এক শোকের বয়স মাত্র ১৭ দিন। হলদিয়ার মণ্ডল পরিবারের একমাত্র ছেলের মৃত্যু হয়েছে সপ্তাহ দুই আগে। সেই শোক সামলাতে আর বেশিদিন লাগল না। শনিবারের পথ দুর্ঘটনায় পরিবারের বাকি সদস্যরাও চলে গেলেন চিরঘুমের দেশে। দুর্ঘটনার পর মৃতদের পরিবারের জন্য অর্থসাহায্য ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। কিন্তু হলদিয়ার মণ্ডল পরিবারের হয়ে কে নেবেন সেই সাহায্য? শ্মশানে পরপর সাজানো তিনটি চিতার সামনে দাঁড়িয়ে সেই উত্তর খুঁজছেন এলাকাবাসী।
শ্মশানে জ্বলছে তিনটি চিতা। সার দিয়ে সাজানো অরূপ মণ্ডল, তাঁর স্ত্রী এবং কন্যার নিথর দেহ। মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে একটি আস্ত পরিবার মুছে গিয়েছে হলদিয়ার বালুঘাটা রোডের পিচরাস্তায়। শনিবার একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি বাইক ও ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা দিয়ে দুর্ঘটনার ফলে অরূপ মণ্ডলের পরিবারের তিনজন সদস্য। ১৭ দিনে আগেই পরিবারের একমাত্র ছেলে প্রাণ হারিয়েছেন। দুর্ঘটনার খবর পেয়েই রাজ্য সরকার মৃতদের পরিবারের জন্য আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু অরূপ মণ্ডলের পরিবারের হয়ে সেই অর্থ হাতে নেবেন কে? তাঁদের গোটা পরিবারই যে মুছে গিয়েছে।
হলদিয়ার এক পরিবারের তিন সদস্যের চিতা। নিজস্ব ছবি
এই দুর্ঘটনায় আহত আরও ৮ জন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে তড়িঘড়ি হাসপাতালে পৌঁছন জেলাশাসক ইউনিস রিসিন ইসমাইল। তিনি জানান, মৃতদের পরিবার পিছু ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করেছে নবান্ন। প্রশাসন সূত্রে খবর, চালক মহাদেবের পরিবার ইতিমধ্যেই সরকারি সাহায্য গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কিন্তু জটিলতা তৈরি হয়েছে অরূপ মণ্ডলের পরিবারকে নিয়ে। যেহেতু ওই পরিবারের একমাত্র ছেলের ১৭ দিন আগেই মৃত্যু হয়েছে এবং পরিবারের বাকি তিন সদস্যেরই মৃত্যু হয়েছে। তাই তাঁদের প্রাপ্য মোট ৬ লক্ষ টাকা আইনিভাবে কার হাতে তুলে দেওয়া হবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
হলদিয়ায় দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে আহতদের দেখতে বিধায়ক তাপসী মণ্ডল। নিজস্ব ছবি
হলদিয়ার বিধায়ক তাপসী মণ্ডল বলেন, "রাজ্য সরকারের নির্দেশে আহতদের চিকিৎসার যাবতীয় তদারকি জেলা প্রশাসন করছে। মৃতদের পরিবারের ক্ষেত্রে আইনিভাবে যিনি বৈধ দাবিদার হিসেবে সামনে আসবেন, তাঁর হাতেই নিয়ম মেনে আর্থিক সাহায্য তুলে দেওয়া হবে।" শনিবার সন্ধ্যায় গ্রামের শ্মশানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের সাক্ষী থাকেন স্থানীয় বাসিন্দারা। জায়গা কম থাকায় প্রথমে স্থির হয়েছিল, একটি একটি করে দেহ সৎকার করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গ্রামবাসীর উদ্যোগে তিনটি চিতা একসঙ্গেই সাজানো হয়। একই আগুনের শিখায় বিলীন হয়ে গেল হাসিখুশি পরিবারটির শেষ চিহ্নটুকু। গ্রামের এক বাসিন্দা কান্নাভেজা চোখে বললেন, "টাকা তো সরকার দেবে, কিন্তু যে মানুষগুলোই নেই, তাঁদের টাকা নিয়ে কী হবে? যে পরিবারটা শেষ হয়ে গেল, তাদের অভাব কী আর টাকায় মেটে?"
