সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: তখন এমন জনবহুল এলাকা ছিল না। ফাঁকা ফাঁকা এই এলাকায় সেভাবে যানবাহনও চলত না। সেই ছয়ের দশকে এই ফাঁকা জায়গাতেই চা-চপের দোকান দিয়েছিলেন তিনি। আজ অর্ধশতাব্দী পর জীবদ্দশাতেই তিনি লেজেন্ড। জীবিত অবস্থাতেই মুখে মুখে প্রচারিত তাঁর নামেই রাস্তার নামকরণ হয়েছে। সেই নামকেই স্বীকৃতি দিয়ে রাস্তার পাশে সাদা-সবুজ রংয়ের বোর্ড লাগিয়েছে পূর্তদপ্তর। পুরুলিয়ার শিল্পশহর রঘুনাথপুরে আজ বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে সেই ভন্দুর মোড়। সৌজন্যে ভন্দু ওরফে
দুর্গাদাস কর।
১৯৬০ সালের কথা। তখন মাত্র ১৬ বছর বয়স ছিল এই ভন্দুর। সেই সময়ই পুরুলিয়া-বাঁকুড়া রাজ্য সড়কপথে রঘুনাথপুর পুর শহরের এক ও দু’নম্বর ওয়ার্ডের সংযোগস্থলে চা-চপের দোকান দিয়েছিলেন তিনি। সংসার টানতে অষ্টম শ্রেণি পাশ করেই তেলেভাজার দোকান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওই এলাকা জমজমাট হলে সেই চা-চপের দোকান বাড়তে থাকে। মিষ্টি-সহ আরও নানা খাবার বিক্রি করতে থাকেন। প্রায় ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে এই ভন্দুকে সাহায্য করে আসছেন তার সহধর্মিণী মায়ারানি কর। স্বামীর জন্য গর্বিত তিনি।
[আরও পড়ুন: উচ্চমাধ্যমিকের প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার নিয়মে বড়সড় বদল, কী জানাল সংসদ?]
তাঁর কথায়, ” বলে বোঝাতে পারব না যখন মানুষজন বলেন ভন্দুর মোড়ে নামব, আমি ভন্দুর মোড়ে আছি, ভন্দুর মোড়ে যাচ্ছি, এসব শুনে গর্বে বুকটা ভরে ওঠে।” ভন্দু ওরফে দুর্গাদাস করের কথায়, “এই এলাকা তখন ছিল একেবারে ফাঁকা ফাঁকা । সংসার চালানোর জন্য মাত্র ১৬ বছর বয়সে আমি এই এলাকায় চা-চপের দোকান দিই। কয়েকদিনের মধ্যেই আমার দোকান ভালোভাবে জমে যায়। তখন ফাঁকা এলাকা হলেও মানুষজন আমার দোকানে এসে চা, চপ, ঘুগনি খেতে থাকেন। আস্তে আস্তে দোকান বাড়তে থাকে। যেহেতু এই এলাকা এক এবং দু’নম্বর ওয়ার্ডের সংযোগস্থল তাই এলাকার নাম হয়ে যায় আমার নামে ভন্দুর মোড়। মানুষের মুখে মুখে সেই প্রচারিত নামকেই পূর্তদপ্তর স্বীকৃতি দিয়ে বোর্ড লাগিয়েছে। যখন এই রাস্তা দিয়ে যাত্রীবাহী বাস যায় তখন কনডাক্টর বলেন, ভন্দুর মোড় এসে গিয়েছে। যারা নামতে চান নেমে যান।
আমার কাছে এ যে কত বড় পাওনা। তা বলে বোঝাতে পারব না। মাঝে মধ্যে ভাবি সত্যিই আমি ভাগ্য করে জন্মেছি।”
জীবিত অবস্থায় নিজের নামে রাস্তার নামকরণের ইতিহাস বলতে বলতে আনন্দাশ্রু ঝরে পড়ে বৃদ্ধের। মাথায় সাদা ধবধবে চুল, গোঁফও একেবারে সাদা। সঙ্গে চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। দেখলে বোঝার উপায় নেই তিনি চা-চপের দোকান চালান। চেহারার মধ্যে আভিজাত্য ফুটে ওঠে ৭৯ বছরের ভন্দুর। আগে ভোর ৪ টে থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত এই দোকান চালাতেন। এখন অবশ্য বয়সের ভারে ভোর ৪ টে থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত চলে ওই দোকান। তারপর আর দোকানে সময় দিতে পারেন না। বিশ্রাম শেষে পরের দিন আবার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। রঘুনাথপুরের পুরপ্রধান তরণী বাউড়ি বলেন, “জীবিত থাকাকালীনই কারও নামে রাস্তার নামকরণ। এটা সত্যি বড় গর্বের। ওই বৃদ্ধ মানুষটির জন্য গর্বিত আমাদের পুর শহর, গর্বিত এই শিল্পশহর।”
তাই ৬০ বছর ধরে এই শিল্পতালুকে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছে ওই চপের দোকান এবং মোড়। সর্বোপরি ভন্দু ওরফে দুর্গাদাস কর।
দেখুন ভিডিও:
