‘সিলভার নিডেল হোয়াইট টি’ উৎপাদন করে চিনের ফুজিয়ানকে টেক্কা দিয়েছে দার্জিলিং। প্রকৃতির রোষানলে সে-ই চা শিল্প চরম সংকটে। অনিয়মিত বৃষ্টি এবং উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে উদ্বেগজনকভাবে কমছে উৎপাদন। দার্জিলিং পাহাড়ের প্রায় ৭ হাজার ফুট উঁচু এলাকার চা বাগানের পাতা নয়, কচি কুঁড়ি থেকে তৈরি হয় অত্যন্ত সুগন্ধি ‘সিলভার নিডেল হোয়াইট টি’। দিনে একশো গ্রামের বেশি ওই কুঁড়ি শ্রমিকরা তুলতে পারেন না। ১ কেজি চায়ের উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় কমপক্ষে ২৫ হাজার টাকা। সেটা বিদেশের বাজারে ৫০ হাজার টাকা কেজি দামে বিক্রি হয়ে থেকে। ওই সুগন্ধি চা পাতা তৈরির জন্য মার্চ থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত গাছের একদম উপরের রূপালি রোমযুক্ত কচি কুঁড়ি তুলে সংগ্রহ করা হয়। সেগুলি শুকিয়ে চা তৈরি করা হয়। চিনে ‘সিলভার নিডেল হোয়াইট টি’ পরিচিত 'বাই হাও ইয়িন ঝেন' নামে। যার বাংলা অর্থ 'সাদা চুলের রূপালি সুই'। প্রচুর পরিমাণে পলিফেনল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় ওই চা বিদেশের বাজারে সমাদৃত।
‘সিলভার নিডেল হোয়াইট টি’ উৎপাদন করে চিনের ফুজিয়ানকে টেক্কা দিয়েছে দার্জিলিং। প্রকৃতির রোষানলে সে-ই চা শিল্প চরম সংকটে। অনিয়মিত বৃষ্টি এবং উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাবে উদ্বেগজনকভাবে কমছে উৎপাদন।
দার্জিলিং পাহাড়ে একাধিক চা বাগানের মালিক তথা নর্থবেঙ্গল টি প্রডিউসার ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি সতীশ মিত্রুকা জানান, ‘সিলভার নিডেল হোয়াইট টি’ বছরে ৫০ কিলোগ্রামের বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। হাতে গোনা কয়েকটি বাগান সেটা তৈরি করে। ওই কারণে দাম বেশি। কিন্তু দাম বেশি হলে কি হবে? সতীশবাবু বলেন, "গত দু'দশকে প্রায় ২০ শতাংশ বৃষ্টি কমেছে দার্জিলিং পাহাড়ে। এবার ফেব্রুয়ারিতে এখনও বৃষ্টি মেলেনি। আবহাওয়ার পরিবর্তনের জেরে সিলভার নিডেল হোয়াইট টি সহ দার্জিলিং চায়ের উৎপাদন গত সাড়ে পাচ দশকে উদ্বেগজনক ভাবে কমেছে। এবারও মার খাবে।" চা বণিকসভাগুলো সূত্রে জানা গিয়েছে, দার্জিলিং পাহাড়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দু'মাস 'ফার্স্ট ফ্লাশ'-এর পাতা তোলা হয়। ওই পাতা থেকে অন্তত দুই মিলিয়ন কেজি চা তৈরি হয়। এটা মোট উৎপাদনের প্রায় ২০ শতাংশ। এটাই মরশুমের সেরা দার্জিলিং চা। সেটা জার্মানি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডে রপ্তানি হয়। কিন্তু সময়মতো বৃষ্টির অভাবে পাতা মিলছে না। ওই কারণে ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে চা উৎপাদন পুরোপুরি মার খাচ্ছে।
১৯৭০ সালে উৎপাদন ছিল ১৪ মিলিয়ন কেজি, সেখান থেকে ২০২৪ সালে তা নেমে দাঁড়ায় ৫.৫১ মিলিয়ন কেজিতে। গত বছরের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ৫.৩০ মিলিয়ন কেজি উৎপাদন হয়েছে। ২০২৩ সালে ছিল ৬.০১ মিলিয়ন কেজি। অথচ দার্জিলিংয়ের এক কেজি ‘সিলভার নিডেল হোয়াইট টি’ কিছুদিন আগেও পাঁচ হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছে। বিশ্বের বিরলতম এমন চা উৎপাদন করে চিনের ফুজিয়ানকে টেক্কা দিয়েছে দার্জিলিং। কিন্তু বাস্তব সে গর্ব ক্রমশ ফিকে হতে বসেছে। কারণ, একে পাহাড়ে জিআই ট্যাগ প্রাপ্ত ৮৭টি চা বাগান রয়েছে। তারমধ্যে অন্তত ১৫টি বন্ধ। বাকিগুলোতে এক-দেড়শো বছরের পুরনো গাছ বেশি। তার উপর আবহাওয়ার খামখেয়ালি। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং উষ্ণতা বৃদ্ধি চা উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। ২০২৫ সালের শুরুতে তীব্র জলকষ্টের কারণে ফার্স্ট ফ্লাশ চা উৎপাদনে বড় ধস নেমেছিল। ২০২৪ সালে উৎপাদন রেকর্ড সর্বনিম্ন স্তরে নামে। সেটা দার্জিলিং চায়ের ইতিহাসে নজিরবিহীন ছিল। ভারতীয় চা পর্ষদের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালের গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে উত্তাল সময়কে বাইরে রাখলে ২০২৪ সালে ১৬৯ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে কম উৎপাদন হয়েছে দার্জিলিং চায়ের। প্রশ্ন উঠেছে আবহাওয়ার খামখেয়ালিতে দার্জিলিং চা কি পারবে নিজের বিশ্বমানের গৌরব ধরে রাখতে!
