জঙ্গলমহলের ভোট অঙ্ক এখন অনেকাংশেই জাতিগত সামাজিক সংগঠনের উপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে একুশের বিধানসভা ভোট থেকেই ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা ছুঁয়ে থাকা জঙ্গলমহলের জেলাগুলির ভোট সমীকরণ এমন অবস্থাতেই দাঁড়িয়েছে। যত দিন যাচ্ছে জঙ্গলমহলের রাজনীতির যেন নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠছে এই জাতিভিত্তিক সামাজিক সংগঠনগুলি-ই। তাই ভোট এলেই নানান দর কষাকষিতে যেমন চাপ বাড়ছে শাসক তৃণমূলে। তেমনই বিরোধী গেরুয়া শিবিরে। তেমনই এই সামাজিক সংগঠনগুলিও নির্বাচন এলে নানা দাবি দাওয়াতে চাপ তৈরি করে। যা ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে গিয়েছে রাজ্যের বনমহলের জেলা পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুরে। এই জঙ্গলমহল জুড়ে একেবারে প্রথম সারিতে থাকা কমবেশি ৩০টি জাতিগত সামাজিক সংগঠন রয়েছে। সবকটি সংগঠনের প্রভাব যে অনেকটা বেশি তা নয়। কিন্তু অন্যতম বড় ফ্যাক্টর আদিবাসী, কুড়মি ও বাউরিদের সামাজিক সংগঠন।
তবে জঙ্গলমহলের এই ৪ জেলায় কুড়মি ও আদিবাসী জনজাতির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর এই জনজাতির সংগঠন। কুড়মিদের মধ্যে আদিবাসী কুড়মি সমাজ, পূর্বাঞ্চল আদিবাসী কুড়মি সমাজ, কুড়মি সেনা, পশ্চিমবঙ্গ কুড়মি সমাজ, নেগাচারি কুড়মি সমাজ ও আদিবাসী কুড়মি সমাজ থেকে বিভক্ত হওয়া ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ। কুড়মিদের এই ছটি সংগঠনের মধ্যে আদিবাসী কুড়মি সমাজ, পূর্বাঞ্চল আদিবাসী কুড়মি সমাজ ও ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ ভোট অঙ্কে অনেকখানি গুরুত্ব বহন করছে। আর তা বুঝতে পেরেই ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের মত ইতিমধ্যেই আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিতপ্রসাদ মাহাতো তৃণমূলকে একটি ভোট নয় এই ডাক দিয়েছেন। অন্যদিকে এই ডাকের বিরোধিতা করে ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজ গঠন হয়েছে সম্প্রতি। আদিবাসী কুড়মি সমাজের মূল মানতা অজিত প্রসাদ মাহাতো বলেন, "উত্তরপ্রদেশের কয়েকটি জনজাতি সম্প্রতি এসসি তালিকাভুক্ত হয়েছে। তাহলে আদিবাসী তালিকাভুক্তের দাবিতে আমাদের দীর্ঘ আন্দোলনে আমরা কেন ফল পাবো না? এর জন্য কে দায়ী?"
তাই ওই সংগঠন আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের ৫-৬ তারিখ পুরুলিয়ার কোটশিলার মুরগুমার কেনকেচে পাহাড়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে ঠিক হয়েছে। রাজ্যকে যেমন আদিবাসী তালিকাভুক্তের দাবির বিষয়ে কমেন্ট-জাস্টিফিকেশন পাঠাতে হবে। তেমনই কেন্দ্রের কাছে তাদের প্রশ্ন, কুড়মালি ভাষাকে কেন অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না? দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসার পরেও। অন্যদিকে ছোটনাগপুর আদিবাসী কুড়মি সমাজের এক্সিকিউটিভ কমিটির অন্যতম কর্মকর্তা ড. সুজিত মাহাতো বলেন, " আমাদের এখন মূল দাবি আদিবাসী তালিকাভুক্তের বিষয়ে কমেন্ট-জাস্টিফিকেশন দ্রুত রাজ্যকে পাঠাতে হবে।" লোকসভার নিরিখে পুরুলিয়ার প্রায় ৩০ শতাংশ কুড়মি জনজাতির মানুষ রয়েছেন। এই লোকসভার মধ্যে রয়েছে বাঘমুন্ডি, জয়পুর, বলরামপুর, পুরুলিয়া, মানবাজার বিধানসভা। ঝাড়গ্রাম লোকসভার অধীনে পুরুলিয়ার বান্দোয়ান বিধানসভাতেও কুড়মি ভোট একটা বড়সড় ফ্যাক্টর।
জঙ্গলমহলে কুড়মি আন্দোলনের অন্যতম সমাজকর্মী সৌম্যদীপ সমু বলেন, "জঙ্গলমহলের ভূমিপুত্র জনজাতিদের সাংবিধানিক সামাজিক অধিকারের দাবি আদায়ের লক্ষ্যই হল এখানকার মানুষের আন্দোলন। এই দাবি প্রতিষ্ঠা করা হল আমাদের মূল উদ্দেশ্য। নির্বাচন নিয়ে ভাবনা নয়।" জঙ্গলমহলের এই জেলায় আদিবাসী জনজাতির সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশের বেশি। একইভাবে ঝাড়গ্রাম জেলার ঝাড়গ্রাম বিধানসভাতেই কুড়মি জনজাতির সংখ্যা ৩০ শতাংশ। আদিবাসী প্রায় ১৬ শতাংশ। বিনপুরে কুড়মি ২৫, আদিবাসী ৩০, নয়াগ্রামে কুড়মি ২০, আদিবাসী ৩০, গোপীবল্লভপুরে কুড়মি ৩৫, আদিবাসী ২০ শতাংশ। সমগ্র জেলার নিরিখে প্রায় ৩০ শতাংশ কুড়মি জনজাতি। আদিবাসী প্রায় ৩৫ শতাংশ। পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রামের মতো কুড়মি জনজাতির প্রভাব পশ্চিম মেদিনীপুরে না থাকলেও ওই জেলার শালবনি বিধানসভায় কুড়মি ভোট রয়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। আদিবাসী ভোট ১৭ থেকে ১৮ শতাংশ। মেদিনীপুর বিধানসভাতে যেমন কুড়মি ভোট রয়েছে। তেমনই খড়গপুর গ্রামীণ-এও রয়েছে কুড়মি ভোট। ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহলের জেলা পারগানা রতনলাল হাঁসদা বলেন, "তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সব সময় আমাদের পাশে রয়েছেন। তাঁর প্রতি আমাদের আস্থা আছে। দিদি না বলতেই আমাদেরকে এমন প্রকল্প দিয়েছেন যাতে আমরা অভিভূত।
কিন্তু জঙ্গলমহলের তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিরা যে ঠিক কি ভাবে কাজ করছেন আমরা বুঝতে পারছি না। শাসক দলের একটা জনপ্রতিনিধিকে আমরা পাইনি, যার মধ্য দিয়ে আমাদের দাবি রাজ্যের কাছে পাঠাব। এখানেই আমাদের অভিমান। তাই এবার আমরা ইস্তাহার এবং প্রার্থী দেখবো। প্রার্থী যদি মনের মত না হয় তাহলে আমরা কিন্তু বেসুরো হতে পারি। " আদিবাসীদের মধ্যে ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহল ছাড়া আদিবাসী সেঙ্গেল অভিযান, পশ্চিমবঙ্গ আদিবাসী কল্যাণ সমিতি, ভারতীয় ভূমিজ সমাজ, ভূমিজ-মুন্ডা কল্যাণ সমিতি এবং বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরে বাগদিদের সামাজিক সংগঠন রয়েছে। রয়েছে মুদি, বেদিয়া, মাহালিদের সামাজিক সংগঠন ও।
একুশের বিধানসভা এবং ২৪-শের লোকসভা ভোটে আদিবাসী ভোট ব্যাপকভাবে পেয়েছিল শাসক দল তৃণমূল। তাই জঙ্গলমহলে আশানুরূপ ফল করতে পারেনি বিজেপি। অতীতে এই আদিবাসীরা সিপিএম এবং ফরওয়ার্ড ব্লকের দিকে ছিলো। জঙ্গলমহলের রাজনৈতিক মহলের তথ্য বলছে গত বিধানসভা ও লোকসভা ভোটে কুড়মিদের ভোট শাসক দল তৃণমূল সেভাবে পায়নি। পুরুলিয়া লোকসভা হেরে যাওয়া তার অন্যতম কারণ। এমনকি শাসক দলের অভিযোগ, আদিবাসী কুড়মি সমাজের প্রার্থীর বিজেপির সঙ্গে সেটিং ছিলেন। না হলে প্রচারে ব্যাপক সাড়া পাওয়ার পরেও তিনি ১ লাখ ভোটও কেন পেলেন না? তেমনভাবে এই জঙ্গলমহলের জেলাগুলিতে বাউরিদের ভোটও গুরুত্বপূর্ণ। গত বিধানসভা ও লোকসভা ভোটে যা জঙ্গলমহলে শাসক দলের পক্ষে যায়নি। বাউরিদের মধ্যে যে সংগঠনগুলি রয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পশ্চিমবঙ্গ বাউরি সমাজ কল্যাণ সমিতি, পশ্চিমবঙ্গ বাউরি সমাজ, পশ্চিমবঙ্গ বাউরি সমাজ উন্নয়ন সমিতি, রাঢ়বঙ্গ বাউরি সমাজ, বাউরি সমাজ শিক্ষা সমিতি। রাজ্যের বাউরি কালচারাল বোর্ডের সদস্য তথা পশ্চিমবঙ্গ বাউরি সমাজের পুরুলিয়া জেলা কমিটির সম্পাদক নৃপেন বাউরি বলেন, "অতীতের ভোটে কি হয়েছে সেটা আলাদা কথা। এবার বাউরিদের ভোট শাসক দল তৃণমূলে যাবে। তবে আমাদের বেশ কিছু দাবি রয়েছে তার মধ্যে একটি কমিউনিটি হল। আমরা চাই ব্লকে ব্লকে আমাদের জন্য কমিউনিটি হল গড়ে উঠুক।"
এছাড়া ডোম সমাজ, তেলি কুলু উন্নয়ন সমিতি, কুমার উন্নয়ন সমিতি, ব্রাহ্মণ পুরোহিত উন্নয়ন ট্রাস্ট, ক্ষত্রিয়, সহিস, রাজোয়াড়, তিলি মহাসভা, তাম্বুলি ও মারোয়াড়িদেরও সংগঠন রয়েছে এই জঙ্গলমহলে। পুরুলিয়া জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান তথা রাজ্যের সাধারণ সম্পাদক শান্তিরাম মাহাতো বলেন, " উত্তরপ্রদেশ বিহারের মতো বাংলায় জাতপাতের রাজনীতি হয় না। এখানে উন্নয়ন দেখে ভোট হয়। কে প্রার্থী তা দেখে আমজনতা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।" বিজেপির জেলা সভাপতি শঙ্কর মাহাতো জানান, "কোন একটা বিশেষ সময়ে নয়। সামাজিক সংগঠনগুলির দাবিদাওয়ার বিষয়ে আমরা সারাবছর ধরে কাজ করি।"
