shono
Advertisement
Maoist Leader

ফিরিয়েছিলেন আত্মসমর্পণের প্রস্তাব, স্কোয়াডে স্ত্রীর ফেরার অপেক্ষা করেই ঝাঁজরা মাও কমান্ডার সমীর

গ্রেপ্তার হওয়ার পর সমাজের মূল স্রোতে ফিরে সমীরের স্ত্রী কবিতা যে অন্যের ঘরনি হয়ে গিয়েছেন, সেই তথ্য জানতেনই না মাও কমান্ডার!
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 04:02 PM Jan 24, 2026Updated: 06:07 PM Jan 24, 2026

তখন যৌথবাহিনীর একেবারে সাঁড়াশি অভিযান। একের পর এক মাওবাদী নেতা (Maoist Leader) গ্রেপ্তার। বঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদল হতেই শুরু আত্মসমর্পণের হিড়িক। অযোধ্যা পাহাড়তলিতে গুলিতে ঝাঁজরা দুই কমরেড। লালগড়ে নিহত কিষাণজিও। ভেঙে গেল অযোধ্যা স্কোয়াড। চিকিৎসা করাতে এসে 'কমরেড ম্যারেজ' হওয়া স্ত্রীও গ্রেপ্তার। ফলে মনখারাপ হলেও কঠিন সময়ে আদর্শের টানে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন। কোথাও যেন একটা ক্ষীণ আশা ছিল, পার্টি ঘুরে দাঁড়াবে। আবার স্কোয়াডে ফিরে এসে পাশে থাকবেন স্ত্রী। তাই বারবার আত্মসমর্পণের প্রস্তাব এলেও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। আশা ছিল স্ত্রী ফিরবেনই। কিন্তু তিনি গ্রেপ্তারের পর সমাজের মূল স্রোতে ফিরে এখন অন্যের ঘরনি। স্কোয়াডে থেকে এসব জানা ছিল না অপেক্ষারত স্বামীর। আর স্ত্রীর জন্য সেই অপেক্ষাই কাল হলো। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ঝাড়খণ্ডের সারান্ডার জঙ্গলে গুলিতে ঝাঁজরা হয়ে গেলেন সিপিআই (মাওবাদী)-র কমান্ডার সুরেন্দ্রনাথ সরেন ওরফে বছর পঁয়ত্রিশের সমীর।

Advertisement

যৌথবাহিনীর গুলিতে ঝাঁজরা মাওবাদী কমান্ডার সুরেন্দ্রনাথ সরেন ওরফে সমীর। ফাইল ছবি

পুরুলিয়ার বান্দোয়ান ছুঁয়ে রানিবাঁধ। সেই রাস্তা দিয়ে ওই রানিবাঁধ ব্লকের কাঁকড়িঝরনা মোড়ের পাশে বারিকূল থানা। সেই থানার পাশ দিয়ে রসপালের বিদ্যার মোড়। সেখান থেকে বাঁদিকে কিছুটা গেলেই রসপাল হাটতলা। সেখান থেকে ভাঙাচোরা পথে প্রায় ২ কিমি দূরে রায়পুর ব্লকের বারিকূল থানার ফুলকুসমা গ্রাম পঞ্চায়েতের ইন্দকুড়ি। সেখানেই ২২ টি আদিবাসী পরিবারের সঙ্গে ওই মাও কমান্ডারের পরিবারের বাস। শুক্রবার বিকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ওই ঘরের অ্যাসবেস্টাসের ছাউনির দরজা ভেজানো। মা ফুলমণি সরেন গত মঙ্গলবার তাঁর মেয়ের শ্বশুরবাড়ি গিয়েছেন। মাস ছয়েক আগে মেয়ে মারা যাওয়ায় মাঝেমধ্যেই দুই নাতির কাছে যান তিনি। নিহত মাওবাদী কমান্ডারের ছোট ভাই হলধর কোনও রান্না না করেই ফুলকুসমার মেলায় যান। পড়শিদের কাছ থেকে তার নম্বর নিয়ে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও 'নট রিচেবল'।

সেখান থেকে ১২ কিমি দূরে রানিবাঁধ ব্লকের বারিকূল গ্রাম পঞ্চায়েতের সিঙ্গুডিতে রয়েছেন মা বছর ৫৮-র ফুলমণি। তখন ঘড়ির কাঁটায় সন্ধ্যা ৬ টা ৪২। গোটা গ্রামে একটাও আলো নেই। এই শীতের সন্ধ্যায় মনে হচ্ছে যেন রাত। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির ঘর চিনে সেখানে পা রাখতেই দেখা যায় নিহত মাওবাদী কমান্ডারের মা ফুলমণি সরেন রুটি বেলছেন। জঙ্গলে পড়ে থাকা ছেলের মৃতদেহের ছবি দেখে চিনতেই পারছেন না মা! মোবাইলে দেখানো হয় জলপাই পোশাকের ছবি। কিন্তু তাতেও না মায়ের। তবে অবিরাম চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল।

সমীরের বাড়ি দক্ষিণ বাঁকুড়ার বারিকূল থানার ইন্দকুড়িতে। ছবি: অমিতলাল সিং দেও

প্রশ্ন ছোড়া হয়, কবে ঘর ছেড়েছিল ছেলে? ফুলমণি দেবীর কথায়, "সে তো বহুদিন আগেকার কথা। পেটের জন্য আমি জমি থেকে আলু তুলতে তারকেশ্বর গিয়েছিলাম। ছেলে গিয়েছিল স্কুলে। তখন ক্লাস এইট পাশ করেছিল। ওই স্কুল থেকেই পালিয়ে যায়। তারপর আর বাড়ি ফেরেনি। স্বামী মারা যাওয়ার পর আমাদের ভীষণ কষ্ট। পেটের জন্য আমাকে ঘুরে ঘুরে কাজ করতে হয়। আমি সেভাবে বাড়ি থাকি না। আর ওর সঙ্গে দেখা হয়নি। বাংলা-ঝাড়খণ্ড পুলিশের কাছ থেকে শুনেছি ছেলে মাওবাদী দলে নাম লিখিয়েছে।"

মোবাইলে নিহত মাওবাদী কমান্ডারের ছেলের ছবি দেখছেন মা ফুলমণি সরেন। ছবি: অমিতলাল সিং দেও

মাও কমান্ডার ছেলে যে প্রাণ হারিয়েছে তা শুক্রবার রাত পর্যন্ত তাদের জানায়নি ঝাড়খণ্ড সরকার। মায়ের বিশ্বাস, ছেলে নিখোঁজ হয়েই রয়েছেন। সুরেন্দ্রনাথের সঙ্গে ওই এলাকার যে যুবক ঘর ছেড়েছিল তিনি এখন এসটিএফে রয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এসটিএফ কনস্টেবল বলেন, "২০১৫ সালে একবার বাড়ি এসেছিলো সুরেন্দ্রনাথ। এক রাত থেকেই চলে যায়। পরে পুলিশ জানতে পারে।" এই বারিকূল থানার রানিবাঁধ ব্লকের খেজুরখেন্না গ্রামের বাসিন্দা একসময় সিপিআই (মাওবাদী)-র রাজ্য মিলিটারি কমিশনের সদস্য, বাংলার শীর্ষ মাওবাদী নেতা রঞ্জিত পাল আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু তার সঙ্গী মাওবাদী কমান্ডার সুরেন্দ্রনাথ তাতে রাজি হননি। ওই এসটিএফ কনস্টেবল আরও জানান, "অযোধ্যায় স্কোয়াডে থাকা নন্দীগ্রামের সোনাচূড়ার মেয়ে কবিতা ঘড়ুই ওরফে কল্পনার সঙ্গে কমরেড ম্যারেজ হয়েছিল। তারপর ঝাড়খণ্ড ছুঁয়ে থাকা পুরুলিয়ার বলরামপুর থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যান তিনি। সমীর ভেবেছিল তার স্ত্রী একদিন ঠিক স্কোয়াডে ফিরে আসবে। সেই অপেক্ষায় করছিল।"

সমীরের স্ত্রী কবিতা ঘড়ুই ওরফে কল্পনা। ফাইল ছবি

কিন্তু মা ফুলমণি জানেন না, তার ছেলে মাও স্কোয়াডে কমরেড ম্যারেজে আবদ্ধ হয়েছেন। তাই বড় ছেলের মৃত্যুর খবরের সঙ্গে সঙ্গে বউমার খবর শুনে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকেন ফুলমণি। আঁচল দিয়ে চোখের জল মোছেন।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement