'অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে...'। কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা নিঃসন্দেহে অপরিসীম দূরদর্শিতার নজির। পৃথিবী জুড়ে সেই আঁধার গাঢ় থেকে আরও গাঢ় হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি ঘটনা ফের সেই আঁধারের দিকটাই দেখিয়ে দিল। দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা ও নদিয়া জেলা সীমান্ত সংলগ্ন কুষ্টিয়ায় ইসলাম ধর্ম বিকৃতির অভিযোগ তুলে এক পীরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা সামনে এসেছে। এরপর তাঁর আস্তানা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় মুসল্লি ও এলাকাবাসী। জানা যায়, শনিবার পীর শামিম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর ও তাঁর অনুসারীদের বেধড়ক মারধর করা হয়। পীর শামিমকে গুরুতর আহত অবস্থায় দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল ৪টে নাগাদ তাঁর মৃত্যু হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পীর শামিম রেজা এলাকায় 'ভণ্ড' পীর বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি নিজেকে কখনও আল্লাহ, কখনও নবী বা ভগবান দাবি করতেন। এসব কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছিল। সম্প্রতি শামিম রেজার ইসলাম বিরোধী বক্তব্য ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। অভিযোগ, তথাকথিত পীর শামিম নিজস্ব ব্যাখ্যায় ধর্মীয় বিধান তুলে ধরে অনুসারীদের বিভ্রান্ত করছিলেন। তিনি নমাজ, রোজা, হজ ও জাকাত-সহ ইসলামের মৌলিক ইবাদতগুলোকে অস্বীকার করে ভিন্নধর্মী মতবাদ প্রচার করতেন। এমনকি অনুসারীদের হজ পালনের জন্য মক্কায় না গিয়ে স্থানীয় একটি বাঁশ বাগানের দরবারে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিতেন। এছাড়াও তাঁর অনুগামীদের দাফনের সময় প্রচলিত ইসলামি নিয়ম উপেক্ষা করে ঢাকঢোল বাজানো, ‘হরে শামিম’ ধ্বনি দেওয়া এবং বিভিন্ন অস্বাভাবিক আচার পালনের অভিযোগ ছিল।
শনিবার সকালে তাঁর কর্মকাণ্ড নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের আগেই ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। জানা যায়, ফিলিপনগর গ্রামের মৃত জেছের আলি মাস্টারের ছেলে শামিম রেজা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে এলাকায় ফিরে এসে একটি আস্তানা গড়ে তোলেন এবং ধীরে ধীরে বিতর্কিত ধর্মীয় কার্যক্রম শুরু করেন। এর আগেও ২০২১ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত-সহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। সেসময় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তিনি পুনরায় একই ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ জানান, ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী শামিম রেজার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার এহেন ঘটনা নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় গর্জে উঠেছেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন। ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেছেন, 'কুষ্টিয়ায় সুফি সাধক শামীম আল জাহাঙ্গিরকে আজ পিটিয়ে হত্যা করেছে। ধর্মীয় হত্যা! আমার বিশ্বাস আপনার বিশ্বাসের সঙ্গে মিলছে না—একারণে হত্যা! ভদ্রলোক উচ্চশিক্ষিত ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করা। শিক্ষকতা করতেন। সুফিধারার মানুষ—নিজস্ব বোধবুদ্ধি, বিশ্বাস ও আকিদা অনুযায়ী ধর্ম পালন করতেন। নিজের ধর্ম বিশ্বাস প্রচারও করতেন। তার অনেক অনুসারী ও ভক্ত ছিল। এটা ধর্মীয় হত্যা! পুলিশের উপস্থিতিতেই!'
