একটা সময় লেবার রুম ছিল। তাতে লাল আলোও জ্বলত ঘনঘন। গোটা দশেক 'নর্মাল ডেলিভারি' হত। সেই ইতিহাস ছাব্বিশে ফিরে এল হোমিওপ্যাথি ক্যাম্পাসে। প্রায় ৪৮ বছর পর ফিরল রূপকথা। হাওড়ার মহেশ ভট্টাচার্য হোমিওপ্যাথি কলেজে (Mahesh Bhattacharya Homoeopathic college)। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হোমিওপ্যাথি ডাক্তার, নার্স ও ইন্টার্নরা সন্তান প্রসব করালেন। লাল আলো জ্বলল ওটিতে। জরায়ু থেকে বের করা হল প্লাসেন্টা। মা ও সন্তান দু'জনেই সুস্থ। এখন হাওড়া হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে।
ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ। ৩৩ বছরের রিয়া গিরি টোটোতে এসে পৌঁছন মহেশ ভট্টাচার্য হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ওই সময় ডিউটিতে ছিলেন ডা. বিমান রায়, ইন্টার্ন ডাক্তার ডা. সরফরাজ হোসেন আনসারি এবং ডা. মিজানুর রহমান। তাঁরা পরীক্ষা করে দেখেন ফিটাসের 'ক্রাউনিং' অর্থাৎ বাচ্চার মাথা বেরিয়ে এসেছে। ডা. বিমান রায় এক মুহূর্ত দেরি না করে ইন্টার্নদের সহযোগিতায় কাপড় ঘিরে টোটোর মধ্যেই সদ্যোজাতের প্রসব করান। এরপর এমার্জেন্সিতে প্লাসেন্টা ডেলিভারি সম্পন্ন হয়। এবং তা কোনওরকম লেবার রুম সেট আপ ছাড়াই। খবর পেয়ে সেখানে আসেন স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান ডা. ইন্দ্রজিৎ সামন্ত। ডা. বিমান রায় জানালেন, "মা ও শিশু দুজনেই সুস্থ আছেন।" বাচ্চার ওজন হয় ২ কেজি ৯০০ গ্রাম। প্রসবের পর মাকে অক্সিটোসিন ইঞ্জেকশন দিতে হয়। হাসপাতালে না থাকায় তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে, মাকে আর্নিকা দেওয়া হয়েছে।
জানা গিয়েছে, প্রসূতির বাড়ি হাওড়া ডুমুরজলা এলাকায়। স্বামী গোপাল গিরি টোটোচালক। তিনি জানান, "হাওড়া হাসপাতালে রিয়ার কার্ড করা ছিল। মঙ্গলবার প্রসব বেদনা ওঠায় টোটো করে হাওড়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল রিয়াকে। রাস্তাতেই প্রবল যন্ত্রণা শুরু হয়। বাধ্য হয়েই হোমিওপ্যাথি কলেজে নিয়ে যাই।" বিমান জানালেন, ওই সময় প্রসব না করালে সন্তান ও মা, দু'জনেরই জীবন সংকট হত। তাই ঝুঁকি না নিয়ে টোটোতেই প্রসব করিয়ে মা ও সন্তানকে এমার্জেন্সিতে নিয়ে গিয়ে প্লাসেন্টা বের করা হয়। জানা গিয়েছে, ১৯৬৫ সালে তৈরি মহেশ ভট্টাচার্য হোমিওপ্যাথি কলেজে ১৯৭৮ সালে শেষ স্বাভাবিক প্রসব করানো হয়েছিল। তারপর আবার এই ২০২৬। অর্থাৎ প্রায় ৪৮ বছর পর প্রসব ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। এখন মহেশ ভট্টাচার্য হাসপাতাল থেকেই পুত্র সন্তানের বার্থ সার্টিফিকেট নিতে হবে গিরি পরিবারকে। এই ঘটনাকে মাইলফলক বলে মনে করছেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. হিমাংশু হাইত। তিনি জানালেন, "প্রতিভা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র পরিকাঠামোর অভাবে তাকে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। আজ থেকে নতুন আশায় বুক বাঁধবে হোমিওপ্যাথিক সমাজ। দিশা দেখাবে মহেশ ভট্টাচার্য হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল।"
খুশি ডি এন দে হোমিওপ্যাথি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ডা. অখিলেশ খাঁ। তিনি জানালেন, "আটের দশকের শুরুতে ছাত্রাবস্থায় তাঁরা হোমিওপ্যাথি কলেজে লেবার রুমে দৈনিক দশ থেকে বারোটা নর্মাল ডেলিভারি দেখেছেন। '৮৩ সাল পর্যন্ত চলেছে এই পরম্পরা। কিন্তু তার পরই মডার্ন মেডিসিন লবির চাপে, সরকারি সদিচ্ছার অভাবে লেবার রুম বন্ধ হয়ে যায় হোমিওপ্যাথি কলেজে।"
