সম্পর্কে কাকা দীনেশচন্দ্র মাহাতো বারবার বলছেন, ফুটফুটে চাঁদের মতো ছেলে ছিল আমাদের। আর তাই তো ছৌ নাচের দলে কার্তিক সাজতেন ৩১ বছরের যুবক নিহত সুখেন মাহাতো। আড়াই বছর বাস্তুভিটেতে পা রাখেননি । বাবা-মা-র ইচ্ছে ছিল ওই চাঁদের মত ছেলের এবার বিয়ে দেবেন। মেজো ছেলে সুখেন নিজ মুখে তার বাবা-মাকে বিয়ের কথা না বললেও বাড়ি ফিরে এসে ঘর দুয়ার ঠিক করে যে সংসার পাতবেন তার কথাতেই বোঝা গিয়েছিল। তাই তার শিল্পী বন্ধু তরণী মাহাতো, প্রহ্লাদ সহিসরাও আশায় ছিলেন সুখেন আবার কার্তিক সাজবে। জমে উঠবে তাদের মহিষাসুরমর্দিনী পালা। কিন্তু তা আর হলো না। ওই চাঁদের মত ছেলেকে বাংলা ভাষায় কথা বলায় 'বাংলাদেশী' সন্দেহে নৃশংসভাবে খুন হতে হলো। গত মঙ্গলবার মহারাষ্ট্রের পুনের শিকরাপুর থানার করেগাঁও ভিমা এলাকার একটি হোটেলের পিছন থেকে ওই সুখেন মাহাতোর রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়।
পুণেতে কাজ করতে গিয়ে নিহত পরিযায়ী শ্রমিক সুখেন মাহাতো। নিজস্ব চিত্র
শুক্রবার দুপুরে অ্যাম্বুল্যান্সে ছৌ শিল্পী, ওই পরিযায়ী শ্রমিকের মৃতদেহ বাড়ির উঠোনে তুলসিতলায় রাখা হলেও সাদা কাপড় তুলে নিহত সুখেনের মুখ দেখতে পারেনি ওই গ্রাম। এতটাই নৃশংসভাবে পিটিয়ে তাকে খুন করা হয় বলে অভিযোগ। ২০১২ সালে পুনেতে যাওয়ার আগে প্রায় প্রতি সন্ধ্যাতেই ওই গ্রামে ছৌ নাচের মহড়াতে অংশ নিতেন তারা। ঝাড়খণ্ডের শুক্লা বিনদানন্দ ছৌ নৃত্য পার্টি তখন ছিল একেবারে নজরকাড়া। বরাতও আসতো বেশ। ঝাড়খন্ডের পূর্ব সিংভূম জেলার বড়াম থানার ওই শুক্লা এলাকার ত্রিলোচন মাহাতো ছিল ওই ছৌ নৃত্য পার্টির ওস্তাদ। সম্পর্কীয় দাদু লক্ষ্মীকান্ত মাহাতো বলেন, "ছেলেটা ছৌ নাচের পালায় বড় সুন্দর কার্তিক নাচতো। প্রায় ১৪ বছর আগে সে কাজে অন্য জায়গায় চলে গেলেও ওই কার্তিক নাচার জন্যই গ্রাম তাকে মনে রেখেছে। বাড়ি এলেই যে এখানে ছৌ নাচের আসর বসতো। আর কোনদিন কার্তিক নাচবে না আমাদের সুখেন। " কথা শেষ না হতেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসে দাদুর। 'টুলকু' নামেই সুখেন কে চিনত গোটা গ্রাম। ওই গ্রামের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করা সোনামণি মাহাতো বলেন, " একবার দাদাটা তার কার্তিক নাচের মহড়া ফেসবুকে স্ট্যাটাসে দিয়েছিল । সবাই দেখেছিল তখন। " তাই সুখেনের ছৌ নাচ মনে রেখেছে গ্রামের দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়া অনিমেষ মাহাতোও। তার কথায়, " ওই দাদাটার আর নাচ দেখতে পারবো না।"
ছৌ নাচের মহড়ায় নিহত সুখেন মাহাতো। নিজস্ব চিত্র
জামায় বুকের কাছে কালো ব্যাজ লাগিয়ে তাঁর দাদার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছে। একইভাবে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছেন পুরুলিয়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি নিবেদিতা মাহাতো, তৃণমূল নেত্রী সুজাতা খাঁ সহ জেলার মহিলা তৃণমূল নেতৃত্ব। তাই শুক্রবার একটা চল্লিশ নাগাদ যখন নিহত সুখেনের বাড়িতে অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়ায়। তখন সম্পূর্ণ গ্রাম যেন গাঁয়ের ছেলেকে শেষ দেখা দেখতে হামলে পড়েন। পাশের গ্রামগুলি থেকেও নিহত সুখেনকে দেখতে ভিড় জমান। দাদা তুলসিরাম মাহাতো বলেন, " অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে আমাদের দু'ভাইয়ের জন্য চাকরি চাওয়ার পাশাপাশি বাড়িটি সম্পূর্ণভাবে তৈরি করার কথা জানিয়েছি। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন। "
পুণেতে তিন ভাই মিলে কাজ করেই গ্রামে ওই দালান বাড়িটি নির্মাণ করেন তারা। কিন্তু অর্থের অভাবে সেই বাড়ি সম্পূর্ণ করতে পারেননি। তাই রোজগেরে সদস্যকে হারিয়ে সরাসরি অভিষেকের কাছে কাছে অসম্পূর্ণ বাড়ি সম্পূর্ণ করার প্রার্থনা করেন।" সম্পর্কীয় কাকা দীনেশচন্দ্র মাহাতো বলেন, " ওই তিন ছেলে মিলেই এই বাড়িটা দাঁড় করিয়েছিল। কিন্তু সম্পূর্ণ করতে পারেনি। এবার বাড়ি এসে ওই কাজে হাত দেওয়ার কথা ছিল সুখেনের।" সেই অসম্পূর্ণ বাড়ি সম্পূর্ণ হবে। পরিবার পাবে চাকরিও। কিন্তু ঘরের চিলেকোঠায় থাকা ঝুল জমে যাওয়া কার্তিকের মুখোশটা আর ধামসার দ্রিম দ্রিম আওয়াজে প্রাণ ফিরে পাবে না! চোখে জল নিহত সুখেনের শিল্পী বন্ধুদের।
নিহত সুখেন মাহাতোর শেষ যাত্রায় ঢল। ছবি : সুমিত বিশ্বাস
