shono
Advertisement
West Bengal Budget 2026

আমলাশোল, হাড়জোড়ার পুনরাবৃত্তি নয়! রাজ্য বাজেটে প্রান্তিক জনজাতির জন্য খাদ্য নিরাপত্তায় জোর

খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ছাড়াও তফসিলি জাতির উন্নতিতে কেন্দ্রের পিএম-অজয় প্রকল্পে ২ হাজার গ্রামকে এই প্রকল্পে যুক্ত করা হবে।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 08:47 PM Jun 22, 2026Updated: 09:08 PM Jun 22, 2026

চিত্র ১: জঙ্গলমহল ঝাড়গ্রামের বেলপাহাড়ি ব্লকের আমলাশোল। বাম জমানায় ২০০৪ সালের মে-জুন মাসে খাদ্যাভাবে শরীরে অপুষ্টি বাসা বেঁধে শবর জনজাতির একাধিক জনের মৃত্যু হয়েছিল।

Advertisement

চিত্র ২: তৃণমূলের জমানায় জঙ্গলমহল পুরুলিয়ার বলরামপুরের হাড়জোড়া গ্রামে ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এক বছরে ৯ জনের মৃত্যু হয়। এখানেও দু'বেলা ভরপেট খাবার না পাওয়া। আর খালি পেটে নেশার তরল পান। সবমিলিয়ে অপুষ্টিতে শরীরে বিভিন্ন রোগের বাসা বাঁধায় মৃত্যু।

সোমবার রাজ্য বাজেটে ওই প্রান্তিক তিন জনজাতি - লোধা-শবর, বিরহোড় ও টোটোদের জন্য সুষম পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাদ্য বিতরণের প্রকল্প ঘোষণা করে। ওই প্রকল্পে ফি সপ্তাহে এই তিন জনজাতির পরিবারগুলিকে চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনি, লবণ এবং আলু-সহ খাদ্য প্যাকেট বিতরণ করবে রাজ্য।

যদিও দুটি ক্ষেত্রেই সরকার 'অনাহার' স্বীকার করেনি। কিন্তু অতীতের এমন পুনরাবৃত্তি যাতে আর না হয় তাই লোধা-শবর, বিরহোড় ও টোটো জনজাতির খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করল রাজ্য সরকার। সোমবার রাজ্য বাজেটে (West Bengal Budget 2026) ওই প্রান্তিক তিন জনজাতির জন্য সুষম পুষ্টিগুণ সম্পন্ন খাদ্য বিতরণের প্রকল্প ঘোষণা করে। ওই প্রকল্পে ফি সপ্তাহে এই তিন জনজাতির পরিবারগুলিকে চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, চিনি, লবণ এবং আলু-সহ খাদ্য প্যাকেট বিতরণ করবে রাজ্য। ফলে অতীতের অনাহার, অর্ধাহার, খাদ্য সংকট ঘিরে অপুষ্টি, মৃত্যুর করুণ ছবি মুছে যাবে সুষম পুষ্টিগুণ সম্পন্ন এই খাদ্য প্রকল্পে।

কেন্দ্রীয় সরকারের আওতাভুক্ত পিভিটিজি বা 'পার্টিকুলারলি ভালনারেবেল ট্রাইবাল গ্রুপ'-এ রয়েছে এই বিরহোড় ও টোটো জনজাতি। যারা ক্রমশ লুপ্তপ্রায়। জেনারেল নলেজ বা কুইজের বইয়ে কোনও জাতি লুপ্তপ্রায় এই প্রশ্নের উত্তরে লেখা থাকে - বিরহোড়। সেই জনজাতি রয়েছে পুরুলিয়ার ৩ টি ব্লক বলরামপুর, বাঘমুন্ডি ও ঝালদা ১-এ। এদের সংখ্যা প্রায় ৩০০। একইভাবে আদিবাসী তালিকাভুক্তের আওতায় থাকা টোটো জনজাতিদের বাস উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট ব্লকের একেবারে ভুটান সীমান্তে টোটোপাড়া গ্রামে। টোটোদের সংখ্যা ১৭০০ মতো।

পুরুলিয়ার বিরহোড় গ্রাম বাঘমুন্ডির ভূপতি পল্লী। নিজস্ব ছবি

এছাড়াও ওই এলাকার আরও কয়েকটি জায়গায় কয়েকটি পরিবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তবে বিরহোড়দের সংখ্যা আরও কম। এই জনজাতি মূলত 'প্রোটো অস্ট্রোলয়েড' জাতিভুক্ত। সরকারি পরিভাষায় এই জনজাতি আগে 'প্রিমিটিভ ট্রাইব গ্রুপ' নামে পরিচিত ছিল। তারা এতটাই অরণ্য নির্ভর যে পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলের ওই তিন ব্লক এলাকায় রাজ্য সরকার তাদের জন্য পাকা বাড়ি বানিয়ে দিলেও তারা এখনও গুহায় থাকতে ভালোবাসেন।

অন্যদিকে, লোধা শবর ও খেড়িয়া শবরদের সংখ্যাও ক্রমশ কমে আসছে। ঝাড়গ্রামের ৭ টি, পশ্চিম মেদিনীপুরের ১৪ টি ও পূর্ব মেদিনীপুরের ১টি ব্লকে এই জনজাতির মানুষের বসবাস। ঝাড়গ্রামের যে ৭টি ব্লকে এই জনজাতি রয়েছে সেই ব্লকগুলি হল ঝাড়গ্রাম, বিনপুর, নয়াগ্রাম, গোপীল্লভপুর ১, সাঁকরাইল, লালগড় ও বেলপাহাড়ি। একইভাবে পশ্চিম মেদিনীপুরের ১৪টি ব্লক - নারায়ণগড়, দাঁতন ১, দাঁতন ২, কেশিয়াড়ি, সবং, ডেবরা, পিংলা, খড়গপুর ১, খড়গপুর ২, মেদিনীপুর সদর, শালবনি, কেশপুর, দাসপুর ১, দাসপুর ২ ও পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ায় তাঁদের বসবাস রয়েছে। লোধা শবরের সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ।

খেড়িয়া শবর জনজাতি রয়েছে শুধুমাত্র পুরুলিয়াতেই। তাদের মোট পরিবারের সংখ্যা ৩১২৭ টি। জনসংখ্যা ১৪,০৪০ জন। জেলার ১১ টি ব্লকের ১৬৮ টি টোলায় তাদের বসবাস। ওই ব্লকগুলি হলো পুরুলিয়া ১, পুঞ্চা, মানবাজার ১, মানবাজার ২, হুড়া, বান্দোয়ান, বরাবাজার, বলরামপুর, আড়শা, পুরুলিয়া ২, কাশিপুর। তবে আড়শা, পুরুলিয়া দুই এবং কাশিপুরে একটি বা দুটি করে শবর পরিবার আছে। এই শবর জনজাতিকে ব্রিটিশরা 'অপরাধপ্রবণ' আখ্যা দিয়েছিল। তকমা ছিল 'জন্ম অপরাধী।' ১৮৭১ সালে 'ক্রিমিনাল ট্রাইব অ্যাক্ট'-এর অধীনে তাদেরকে নিয়ে আসা হয়। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৫২ সালে সেই আইন রদ হয়। তার চার বছর পর ১৯৫৬-তে তাদের 'জঙ্গলের ঘর' কেড়ে নেয় কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু এখনও অরণ্যের ঠিকানা তাদের বদলায়নি।

বিরহোড়দের জন্য গ্রামে পাকা বাড়ি। নিজস্ব ছবি

বিরহোড়দের মতো খেড়িয়া শবররাও পাহাড় জঙ্গলে থেকে শিকার করতে ভালোবাসেন। ইঁদুর, গোসাপ শিকার করে পুড়িয়ে খান। রামায়ণ, মহাভারত, চর্যাপদ এমনকি বেদ গীতাতেও শবরদের কথা রয়েছে। কিন্তু এবার তাঁদের খাদ্য সংকট ঘোচাতে বড়সড় উদ্যোগ নিল ডবল ইঞ্জিন সরকার।

বাজেটে এই ঘোষণার পর পশ্চিমবঙ্গ খেড়িয়া-শবর কল্যাণ সমিতির অধিকর্তা প্রশান্ত রক্ষিত বলেন, ‘‘এই প্রকল্পের সুবাদে ক্ষুধার জন্য আর মৃত্যু হবে না। আসলে এই জনজাতির মানুষজনের তো আর সেভাবে কোন আয়ের বন্দোবস্ত নেই। বিশেষ করে শবর জনজাতির মানুষজন এমনই যে তারা সেভাবে কাজও করতে চান না। তাই জীবন সংগ্রামে বেঁচে থাকতে এই প্রকল্প ভীষণই সহায়ক।" পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডির বিরহোড় গ্রাম ভূপতি পল্লির বাসিন্দা কাঞ্চন শিকারি বলেন, ‘‘এই খাদ্য প্যাকেজ পিছিয়ে পড়া জনজাতিদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্পের ফলে আর যাই হোক খাবারের কোন অসুবিধা হবে না।" এই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ছাড়াও তফসিলি জাতির মানুষজনদের আর্থ-সামাজিক উন্নতিতে কেন্দ্রের পিএম-অজয় প্রকল্পে চলতি আর্থিক বছরে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেড় হাজার থেকে ২ হাজার গ্রামকে এই প্রকল্পে যুক্ত করা হবে। যার ফলে আক্ষরিক অর্থেই 'আদর্শ গ্রাম' গড়ে উঠবে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement