বজ্রাঘাতে কৃষকের মৃত্যু! অসমাপ্ত ধান রোপণ শেষ করল গোটা গ্রাম। মৃত্যুশোকে ভেঙে না পড়ে দুঃসময়ে পরিবারের পাশে ১৫০ গ্রামবাসী। বিনা পারিশ্রমিকে পাঁচ বিঘা জমিতে ধান রোপণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন তাঁরা। যে মাঠে দাঁড়িয়ে সোমবার দুপুরেও ধানের চারা রোপণ করছিলেন রাসবিহারী পাল। পরদিন সেই মাঠেই তাঁর পরিবর্তে নামল গোটা গ্রাম। তবে রাসবিহারী আর ছিলেন না। বজ্রাঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে তখন তাঁর দেহ ময়নাতদন্তের অপেক্ষায়। আর ইলামবাজারের আকম্বা গ্রামের মাঠে তাঁর অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে ব্যস্ত গ্রামবাসীরা। ।
কারও হাতে ধানের চারা, কারও হাতে কাদা মাখা মাটি। শোককে পাশে সরিয়ে রেখে বিনা পারিশ্রমিকে তাঁরা রোপণ করে দিলেন মৃত কৃষকের বাকি প্রায় পাঁচ বিঘা জমির ধান। এক কৃষকের অসমাপ্ত কাজ শেষ করে দিয়ে শুধু একটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানো নয় মানবিকতার এক অনন্য নজির গড়লেন গ্রামবাসীরা।
প্রসঙ্গত সোমবার, রাসবিহারী পালের (৫৭) বজ্রাঘাতে মৃত্যু হয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে দিশেহারা স্ত্রী, দুই ছেলে ও পুত্রবধূ-সহ পরিবার-পরিজনেরা। তখনই পাশে দাঁড়াল গোটা গ্রাম। শোকের মধ্যেই মানবিকতার নজির এখন ইলামবাজারের আকম্বাগ্রাম। ইলামবাজার ব্লকের জয়দেব-কেঁদুলি গ্রাম পঞ্চায়েতের আকম্বা গ্রামে বজ্রাঘাতে গুরুতর জখম হন রাসবিহারী। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করে ইলামবাজার ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত বলে ঘোষণা করেন। কৃষক রাসবিহারীর আকস্মিক মৃত্যুতে ভেঙে পড়ে পরিবার। প্রায় ছয় বিঘা জমিতে চাষ করতেন তিনি। সেই জমিই ছিল পরিবারের অন্যতম প্রধান ভরসা। মৃত্যুর আগে মাত্র এক বিঘা জমিতে ধান রোপণের কাজ শেষ করতে পেরেছিলেন। বাকি প্রায় পাঁচ বিঘা জমির কাজ পড়ে ছিল অসম্পূর্ণ। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে সেই কাজ কীভাবে শেষ হবে, তা নিয়েও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। কিন্তু সেই অনিশ্চয়তা স্থায়ী হতে দিলেন না গ্রামের মানুষ।
গ্রামের বাসিন্দা রতন ঘোষ ও সুভাষ পাল বলেন, "রাসবিহারীবাবু আমাদের গ্রামেরই মানুষ। প্রায় ছয় বিঘা জমিতে তাঁর চাষ ছিল। এক বিঘা জমিতে ধান রোপণের পরই বজ্রপাতে তাঁর মৃত্যু হয়। বাকি জমির কাজ অসম্পূর্ণ ছিল। তাই আমরা সবাই মিলে সেই কাজ শেষ করেছি। আমাদের গ্রামের অধিকাংশ মানুষই চাষবাসের উপর নির্ভরশীল। একজন কৃষককে এভাবে হারানোর কষ্ট আমরা সকলেই বুঝি। এই দুঃসময়ে তাঁর পরিবারের পাশে রয়েছি।” মৃত কৃষকের জামাইবাবু বীরেশ্বর ঘোষ বলেন, রাসবিহারীর মৃত্যুর পর গোটা গ্রাম শোকে ভেঙে পড়ে। কিন্তু গ্রামের মানুষ নিজেরাই মাঠে নেমে তাঁর বাকি জমির ধান রোপণ করে দিয়েছেন। এই কঠিন সময়ে সবাই যেভাবে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাতে আমরা কৃতজ্ঞ। "মঙ্গলবার ময়নাতদন্তের পর রাসবিহারী পালের দেহ আকম্বা গ্রামে ফিরতেই শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে ভিড় জমান গ্রামবাসীরা। শোকের আবহেই সম্পন্ন হয় তাঁর শেষকৃত্য। রাসবিহারী নেই, কিন্তু তাঁর মাঠে সবুজ হয়ে উঠছে তাঁর স্বপ্ন।
