শূন্যের গেরো কাটানোই একমাত্র লক্ষ্য। তা নিয়ে দলে ঐক্যমত্যও রয়েছে। কিন্তু তা বলে নীতিগত অবস্থানের কথা ভুলে গিয়ে 'সাম্প্রদায়িক নেতা'র সঙ্গেও হাত মেলাবে দল? জন উন্নয়ন পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে বৈঠকের পর থেকে দলের অন্দরে আপাতত এই প্রশ্নেই বিদ্ধ মহম্মদ সেলিম (Salim-Humayun Meet)। একধাপ এগিয়ে দলের একাংশের দাবি, কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে এলেন সাধারণ সম্পাদক!
বাংলায় সিপিএমের নৈতিক অবস্থান হল, 'দুর্নীতিগ্রস্ত' তৃণমূল এবং 'সাম্প্রদায়িক' বিজেপির মতো শক্তিকে পরাস্ত করা। কিন্তু শাসক তৃণমূল এবং প্রধান বিরোধী দল বিজেপির বিরোধিতা করতে গিয়ে হুমায়ুনের সঙ্গে সেলিমের সাক্ষাতে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সাম্প্রতিক অতীতে দেখা যায়নি বলেই মত সিপিএমের একাংশের। কারণ, গত লোকসভা ভোটের সময় তৃণমূলে থাকা হুমায়ুনকে দলেরই একটা অংশ সাম্প্রদায়িক বলে দাগিয়ে দিয়েছিল। আলিমুদ্দিনের একাংশের বক্তব্য, এমন নেতার সঙ্গে গোপনে বৈঠক দলের ভাবমূর্তির পক্ষে যথেষ্টই ক্ষতিকর। অনেকের প্রশ্ন, বিষয়টি নিয়ে কেন আলোচনা করা হল না দলে?
যদিও সেলিম (Md Salim) ঘনিষ্ঠদের মত, রাজ্য সম্পাদক দলকে শূন্যের গেরো থেকে মুক্তি দিতে চাইছেন। আর তার জন্য কিছু রাজনৈতিক বাস্তবতাও মাথায় রাখতে হচ্ছে। সিপিএম এই মুহূর্তে একমাত্র মালদহ এবং মুর্শিদাবাদেই আসন জেতার জায়গায় রয়েছে। ফলে তার জন্য যা যা করণীয়, তা-ই করা হচ্ছে।
আলিমুদ্দিনের একাংশের বক্তব্য, এমন নেতার সঙ্গে গোপনে বৈঠক দলের ভাবমূর্তির পক্ষে যথেষ্টই ক্ষতিকর। অনেকের প্রশ্ন, বিষয়টি নিয়ে কেন আলোচনা করা হল না দলে?
যদিও বুধবার নিউটাউনের হোটেলে হুমায়ুনের সঙ্গে যে বৈঠক হয়েছে, তাতে বিশেষ কিছুই ঘটেনি বলে জানিয়েছেন সেলিম। বিতর্কের মুখে তিনি বলেন, "আমি দেখতে চাইলাম, উনি কী চাইছেন। পুরো বিষয়টি আমি পার্টিতে বলব, সেখানে আলোচনা করব, তারপরে সিদ্ধান্ত হবে। দোকানে জামাকাপড় কিনতে গেলেও মাপজোক করতে হয়। রাজনীতি করতে গেলেও মাপজোক করতে হয়। সিপিএম কী করবে, তা পার্টি কংগ্রেস অথবা রাজ্য সম্মেলনে যা ঠিক হয়ে রয়েছে, সেই অনুযায়ী (সমঝোতা) হবে।"
২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে বাম-কংগ্রেস জোটের ব্রিগেড সমাবেশের মঞ্চে আব্বাস সিদ্দিকি।
ঘটনাচক্রে, ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে হুমায়ুন (Humayun Kabir) মুর্শিদাবাদ জেলায় হিন্দুদের ‘ভাগীরথীতে কেটে ভাসিয়ে দেওয়ার’ হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। এই মন্তব্যের জন্য হুমায়ুনকে গ্রেপ্তার করা উচিত বলেও সেই সময়ে মন্তব্য করেছিলেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী। শুধু তা-ই নয়, সম্প্রতি নতুন দল গড়ার পর হুমায়ুন বলেছিলেন, বিজেপির সমঝোতা করতেও তাঁর আপত্তি নেই।
যদিও সেলিম মনে করেন, "লোকসভা নির্বাচনের সময়ে বিজেপি-তৃণমূলের বাইনারি করার জন্য যখন উনি (হুমায়ুন) ৩০-৭০ বলছিলেন, কাটাকাটির কথা বলেছিলেন, আমরা তখন বিভাজনের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলাম। তখন সংবাদমাধ্যম সেই কথাকে গুরুত্ব দেয়নি। কারণ, অধীর ও সেলিমকে তখন হারানো দরকার ছিল। এই সব কথা যখন বলেছিলেন, উনি (হুমায়ুন) তৃণমূলে ছিলেন। ওঁকে (হুমায়ুন) বলেছি, হিন্দু-মুসলিম করবেন না। মন্দির-মসজিদ করবেন না। কাজ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের কথা বলুন।"
তৃণমূল থেকে অধুনা নিলম্বিত (সাসপেন্ডেড) ভরতপুরের বিধায়ক হুমায়ুনের বক্তব্য, "সদর্থক মিটিং হয়েছে। বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এর বাইরে কিছু বলব না। আমার টার্গেট, যারা এই সরকারের বিরোধিতা করতে চায়, সেই মনোভাবাপন্ন দলগুলিকে একছাতার তলায় এনে শক্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করা।"
গত বিধানসভা ভোটের সময় আব্বাস সিদ্দিকির মতো নেতার সঙ্গে জোট দলের একাংশ ভালো চোখে দেখেনি। তা নিয়ে দলের অন্দরে বিভাজনও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই বিতর্কও ছাপিয়ে গিয়েছে হুমায়ুনের সঙ্গে বৈঠক।
সিপিএমের একাংশের প্রশ্ন, দল কি তা হলে এবার ধর্মান্ধদের সঙ্গে হাত মেলাবে? ইতিমধ্যেই সিপিএমের কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান–সহ একাধিক জেলার কিছু নেতা দলের অভ্যন্তরে হুমায়ুন-সেলিমের বৈঠকের বিরোধিতা শুরু করেছেন। তাঁদের যুক্তি, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সেনার হামলা নিয়ে কিছু দিন আগে মিছিল করা হয়েছিল। তাতে হাতে গুনে জনা কুড়ি মানুষের জমায়েত হয়েছিল। আবার বাংলাদেশের দীপু দাস হত্যার প্রতিবাদে মিছিলে অন্তত ২০০ জন ছিলেন। এতেই বোঝা যাচ্ছে, বাস্তব ছবিটা ঠিক কী। সেখানে এই ধরনের সিদ্ধান্ত দলকে আরও বিচ্ছিন্ন করবে বলেই মত দলের অনেকের অনেকের।
২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের মহম্মদ সেলিম এবং অধীর চৌধুরীর সভা।
যদিও এই ধরনের সমঝোতার নজির যে দলে রয়েছে, তা-ও মনে করিয়ে দিচ্ছেন সেলিমপন্থীরা। তাঁদের মত, প্রয়াত সিপিএম নেতা তথা লোকসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বাবা এক সময়ে নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একসময়ে হিন্দু মহাসভার নেতার ছিলেন। কিন্তু তিনি হিন্দু মহাসভার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পর বর্ধমান লোকসভা আসনে নির্দল প্রার্থী হিসাবে তাঁকে সমর্থন দিয়েছিল অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি। সেলিমপন্থী এক নেতার কথায়, "রাজনীতিতে এই ধরনের বৈঠক হতেই পারে। সেলিমদা স্রেফ একটি বৈঠক করেছেন মাত্র। তাতে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের সঙ্গে আলোচনা করেই যা করার করবেন। আর আজকালকার রাজনীতিতে সব কিছু জানিয়ে করা যায় না। কিছু সিদ্ধান্ত স্বতঃস্ফূর্ত হয়। এই বৈঠকও সে রকমই একটি সিদ্ধান্ত। এ নিয়ে গেল গেল রব তোলার কিছু হয়নি।"
ফরোয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায়ের সাফ কথা, "হুমায়ুনের সঙ্গে বৈঠক করে সেলিম নিজের গুরুত্ব কমালেন। এই বৈঠক বামপন্থীদের নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এই ধরনের বৈঠকের বিরোধিতা করছি।"
সাম্প্রতিক অতীতে সিপিএমের একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দলের অন্দরে প্রশ্ন উঠেছিল। গত বিধানসভা ভোটের সময় আব্বাস সিদ্দিকির মতো নেতার সঙ্গে জোট দলের একাংশ ভালো চোখে দেখেনি। তা নিয়ে দলের অন্দরে বিভাজনও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই বিতর্কও ছাপিয়ে গিয়েছে হুমায়ুনের সঙ্গে বৈঠক। ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে সিপিএমের রাজ্য কমিটির বৈঠকের আগে একাধিক জেলা কমিটির বৈঠক রয়েছে। সেখানে হুমায়ুনের দলের সঙ্গে সমঝোতার বিরোধিতার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
এই সাক্ষাৎকে সমালোচনায় বিদ্ধ করছে বাম শরিক দলগুলিও। ফরোয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক নরেন চট্টোপাধ্যায়ের সাফ কথা, "হুমায়ুনের সঙ্গে বৈঠক করে সেলিম নিজের গুরুত্ব কমালেন। এই বৈঠক বামপন্থীদের নিয়ে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এই ধরনের বৈঠকের বিরোধিতা করছি।" আরএসপি-র প্রবীণ নেতা মনোজ ভট্টাচার্যের বক্তব্য, "মুর্শিদাবাদের যে নেতার সঙ্গে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক বৈঠক করেছেন, তিনি এমন কোনও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নন যে, মন্তব্য করতে হবে। অর্থহীন বৈঠক।"
