শিবপ্রসাদ দত্ত: পায়ে পায়ে বিপদ। যাকে নিয়ে গবেষণা, সেই বরফের নিচে যেন লুকিয়ে থাকে মৃত্যুর হাতছানি! মৃত্যুকে হার মানাতে পারেনি শুভজিৎ। খবরটা জানার পরে সত্যিই খুব খারাপ লেগেছে। আবার এটাও ঠিক, গবেষণার কাজে ওই জায়গায় যাওয়ার সুযোগই তো লাখে একজন পায়। ভেবে গর্ববোধ হচ্ছে আমার জেলারই শুভজিৎ সেই সুযোগ পেয়েছিল। মৃত্যুকে হারিয়ে ফিরতে পারলে ভাল হত ঠিকই, কিন্তু ও আমাদের সবার মুখ উজ্জ্বল করে বীরের মতো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে।
[বরফের দেশে তরুণ গবেষকের মৃত্যু, কীভাবে ফিরবে দেহ?]
আসলে এখান থেকে বা ছবি দেখে বোঝা যাবে না ওখানকার অবস্থা। ২০০৯-এ কুমেরু অভিযানে ২৯তম অভিযাত্রী দলের সদস্য হিসেবে আন্টার্কটিকা গিয়ে বুঝেছি, পদে পদে মৃত্যু কাকে বলে। প্রায় ১৪মাস সেখানে কাটিয়েছিলাম। শুভজিৎ যে গবেষণার কাজে আন্টার্কটিকা গিয়েছিল সেখানে দু’ধরনের দল থাকে। একদল বিজ্ঞানী। আর এক দল পরিকাঠামো গড়া বা দেখভালের কাজে। আমি এই পরিকাঠামো সংক্রান্ত কাজেই যাই। ওখানকার হেলিপ্যাড, রাস্তা এমনকী দেশের আর একটি বেস ক্যাম্প ভারতী-২ গড়ার কাজে আমি সহায়তা করি।
শুভজিৎ যে মৈত্রী ক্যাম্পে থেকে কাজ করছিল সেখান থেকে এই ক্যাম্পের দূরত্ব প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন হয়ে যেতে হয় কুমেরু। জলপথে প্রায় সাড়ে ছ’হাজার কিলোমিটার পথ। সময় লাগে সপ্তাহ দু’য়েক। কিন্তু জলপথে যতদূর পর্যন্ত জাহাজ যায় সেখান থেকে ভারতের বেস ক্যাম্প কমবেশি একশো কিলোমিটার।
ওই পথটি একেবারেই বরফ ঢাকা। প্রায় আশি সেন্টিমিটার পুরু বরফের স্তূপ। দীর্ঘদিন বরফ জমতে জমতে তার রঙ নীল হয়ে যায়। এই পুরু আস্তরন বরফে চলে লোহার ট্র্যাক-চেন লাগানো পিস্টনবুল্লি নামে গাড়ি। যার গতিবেগ ঘন্টায় ১২ থেকে ১৩ কিলোমিটার। ধূ-ধূ বরফ প্রান্তরে ঘন্টায় পাঁচ থেকে সাতশো কিলোমিটার বেগে চলে তুষার ঝড়। এর গতিবেগ আরও বেড়ে গেলে খালি চোখে কিছুই দেখা যায় না। সেইসময় জেনারেটর কোনও কারণে বন্ধ হয়ে গেলে সমূহ বিপদ। তাই আবহাওয়া খারাপ থাকলে ওই জেনারেটর স্হল থেকে দড়ি বেঁধে কাজ করতে হয়। ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি এই গরমের তিন মাস সেখানকার তাপমাত্রা থাকে মাইনাস পাঁচ থেকে এগারো ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এছাড়া, বাকি ন’মাস শীতের সময় মাইনাস ৩০ থেকে ৮০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। তবে রেডিয়টের সাহায্যে বেস ক্যাম্পে স্বাভাবিক তাপমাত্রা ২৩-২৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড রাখা যায়। এইরকম তাপমাত্রা থাকে ওই গাড়িতেও।
[‘দয়া করে দাঙ্গা বাধাবেন না’, কাতর আরজি আসানসোলের পুত্রহারা ইমামের]
তাই কাজ করতে-করতে বরফের আস্তরনে সারা শরীর জমে গেলে ওই গাড়িতে আশ্রয় নিয়ে শরীরকে খানিকটা উষ্ণ করে আবার কাজে নামেন সকলে। তবে এই গাড়িও মাঝে মধ্যে বরফে আটকে যায়। তখন বেঁচে থাকার রসদ পিঠে টেনেই নিয়ে যেত হয় ক্যাম্পে। এই সবই একেবারে মানিয়ে নিয়েছিল শুভজিৎ। কিন্তু মৃত্যুকে হার মানাতে পারল না সে। পারলে খুব ভাল হত।
(শুভজিতের স্মৃতিচারণায় কুমেরু অভিযাত্রী দলের প্রাক্তন সদস্য শিবপ্রসাদ দত্ত।)
The post ‘শুভজিৎ আমাদের গর্ব, ফিরে এলে খুব ভাল লাগত’ appeared first on Sangbad Pratidin.
