কাজ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে। তিস্তা বাজার ও মেলি বাজারের মাঝখানে হিমালয়ের গর্ভ থেকে পাথর-মাটি কেটে প্রায় ৪.১ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ পথ তৈরির কাজ শেষ হল চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে। সেই সঙ্গে সম্পন্ন হল সেবক-রংপো রেল প্রকল্পের কঠিনতম কাজ। কারণ, হিমালয়ের এই এলাকার ভূগর্ভস্থ পাথর-মাটি এতটা শৈশব অবস্থায় রয়েছে যে ডিনামাইট বিস্ফোরণে বিরাট বিপর্যয়ের সম্ভাবনা ছিল।
তাই ঝুঁকি না নিয়ে প্রকল্পের মুখ্য ডিজাইনার আরমান্দো ক্যাপেলান প্রায় ছয়শো ইঞ্জিনিয়ার এবং কয়েক হাজার শ্রমিক নিয়ে গাঁইতি, বেলচার সাহায্যে ভূগর্ভে দু'দিক থেকে মাটি-পাথর সরিয়ে সুড়ঙ্গ পথ তৈরির অভিযানে নামেন। দিনরাত পরিশ্রমের পর অবশেষে সুড়ঙ্গের দুই প্রান্ত, পি-১ এবং পি-২ ও মিলে যেতে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন তাঁরা।
এই শ্রমিকদের হাতেই তৈরি হয়েছে রেলপথ ও টানেল। ছবি-সংগৃহীত
প্রকল্পের বরাত প্রাপ্ত সংস্থা ইরকনের প্রোজেক্ট অ্যাডভাইজার মহিন্দর সিং জানান, এখানে সুড়ঙ্গ তৈরির কাজ অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণ, নরম মাটিতে বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব হয়নি। পুরোটা খনন করতে হয়েছে। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে কর্মীরা অসম্ভব পরিশ্রম করেছেন। রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের মধ্যে সংযোগকারী ৪৪.৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সেবক-রংপো রেল প্রকল্পটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ৪১.৫ কিলোমিটার এবং সিকিমে ৩.৫ কিলোমিটার রয়েছে। এই রেলপথ চিন সীমান্ত সংলগ্ন হিমালয়ের রাজ্যটিকে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করবে। ইতিমধ্যে প্রকল্পের প্রায় ৮৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
প্রকল্পটিতে রয়েছে ১৪টি টানেল, ২২টি সেতু এবং সেবক, রিয়াং, তিস্তা বাজার, মেল্লি ও রংপো নিয়ে মোট ৫টি স্টেশন। তিস্তা বাজারে ভূগর্ভে স্টেশন-সহ বেশিরভাগ স্টেশন তৈরির কাজ প্রায় শেষ। এছাড়াও ১৯টি সেতু নির্মাণ কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। বাকি স্টেশন এবং সেতুগুলির কাজ চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে শেষ হবে বলে রেল সূত্রে জানা গিয়েছে। ইতিমধ্যে ৮ নম্বর টানেলের কাজ শেষ হয়েছে। ১০ নম্বর টানেলের কাজ চলছে।
৮ নম্বর টানেল তৈরির কাজে ব্যস্ত শ্রমিক, ইঞ্জিনিয়াররা।
উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের এক কর্তা জানান, ৪৪.৯৮ কিলোমিটার ব্রড-গেজ লাইনের বেশিরভাগ টানেলের কাজ প্রায় সম্পূর্ণ। মাত্র একটি বাকি আছে। ব্যালাস্টলেস ট্র্যাক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্র্যাক স্থাপনের কাজ ক্রমশ এগিয়ে চলেছে। রেল সূত্রে খবর, রংপো-সেবক প্রকল্পের মোট ব্যয় ১১,৯৭৩ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পটিতে ৮,৩৫৮ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবর্ষের জন্য ২,৯৪০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ২০০৯ সালে প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়।
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, মোট ৪৫ কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে প্রায় ৩৮ কিলোমিটার টানেলের ভিতর দিয়ে যাবে। ভবিষ্যতে এই রেলপথ গ্যাংটক পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। ইরকনের প্রোজেক্ট অ্যাডভাইজার জানান, প্রকল্পের কাজ ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করে সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। ট্রেন চলাচল শুরু হলে মাত্র ১ ঘন্টার মধ্যে সেবক থেকে রংপো পৌঁছে যাওয়া সম্ভব হবে। এখন সড়কপথে লাগে প্রায় ৫ ঘন্টা।
