shono
Advertisement
Purulia

'প্রেমে পড়া বারণ...', ভালোবেসে কুল হারাবে! মেয়েদের স্কুল পাঠানো বন্ধ বিরহোড়দের

অন্যদের সঙ্গে সংমিশ্রণে 'খাঁটি' বিরহোড়দের সংখ্যা কমবে, আরও বিপন্ন হয়ে পড়বে তারা, এই আশঙ্কা তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাঁদের।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 04:32 PM Jul 07, 2026Updated: 04:32 PM Jul 07, 2026

'প্রেমে পড়া বারণ/ কারণে অকারণ...'। লগ্নজিতা চক্রবর্তীর সুরেলা অথচ কিছুটা ভারী কণ্ঠে গাওয়া এই গানে যেন অভিমানের সুর। ৬ বছর পরও এই গান ঝড় তোলে 'হৃদয়ে অবাধ্য প্রেম'-এ ভেসে যাওয়া মনে। এ যে অব্যক্ত ভালোবাসা আর মনের ভিতর লুকিয়ে থাকা অভিমানেরই ছায়া! কিন্তু গানের মতো বাস্তবেও যদি 'প্রেমে পড়া বারণ' কথাটা সত্যি হয়ে যায়? মানে প্রেম নিয়ে ফরমান জারি হয়? আর তার জেরে বন্ধ হয়ে যায় মেয়েদের স্কুলে যাওয়া? তবে তো গান প্রত্যাখ্যানই করতে হয়!

Advertisement

হ্যাঁ, এটাই যে বাস্তব। পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় ও সেঁওয়াতি রেঞ্জ ছুঁয়ে থাকা বাঘমুন্ডি, ঝালদা ১, ঝালদা ২ ও বলরামপুরে লুপ্তপ্রায় জনজাতি বিরহোড় প্রজাতির বাস। গ্রামের মেয়েরা স্রেফ প্রেমে পড়ে কুল হারানোর আশঙ্কায় তাদের বাবা-মায়েরা আর তাদের স্কুলে পাঠাতে নারাজ। ভয় হয়, পাছে প্রেম-ভালোবাসায় জড়িয়ে অন্য জাতে বিয়ে করে! এবং তাতে এই প্রান্তিক লুপ্তপ্রায় জনজাতির সংখ্যা আরও কমে যায়! কারণ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলায় এই বিরহোড় জনজাতির সংখ্যা মেরেকেটে ৬০০। এই বঙ্গে বসতি স্থাপন করার মতো পুরুলিয়া ছাড়া আর কোথাও নেই। বাঘমুন্ডির ভূপতিপল্লি, বাড়েরিয়া, ঝালদা ১ ব্লকের মহুলটাড়, ঝালদা ২-র ডাকাই ও বলরামপুরের বেড়ষা মিলিয়ে প্রায় ১৪০ টি পরিবারের বাস।

পুরুলিয়ার ঝালদা ১ নম্বর ব্লকের মহুলটাড় গ্রামের বিরহোড় জনজাতি। ছবি: অমিতলাল সিং দেও

গত ২-৩ বছরে তিন বিরহোড় গ্রামের ৪ কিশোরী ভিন জাতের ছেলের সঙ্গে প্রেমে জড়িয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে শুধু গ্রামছাড়া নয়, একেবারে কুল ছাড়া হয়ে গিয়েছে। তাই সম্প্রতি পুরুলিয়া জেলা পুলিশের খাটিয়া বৈঠক জনসংযোগ কর্মসূচিতে ঝালদা ১ ব্লকের হেঁসাহাতু গ্রাম পঞ্চায়েতের বিরহোড় গ্রাম মহুলটাড়ের বাসিন্দারা এমন উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে মন চায় না, বলেছিলেন তাঁরা। কিন্তু পুলিশ করবে কী? তারা যে পড়েছেন বড় ফাঁপরে। এমন তো কোন আইন নেই যে ভিন জাতের ছেলে-মেয়েকে বিয়ে করা যাবে না। ফলে বিরহোড়দের সমস্যা সামলাতে হিমশি দশা প্রশাসনেরও।

অরণ্য নির্ভর, শিকার করা, জঙ্গলের কাছাকাছি ও নেশায় ডুবে থাকা এই জনজাতি মূলত 'প্রোটো অস্ট্রোলয়েড' জাতিভুক্ত। কেন্দ্রীয় সরকারের আওতাভুক্ত পিভিটিজি (পার্টিকুলারলি ভালনারেবেল ট্রাইবাল গ্ৰুপ) রয়েছে। তাই ওই জনজাতির মেয়েরা যাতে কোনওভাবেই স্কুলছুট না হয় সেই কারণে আরও সুসংহতভাবে কেন্দ্র-রাজ্য মিলিয়ে প্রকল্প রূপায়িত করতে চায় প্রশাসন। পুরুলিয়া সমাজ কল্যাণ দপ্তরের আধিকারিক সুদীপ্ত সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘বিষয়টা আমরা জানি। কেন্দ্র-রাজ্য প্রকল্প রূপায়ণের মধ্য দিয়ে তারা যাতে কোনওভাবেই স্কুলছুট না হয় সেটা ভীষণই গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে।"

জঙ্গল নির্ভর বিরহোড় জনজাতি, পুরুলিয়ার ঝালদা ১ নম্বর ব্লকের মহুলটাড় গ্রামে। ছবি: অমিতলাল সিং দেও

২০২৪ সালের শেষের দিকের কথা। বাঘমুন্ডির বিরহোড় গ্রাম ভূপতিপল্লির বাসিন্দা পদ্মাবতী শিকারি। ওই বাঘমুন্ডির ধসকা পন্ডিত রঘুনাথ মুর্মু আবাসিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করত সে। হঠাৎ করেই মাধ্যমিকের আগে ঘরছাড়া। নানান জায়গায় খুঁজে বহু বুঝিয়ে তাকে ঘরে আনা হয়েছিল। মাধ্যমিক দিয়ে আবার ঘর ছেড়ে দেয় সে। মাধ্যমিক পাশ করার পরেও আর ঘরে ফেরেনি। পরে পরিবার জানতে পারে, অন্য জাতের ছেলের সঙ্গে বিয়ে করে ঘর-সংসার করছে। পদ্মাবতী মা মুইগি শিকারি বলেন, ‘‘মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর যে ঘর ছেড়েছে আর ফিরে আসেনি। শুনেছি বিয়ে করেছে। কোথায় থাকে, কী করে কিছুই জানি না। আমাদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখে না।" বছর দুই-তিন আগে বাঘমুন্ডির বাড়েরিয়া গ্রামের আদরি শিকারিও অন্য জাতের ছেলেকে বিয়ে করে গ্রাম ছাড়ে। বছরখানেক আগে ওই গ্রামের রোহিনী শিকারি ও স্কুলে পড়ার সময় প্রেমে পড়ে ঠিকানা হয়েছিল হোম।

[caption id="attachment_1240029" align="aligncenter" width="900"]

পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডির বিরহোড় গ্রাম ভূপতি পল্লি।
ছবি: অমিতলাল সিং দেও[/caption]

এমন উদাহরণ রয়েছে ঝালদা দু'নম্বর ব্লকের ডাকাই গ্রামেও। মহুলটাড় গ্রামের বাসিন্দা, নলকূপের গাড়িতে কাজ করা কার্তিক শিকারির কথায়, ‘‘আমাদের এখন খুব ভয় লাগে মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে। প্রেম-ভালোবাসা করে কোথায় চলে যাবে। তখন আমাদের কুল, জাত, মর্যাদা সব হারাব। আমাদের গ্রামে এমন ঘটনা না ঘটলেও ভূপতিপল্লি, বাড়েরিয়া, ডাকাইতে হয়েছে। তাই এখন আর আমাদের মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে মন চায় না।" তাই তিনি তার দ্বিতীয় মেয়ে পূজাকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়েই ১৮ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে ঝাড়খণ্ডে পাঠিয়ে দেন। নীলকমল শিকারির বড় মেয়ে গীতা শিকারি ছিল হেঁসাহাতু হাইস্কুলের ছাত্রী। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার পর কার্যত পরিবারের চাপে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় স্কুলের গণ্ডি।

এবছর বিরহোড় জনজাতির কাঞ্চন শিকারি প্রথম মাধ্যমিক পাশ করেছে। তার কথায়, ‘‘আমাদের জনজাতি একেবারেই লুপ্তপ্রায়। এমন ঘটনা যদি ঘটতে থাকে তাহলে বিয়ে করার জন্য বিরহোড় মেয়ের সংখ্যাও কমে যেতে পারে। আমাদের নিজস্বতা হারাবে। জনসংখ্যা কমবে। এসব কিছুই আসলে হচ্ছে অভাব থেকে। কাজ না থাকার কারণে। ফলে সরকার, প্রশাসনকে এসব নিয়ে ভাবতেই হবে।" আদিবাসী ও লোকসংস্কৃতি গবেষক জলধর কর্মকার বলেন, ‘‘বিরহোড় জনজাতি ভীষণই লাজুক। তাদের সঙ্গে অন্য জনজাতির কোনও লেনদেন অতীতে সেভাবে ছিল না। কিন্তু এখন সংযোগে আসছে। কিন্তু এর জন্য স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে, লেখাপড়া হবে না, তা ঠিক নয়। ওই জনজাতিকে সচেতন করতে সকলকেই আরও এগিয়ে আসতে হবে।"

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement