shono
Advertisement
Khaleda Zia

ইন্দিরার পুত্রবধূর পথে হেঁটেই কি রাজনীতিতে নামবেন খালেদার পুত্রবধূ? জোর জল্পনা বাংলাদেশে

কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আলাদা দুই দেশ। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও আলাদা। কিন্তু কোথাও গিয়ে যেন একই সুতোয় বাঁধা দুই চরিত্র! প্রথমজন ইন্দিরাপুত্র সঞ্জয় গান্ধীর জায়া মানেকা গান্ধী। দ্বিতীয়জন খালেদার কনিষ্ঠপুত্র আরাফত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান।
Published By: Saurav NandiPosted: 04:01 PM Jan 19, 2026Updated: 08:47 PM Jan 19, 2026

ইন্দিরা গান্ধীর পুত্রবধূর পথেই কি হাঁটতে চলেছেন খালেদা জিয়ার (Khaleda Zia)পুত্রবধূ? বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপাতত এই জল্পনাই ঘুরপাক খাচ্ছে।

Advertisement

কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আলাদা দুই দেশ। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও আলাদা। কিন্তু কোথাও গিয়ে যেন একই সুতোয় বাঁধা দুই চরিত্র! প্রথমজন ইন্দিরাপুত্র সঞ্জয় গান্ধীর জায়া মানেকা গান্ধী। দ্বিতীয়জন খালেদার কনিষ্ঠপুত্র আরাফত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান। এই দুই নারীর জীবনের গল্পে কাকতালীয় মিল। দু'জনেই প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের বধূ। দু'জনেই অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়েছেন। কিন্তু জীবনযুদ্ধে দু'জনের পথ চলার ধরন ভিন্ন। টিকে থাকার লড়াইয়ে মানেকা বেছে নিয়েছেন রাজনীতির মঞ্চ। অন্যদিকে শামিলা থেকেছেন রাজনীতির অলিন্দ থেকে অনেকটা দূরে। অন্তরালে!

(বাঁ দিকে) মানেকা গান্ধী। সৈয়দা শামিলা রহমান (ডান দিকে)।

দীর্ঘদিন পর আবার প্রকাশ্যে এসেছেন শামিলাকে। কিছু দিন আগে জিয়াউর রহমানের জীবনভিত্তিক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে তাঁর নীরব উপস্থিতি অনেকেরই নজর কেড়েছে। সেখানে তাঁকে ঘিরে কোনও নিরাপত্তাবেষ্টনী ছিল না। ছিল না কোনও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনও। আর পাঁচ জন সাধারণ দর্শকের মতোই প্রদর্শনীতে ঘুরে ঘুরে আলোকচিত্র দেখেছেন শামিলা। সেই সময় খালেদার জীবন সংগ্রামের একের পর এক ছবি দেখতে দেখতে তাঁর চোখেমুখে যে বিষাদ ধরা পড়েছিল, তা আশপাশে থাকা কারও নজর এড়ায়নি। গত শুক্রবার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার প্রাঙ্গণে সদ্যপ্রয়াত খালেদার স্মরণসভায় বিএনপি প্রধান তারেক রহমান এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গেও দেখা গিয়েছিল শামিলাকে।

২০০৬ সালে খালেদার প্রধানমন্ত্রিত্বের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কোকো। কার্যত তার পরেই প্রচারের আলো থেকে দূরে সরে যান শামিলা। দেড় বছর পর কোকো প্যারোলে মুক্তি পেলে চিকিৎসার জন্য তাঁকে প্রথমে তাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে এবং তার পর মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালা লামপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। শামিলাও স্বামীর সঙ্গে দেশ ছেড়েছিলেন। ২০১৫ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় কোকোর। তার পরেই আবার দেশে ফেরেন শামিলা। সেই সময় খালেদার সঙ্গেই নিভৃতজীবন কাটাতেন তিনি। ২০১৭ সালে খালেদা গ্রেপ্তার হন। শেখ হাসিনার সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এর পর আবার দেশ ছাড়েন শামিলা। কখনও মালয়েশিয়া, কখনও লন্ডনে থেকেছেন দুই কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে। মাঝে মাঝে বাংলাদেশে এসেছেন। খালেদার সঙ্গে দেখা করেছেন। আবার ফিরে গিয়েছেন। কিন্তু কখনওই পাকাপাকি ভাবে বাংলাদেশে থেকে সেখানকার রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েননি তিনি।

মানেকা গান্ধী এবং তাঁর পুত্র বরুণ গান্ধী। ছবি: সংগৃহীত।

কিন্তু মানেকা হেঁটেছিলেন সম্পূর্ণ অন্য পথে। সঞ্জয়ের মৃত্যুর পর ইন্দিরার সঙ্গে মতবিরোধের জেরে গান্ধী পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়। বিবাদের কারণও ছিল রাজনৈতিক! শোনা যায়, সঞ্জয়ের মৃত্যুর পর মানেকা রাজনীতিতে নামতে চেয়েছিলেন। দলীয় রাজনীতিতে স্বামীর উত্তরসূরি হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইন্দিরা তা চাননি। তার কিছু কারণও ছিল। গান্ধী পরিবারের অন্দরের খবর সম্পর্কে ওয়াকিবহাল অনেকের দাবি, ইন্দিরার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও লখনউয়ে একটি দলীয় কর্মসূচিতে গিয়েছিলেন মানেকা। যা পছন্দ হয়নি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর। তা নিয়েই দু'জনের মধ্যে বিবাদ এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ছেড়ে ছেলে বরুণ গান্ধীকে নিয়ে বেরিয়ে যান মানেকা। বেছে নেন ভিন্ন রাজনৈতিক জীবন। কংগ্রেসের ছায়া থেকে বেরিয়ে যোগ দেন বিরোধী দল বিজেপিতে। পরে সাংসদ এবং কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও হন।

মানেকা যেখানে জীবনযুদ্ধের লড়াইকে রাজনীতির মঞ্চে নিয়ে গিয়েছেন, সেখানে শামিলা বেছে নিয়েছেন নীরবতা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কি নিভৃতবাস কাটিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নামবেন শামিলা? এই জল্পনাই জোরালো হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে।

গান্ধী পরিবারের অন্দরের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেছেন মানেকা। রাজনীতির পাশাপাশি পরিবেশ এবং প্রাণী অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর পুত্র বরুণও রাজনীতিতে এসেছেন। বিজেপির সাংসদ হয়েছেন। মানেকা যেখানে জীবনযুদ্ধের লড়াইকে রাজনীতির মঞ্চে নিয়ে গিয়েছেন, সেখানে শামিলা বেছে নিয়েছেন নীরবতা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কি নিভৃতবাস কাটিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে নামবেন শামিলা? এই জল্পনাই জোরালো হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে।

ওপার বাংলার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মত, শামিলার রাজনীতিতে নামার সম্ভাবনা ক্ষিণ হলেও, এই জল্পনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিএনপি-র একটি অংশও মনে করেন, শামিলার ত্যাগ এবং বিশ্বাসযোগ্যতা তাঁকে ভবিষ্যতে জাতীয় রাজনীতিতে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তা ছাড়া এই জল্পনা নতুনও নয়। হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যখন আবার বিএনপি-র উত্থান-পর্ব শুরু হয়, তখন দলের হাল শক্ত হাতে ধরার মতো সেই ভাবে কেউ ছিলেন না। তারেকও লন্ডনে ছিলেন। সেখান থেকেই দল পরিচালনা করতেন। তখনও তারেক-জায়া জুবায়দা রহমান এবং শামিলার রাজনীতিতে নামা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছিল বিএনপি-র অন্দরে। যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

গত প্রায় তিন দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির চালিকাশক্তি মহিলারাই। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হাসিনা বা খালেদাকে ঘিরে সে দেশের রাজনীতি আবর্তিত ছিল এতদিন। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনও নারী চরিত্রের উত্থান হলে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই বলেই মত বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের। তাঁদের বক্তব্য, বিএনপি-র রাজনীতিও নয়ের দশক থেকে নারী নেতৃত্বে নির্ভরশীল। খালেদারও রাজনীতিতে আসার কথা ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে তিনি দল এবং দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। যদিও বিএনপি-র অন্দরে বর্তমানে তেমন কোনও শূন্যতা নেই। তারেকও দেশে ফিরেছেন। তিনিই এখন দল পরিচালনা করছেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভবত তিনিই প্রধানমন্ত্রী মুখ। সম্ভবত কারণ, এখনও এ বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা নেই।

সৈয়দা শামিলা রহমানের সঙ্গে খালেদা জিয়া। ছবি: সংগৃহীত।

তবে অন্য অভিমতও রয়েছে। অনেকের মত, বর্তমানে বাংলাদেশের যা পরিস্থিতি, তাতে সেখানকার সাধারণ মানুষ একেবারে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কাউকেই মসনদে দেখতে চাইছেন। কিন্তু তারেকের বিরুদ্ধে অতীতে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। যদিও সেই সব মামলা থেকে তিনি এখন মুক্ত। তা সত্ত্বেও ভোট যত এগোবে, তত তারেকের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে কাঁটাছেড়া শুরু হবে। জামাত বা এনসিপি-র মতো বিরোধীরা তারেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকেই হাতিয়ার করতে পারে। সে দিক দিয়ে শামিলা একেবারে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির।

তা সত্ত্বেও এখনই তারেক এবং শামিলাকে একই বন্ধনীকে রাখতে রাজি নন বাংলাদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। তাঁদের যুক্তি, জিয়াউরের উত্তরসূরি হিসাবে বিএনপি-র বড় অংশ তারেককেই বেছে নেবেন। শামিলাকে নয়। তা ছাড়া দেশে প্রত্যাবর্তনের পর তারেককে ঘিরে বাংলাদেশে যে উন্মাদনা দেখা গিয়েছে সাধারণ জনতার মধ্যে, তারেকও তাঁর ভাষণে ‘আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’ বলে যে বিশ্বাস তৈরি করেছেন, আপাতত সেটাকেই ভোটের ময়দানে কাজে লাগাতে চায় বিএনপি। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে শামিলা রাজনীতিতে নামলেও স্রেফ দলের একজন সৈনিক হিসাবেই থাকবেন। যদিও এই বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করছে পারিবারিক সিদ্ধান্তের উপর।

তবে জিয়া পরিবারের ঘনিষ্ঠদের মত, এর সম্ভাবনাও কম। কারণ, শামিলা ভিন্ন চরিত্র। সব সময় পর্দার আড়ালে থাকতেই পছন্দ করেন। মানেকা এবং শামিলার গল্পে মিল থাকতেই পারে এবং তা নিছক কাকতালীয়। কিন্তু দু'জনের দৃষ্টিভঙ্গিতে অনেক ফারাক। এবং তা-ই সবচেয়ে বেশি প্রকট।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement