সামগ্রিক ভাবে রাজ্যে চায়ের উৎপাদন বাড়লেও দার্জিলিংয়ের আকাশে অশনিসংকেত। উদ্বেগজনকভাবে কমেছে 'শ্যাম্পেন অব টি' নামে বিশ্বে সমাদৃত দার্জিলিং চায়ের (Darjeeling Tea) উৎপাদন। একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে লোকসান। ওই চক্রব্যূহে আটকে অন্তত ২৫ চা বাগান বিক্রির পথে! কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে খদ্দের মিলছে না।
সদ্য প্রকাশিত ভারতীয় চা পর্ষদের রিপোর্ট সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত রাজ্যের চা উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও একই সময়ে দার্জিলিং চা উৎপাদন ৭ শতাংশ কমেছে। শুধু তাই নয়, অর্থোডক্স ও সিটিসি চা দেশের বাজারে দাম না পেলেও কেনিয়া এবং নেপাল থেকে চায়ের আমদানি বেড়েছে। চা পর্ষদের ওই রিপোর্ট ঘিরে রীতিমতো আতঙ্কের ছায়া চা বণিকসভা মহলে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত রাজ্যের দার্জিলিং পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সে চা উৎপাদন হয়েছে ৪১১.১৮ মিলিয়ন কেজি। ২০২৪ সালের উৎপাদন ছিল ৩৮২.২০ মিলিয়ন কেজি।
চা পর্ষদের দাবি, উৎপাদনে ২০২৪ সালের তুলনায় উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু ২০২৩ সালের তুলনায় উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। সেটার জন্য মূলত প্রতিকূল আবহাওয়া দায়ী। ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের বড় চা বাগানের উৎপাদন ছিল ৪৩৩.৫৪ মিলিয়ন কেজি। এদিকে দার্জিলিং চা গত বছরের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ৫.৩০ মিলিয়ন কেজি উৎপাদন হয়েছে। ২০২৪ সালে একই সময়ে উৎপাদন ছিল ৫.৭১ মিলিয়ন কেজি। ২০২৩ সালে ছিল ৬.০১ মিলিয়ন কেজি। ২০২৫ সালে ডুয়ার্সে চা উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল ৫ শতাংশ এবং তরাইয়ে ১২ শতাংশ। উল্টো ছবি দার্জিলিং চায়ের। এখানে উৎপাদন কমেছে ৭ শতাংশ।
গত দু'দশকে প্রায় ২০ শতাংশ বৃষ্টি কমেছে দার্জিলিং পাহাড়ে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের জেরে দার্জিলিং চায়ের উৎপাদন গত সাড়ে পাচ দশকে উদ্বেগজনক ভাবে কমেছে।
কেন এমন পরিস্থিতি? নর্থবেঙ্গল টি প্রডিউসার ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গিয়েছে, পাহাড়ের আবহাওয়া দ্রুত পাল্টাচ্ছে। কমছে বৃষ্টিপাত। গত দু'দশকে প্রায় ২০ শতাংশ বৃষ্টি কমেছে দার্জিলিং পাহাড়ে। আবহাওয়ার পরিবর্তনের জেরে দার্জিলিং চায়ের উৎপাদন গত সাড়ে পাচ দশকে উদ্বেগজনক ভাবে কমেছে। ১৯৭০ সালে উৎপাদন ছিল ১৪ মিলিয়ন কেজি, সেখান থেকে ২০২৪ সালে তা নেমে দাঁড়ায় ৫.৫১ মিলিয়ন কেজিতে। এর পাশাপাশি ২০২৫ সালের প্রথম ছয়মাসে আফ্রিকা মহাদেশ ও নেপাল থেকে নিম্নমানের চা আমদানি বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। ওই চা ঐতিহ্যবাহী দার্জিলিং চায়ের ব্র্যান্ড নেমে বাজারে চলছে। এর ফলে জিআই ট্যাগ প্রাপ্ত দার্জিলিং চা বিশ্বের দরবারে গৌরব হারাচ্ছে।
প্রতীকী ছবি।
দার্জিলিং পাহাড়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দু'মাস 'ফার্স্ট ফ্লাশ'-এর পাতা তোলা হয়। ওই পাতা থেকে অন্তত দুই মিলিয়ন কেজি চা তৈরি হয়। এটা মোট উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ। ইন্ডিয়ান প্ল্যানটার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গিয়েছে, এটাই মরশুমের সেরা দার্জিলিং চা। সেটা জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডে রপ্তানি হয়। কিন্তু সময়মতো বৃষ্টির অভাবে পাতা মিলছে না। ওই কারণে ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে চা উৎপাদন পুরোপুরি মার খাচ্ছে। নর্থবেঙ্গল টি প্রডিউসার ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি সতীশ মিত্রুকা বলেন, "একে আবহাওয়ার জন্য উৎপাদন মার খাচ্ছে। তার উপর আফ্রিকা মহাদেশ ও নেপাল থেকে নিম্নমানের চা আমদানি বৃদ্ধি এবং সেই চা দার্জিলিং চা নামে কম দামে বাজারে চলায় লোকসান বাড়ছে।" কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান স্মল টি গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিজয়গোপাল চক্রবর্তী বলেন, "পরিস্থিতি খুবই খারাপ। এভাবে চলতে থাকলে চা শিল্প ধ্বংস হতে বাধ্য।"
