সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: এক পলকে দেখলে মনে হবে ঘাস আর পদ্ম যেন জোট বেঁধেছে। বুথের পাশে তৃণমূল-বিজেপির ক্যাম্প অফিসের দূরত্বের ফারাক মাত্র দু’হাত। আর সেই দুই শিবির থেকেই চলছে বুট (ছোলা) ভেজা দেওয়া। ভোটাররাও একেবারে নিশ্চিন্ত মনে ভোট দিয়ে দুই শিবির থেকেই শাল পাতায় বা সাদা পলিথিনে বুট ভেজা নিয়ে বাডি় যাচ্ছেন। ঠিক তেমনই দলের ঝান্ডা হাতে দুই শিবিরের কর্মীরাও ভোট নিয়ে আলাপচারিতায় ব্যস্ত। ঘটনাস্থল পুরুলিয়ার বলরামপুর ব্লকের একদা মাও মুক্তাঞ্চল ঘাটবেড়া-কেরোয়ার পাহাড়ঘেরা তিলাই গ্রাম।
এই ঘাটবেড়া-কেরোয়া অঞ্চলেরই কুমারডি গ্রাম। সেই কুমারডি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রের পাশে বিজেপি ও তৃণমূলের একাধিক পতাকায় সাজানো-গোছানো দুই শিবির। তৃণমূলের শিবির থেকে চলছে সাদা প্লাস্টিকে সেউ-বোঁদে দেওয়া। আর বিজেপির ক্যাম্প অফিসে ভোটাররা পাচ্ছেন ভেজা বুট। এখানে আবার বিজেপি-তৃণমূল কর্মীরাই নিজেদের খাওয়ার জন্য একে অপরের শিবিরে যাওয়া আসা করে সেউ-বোঁদে ও বুট ভেজা নিয়ে আসছেন।
[ভোটের যুদ্ধ শেষ, বেলাশেষে একপাতে খিচুড়ি খেলেন যুযুধান তৃণমূল-বিজেপি কর্মীরা]
বলরামপুরের কুমারডি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে সিপিএম প্রার্থী দিতে পারেনি। এখানে প্রার্থী বলতে রয়েছে শাসকদল তৃণমূল। বিজেপি ও ঝাড়খণ্ড দিশম পার্টি। ঝাড়খণ্ডের দলটি এই বুথে পোলিং এজেন্ট দিতে না পারায় ওই বুথে বিজেপি ও তৃণমূলের এজেন্ট যথাক্রমে কালীপদ কুমার ও ভরত কুমার একটি ভোটার তালিকার কাগজ দেখেই তাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করছেন।এইভাবেই অতীতের মাও মুক্তাঞ্চলে নজিরবিহীন রাজনৈতিক সৌজন্যতায় একেবারে উৎসবের আবহে পঞ্চায়েত ভোট দিলেন ভোটাররা। জঙ্গলমহলে যেমন ভাবে টুসু, করম, মকর পালিত হয় তেমনই সোমবার ‘ভোট পরব’ পার হল এই এলাকায়। তাই সকাল সাতটা থেকেই মহিলারা নতুন শাড়ি জড়িয়ে ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়ালেন। যেমন রঘুনাথডি গ্রাম থেকে কুমারডি বুথে দলবেঁধে মহিলারা এসেছিলেন ভোট দিতে।
[ভোটে নেই আরাবুল, অশান্ত ভাঙড়ে কেমন হল গণতন্ত্রের উৎসব?]
তৃণমূল ক্যাম্প অফিস থেকে সেউ-বোঁদে নেওয়ার ফাঁকে টুসু মান্ডি, সোমবারি মান্ডি, অষ্টমী মান্ডি বলেন, “ভোটটাও হামদের পরব বটে। তাই ভোট দিতে অ্যালে হামরা নতুন শাড়ি গায়ে দিই। এবার সেউ-বোঁদে নিয়ে ঘর যাব।” একেবারে পাহাড় কোলে থাকা তিলাই বুথে কুমারীকানন থেকে দু’কিমি রাস্তা হেঁটে ভোট দিতে এসেছিলেন সাবিত্রী শবর, সুলেখা শবর, বেহুলা শবর। তাদের কথায়,“ ভোটটা দিতে তো একটু কষ্ট করতেই হবে। এটা আমাদের অধিকার।” তাই এই গ্রামের ৭২ বছরের বৃদ্ধ জ্যোতি রাজোয়াড় বাসিভাত আর কাঁচা পেঁয়াজ খেয়েই ভোট দিতে চলে আসেন। ঘাটবেড়া-কেরোয়া হাইস্কু্লের দু’নম্বর বুথেও প্রায় ঘণ্টাখানেকের বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন ষাটোর্ধ্ব সুশীলা হেমব্রম। বেলা বারোটাতেও বেড়সা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বুথে ছিল মহিলাদের লম্বা লাইন।
তিলাই গ্রামে বুথের পাশে তৃণমূলের ক্যাম্প অফিস সামলানো সদানন্দ কুমার বলেন, “আমাদের এখানে কোন অশান্তি নেই। আমরা সকলে মিলে মিশেই নিজ-নিজ ক্যাম্প অফিস সামলাচ্ছি। দেখছেনই তো সবাই উৎসবের মেজাজে ভোট দিচ্ছেন।” আর এই উৎসবের ভোটে সেউ-বোঁদে বা বুট ভেজা বাড়তি পাওনা। তাই তিলাই গ্রামেরই গেরুয়া শিবিরের ক্যাম্প সামলানো দেবু রাজোয়াড় বলেন, “আমরা গ্রামের মানুষ। সবাইকে একসঙ্গে থাকতে হয়। ভোটের জন্য ঝুট-ঝামেলা করে কি হবে? সাধারণ মানুষ যাকে চাইবে সেই আসবে। তাই আমরা ভোটের দিনে সেউ-বোঁদে আর বুট ভেজায় একটা উৎসবই পালন করলাম।” তাই বিকাল পাঁচটাতেও ঘাটবেড়া-কেরোয়া হাইস্কুলের বুথ বা লাগোয়া গেড়ুয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের পড়ুডি বুথেও ছিল পরবের মতই ভোট দিতে উপচে পড়া ভিড়। লম্বা লাইন।
ছবি- অমিত সিং দেও
[‘রাজা’ ও ‘বাদশা’ গোষ্ঠীর বিবাদে উত্তপ্ত কুমলাই, মার তৃণমূল প্রার্থীকে]
The post সৌহার্দ্যের ভোট, তিলাই গ্রামে ছোলা, বোঁদে বিতরণ তৃণমূল-বিজেপি সদস্যদের appeared first on Sangbad Pratidin.
