন আওয়ামি লিগ সরকারের পতন ঘটে। এর আগেরদিন অর্থাৎ ৪ আগস্ট 'সংবাদ প্রতিদিন'-এ 'এক্সক্লুসিভ' রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল যে, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হচ্ছে। পরেরদিন দুপুরেই ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে জীবন বাঁচাতে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়। আন্দোলনের নেতাদের ডাকে সাড়া দিয়ে প্রফেসর ড. মহম্মদ ইউনুস ৮ আগস্ট প্যারিস থেকে দেশে ফিরে অন্তর্বর্তী সরকারের হাল ধরেন। সেসময় তাঁকে ঘিরে আশার বীজ বুনেছিল জাতি। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন তাঁর ‘জাদুর ছোঁয়ায়’ বিশ্বের দুয়ারে আরও উজ্জ্বল হবে বাংলাদেশের মুখ, বাড়বে মানুষের মর্যাদা, খুলে যাবে দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ সম্ভাবনার দুয়ার।
ইউনুস দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে পর্যন্ত দেশের মানুষের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। সংখ্যালঘু নির্যাতন-সহ একাধিক ইস্যুতে দেশের মর্যাদাহানি হলেও নিজের স্বার্থ ষোলো আনাই হাসিল করেছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ইউনুস! অন্যতম গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয়। সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের মেয়াদে দেশে এই একটিমাত্র বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি গ্রামীণ ট্রাস্টের একটি উদ্যোগ। আর এই গ্রামীণ ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা মহম্মদ ইউনুস। আগে থেকে ২২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন বছর বছর ধরে ঝুলে থাকলেও গ্রামীণ বিশ্ববিদ্যালয় আবেদন করার ৩ মাসের মধ্যেই পেয়ে যায় অনুমোদন। ওই সময়ে ইউনুস (Muhammad Yunus) ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। নিজের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে আরও অনেক সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ। বিশেষ করে গ্রামীণ ব্যাঙ্ককে ৫ বছরের জন্য আয়কর অব্যাহতি দেন, যাতে সরকার অন্তত এক হাজার কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। গ্রামীণ কল্যাণ ট্রাস্টের এক হাজার ৪৩ কোটি টাকা ফাঁকির পাশাপাশি ৬৬৬ কোটি টাকা কর মকুবের মতো ব্যাপক সুবিধাও নিয়েছেন তিনি।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো ইউনুসের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত। আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে প্রধান উপদেষ্টার শপথ গ্রহণের আগে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সরে দাঁড়ালেও দায়িত্ব ছাড়ার পর আবার সেসব প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ফলে ক্ষমতার আলোয় আসার সঙ্গে সঙ্গে এই সুবিধাগুলো নেওয়ার মধ্য দিয়ে কার্যত তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলেই মত দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, তাঁদের সঙ্গে যাতে জনগণ, দেশের স্বার্থের সংঘাত না ঘটে সে জন্য শপথ নিতে হয়। শুধু সরকার না, সরকারি অনেক পদে বসার শর্তই থাকে যে, কোনও লাভজনক পদে থাকলে তা ছেড়ে দিতে হবে। মহম্মদ ইউনুস রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে ছিলেন। সেখানে বসে তিনি তাঁর স্বার্থে যেসব কর্মকাণ্ড করেছেন, সেগুলো নিয়ে রাজনৈতিকভাবে বেশ সমালোচনা হয়েছে, এখনও হচ্ছে।
প্রায় ১৮ মাস ধরে চলা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও জনজীবনে বড় ধরনের অবনতি ঘটে। ইউনুস শাসনামলে দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিত্য ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। মব সন্ত্রাস, রাজনৈতিক হিংসা, হত্যা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও ক্রমবর্ধমান লুটপাট একই সঙ্গে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাও উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছয়। খেলাপি ঋণ, বৈদেশিক ঋণ, সুদের হার ও বিনিয়োগ-স্থবিরতা বেড়েছে। বহু কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, আর উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করেছে। বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলো থমকে যায়, বিদেশি চুক্তিগুলো বিতর্ক তৈরি করে এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
