সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: যে 'সোনালি তরল'-এ রয়েছে কার্বোহাইড্রেট থেকে প্রোটিন। যা শরীরে আয়রনের ঘাটতি মেটায়। দূর করে হজমের সমস্যা। ভালো রাখে ত্বক। যা দিয়ে তৈরি হয় বিখ্যাত জয়নগরের মোয়া। নানা পিঠে, পুলি, পায়েস, মিষ্টি, সন্দেশ, আইসক্রিম। পৌষ সংক্রান্তির আগে যার চাহিদা থাকে তুঙ্গে। সেই জঙ্গলমহলের নলেন বা খেজুর গুড়ের প্রক্রিয়াকরণ আর স্বাস্থ্যসম্মত নয়! অথচ রাজ্যের মধ্যে এই বনমহলে বিশেষ করে পুরুলিয়ায় সবচেয়ে বেশি রয়েছে খেজুর গাছ। তাই সেই ভাদ্র মাস থেকে ভিন জেলার শিউলিরা
এই বনাঞ্চলে এসে খেজুর বা নলেন গুড় তৈরিতে প্রক্রিয়া শুরু করেন। যা রাজ্য ছাড়িয়ে বিশ্ব বাংলার স্টলের হাত ধরে দেশে নজর কেড়েছে। কিন্তু সেই গুড় নিয়েই এখন নানা প্রশ্ন।
পুরুলিয়ায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছে নলেন গুড় তৈরির কাজ। ছবি: সুমিত বিশ্বাস
পেল্লাই সাইজের কড়াইতে খেজুর গুড়ে জাল দিতে গিয়ে নিভে গিয়েছে আগুন। জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁবুতে থাকা শিউলিরা খেজুর পাতা দিয়ে তৈরি অস্থায়ী তাঁবু থেকে পর্যটকদেরকে ওই গুড় দিতে ব্যস্ত। এদিকে ওই গুড়ের ম-ম গন্ধে চারপাশ ভনভন করছে মাছি। একেবারে যে খোলা অবস্থাতেই পড়ে রয়েছে ওই জাল দেওয়া গুড়। তার পাশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে মুরগি। আর তখনই পাশের রাস্তায় ধুলো উড়িয়ে চলে গেলো পাথর বোঝাই লরি। সেই ধুলো একেবারে উনুনে থাকা গুড়ের কড়াই-এ। ওই উনুনের কিছুটা দূরেই সারি সারি করে রাখা প্লাস্টিকের কৌটো। যা গাছে বেঁধে সংগ্রহ করা হয় খেজুর রস। সেই প্লাস্টিকের কৌটোর চারপাশ পাখির বিষ্ঠাতে ভর্তি। কৌটোর পাশে গেলে দুর্গন্ধে দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। গাছে বাঁধা ওই কৌটোতেই ঠোঁট দিচ্ছে টিয়া, ময়না, কাজললতা, বুলবলি। এমনকি ঝাড়ুদার পাখি কাকও। শুধু মুখ দিয়ে রসের স্বাদ নেওয়া নয়। ওই খেজুর রসে মিশছে পক্ষীকূলের বিষ্ঠাও!
খেজুর রসের হাঁড়িতে মুখ কাকের। ছবি : অমিতলাল সিং দেও
আর তা প্রতিরোধে ওই হাঁড়িতে আগে থেকেই দেওয়া থাকছে চুন। তাঁবুর ভিতরে কাগজে মোড়া বস্তার উপরে পাটালির পাশেই চলছে রান্নার কাজ। সেখানেই ফেলা হচ্ছে জল, সবজির খোসা। ঘুরে বেড়াচ্ছে মেঠো ইঁদুর। এভাবেই পুরুলিয়ায় অজস্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শিউলিদের অস্থায়ী তাঁবুতে একেবারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছে খেজুর গুড় তৈরির কাজ। আর সেই গুড়-ই দেদার বিক্রি হচ্ছে। পর্যটক থেকে পথ চলতি মানুষ ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে তা নিচ্ছেন। পাটালি বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ২৫০ টাকায়। স্বাস্থ্যবিধি-এমন দফারফায় গুড় তৈরি হলেও একেবারে উদাসীন পুরুলিয়া জেলা স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ বিভাগের খাদ্য সুরক্ষা বিভাগ বলে অভিযোগ। আর এই খাদ্য সুরক্ষায় ভ্রাম্যমান গাড়ি থাকলেও কখনও এই অস্থায়ী তাঁবুতে ঢুঁ দেননি তারা! তাই একেবারে বেপরোয়া হয়ে অপরিচ্ছন্ন জায়গাতেই চলছে খেজুর গুড় তৈরির কাজ।
খেজুর গাছের হাঁড়ি পাখির বিষ্ঠা আর চুন লাগানো হয়ে পড়ে আছে। ছবি: সুমিত বিশ্বাস
কিন্তু এই স্বাস্থ্যবিধি দেখবে কে? জেলার ২০ টি ব্লকে যে মাত্র ৯ জন খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিক। একেকজন আধিকারিক দুটি বা তিনটি করে ব্লকের দায়িত্বে। খাদ্য সুরক্ষার কাজের নোডাল আধিকারিক তথা উপ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক-২ মহুয়া মাহান্তির প্রতিক্রিয়া নিতে একাধিকবার ফোন করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। পুরুলিয়া শহর, পুরুলিয়া এক ও পুরুলিয়া ২ নম্বর ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিক আরিফুল হক বলেন, " আমি ছুটিতে আছি। কাজে যোগ দিলে অবশ্যই শিউলিদের নলেন বা খেজুর গুড়ের অস্থায়ী তাঁবুতে যাবো।" জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক অশোক বিশ্বাস বলেন, " এই নিয়ে প্রথমে সচেতনতা প্রয়োজন। সত্যিই এমনটা হওয়া উচিত নয়। বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে এনে অবশ্যই পদক্ষেপ করব।"
পুরুলিয়া- বাঁকুড়া জাতীয় সড়ক থেকে পুরুলিয়া-বরাকর রাজ্য সড়ক। কয়েক কিলোমিটার দূরে দূরে শিউলিদের অস্থায়ী তাঁবু। সেই সঙ্গে বাঘমুন্ডি থেকে মুখোশ গ্রাম চড়িদা যাওয়ার সড়ক সহ জেলা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গ্রামীন রাস্তার পাশে শিউলিদের ভিড়। যাঁরা এসেছেন নদিয়া, বর্ধমান, বাঁকুড়া থেকে। পুরুলিয়ার শিউলি একেবারে হাতেগোনা। হুড়া থানা এলাকায় বাঁকুড়ার ইন্দপুর থেকে আসা শিউলি কুদ্দুস মল্লিক বলেন, "নোংরা প্রতিরোধের জন্যই তো আমরা হাঁড়ির ভেতরে চুন দিই। যাতে জীবাণুমুক্ত হয়ে যায়। একেবারে স্বচ্ছ দেখায় খেজুর রস।" ওই শিউলির কথা থেকেই পরিষ্কার খেজুর গাছে বাঁধা থাকা হাঁড়িতে মুখে করে নিয়ে আসা পাখিদের নানান বর্জ্য ওই প্লাস্টিকের পাত্রে পড়ছে। কিন্তু যে চুন দেওয়া হচ্ছে তা তো আর পানে দেওয়ার চুন নয়। ফলে স্বাস্থ্য বিধি শিকেয় তুলে পুরুলিয়ায় চলছে খেজুর গুড় তৈরির কাজ। অভিযোগ গাছে থাকা বাধা হাঁড়ির ওপরে কোন জাল দেওয়া হচ্ছে না। অথচ জাল দিলেও সামান্য ছিদ্রে গাছ থেকে বেয়ে আসা রস একটি ছুঁচালো কাঠির মধ্য দিয়ে অনায়াসে গড়িয়ে পড়ে হাঁড়িতে। হুড়া থানা এলাকার আরেক শিউলি আব্দুল মজিদ বলেন, " মাঠে ঘাটেই আমাদের তাঁবু করে থেকে এই কাজ করতে হয়। সব কিছু তো আর গোছানো থাকে না। প্রত্যেকটা হাড়িতে জাল দেওয়া সম্ভব নয়।" তাই বলে কোন স্বাস্থ্যবিধি মানা হবে না? উত্তর নেই শিউলিদের। আসলে খাদ্য সুরক্ষা বিভাগের অভিযানই যে হয় না! বিধি মানবে কে?
