'চিকেনস নেক’ অর্থাৎ 'শিলিগুড়ি করিডর'-এর উত্তরে তিব্বতের চুম্বি উপত্যকা এখন বেশি দূরে নয়। চিনের ‘কাট-অফ’ নীতির মোকাবিলায় উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত সেনাবাহিনীর ত্রি-শক্তি কর্পস। উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া, অসমের ধুবড়ি এবং বিহারের কিষানগঞ্জে নতুন সামরিক ঘাঁটিও গড়ে উঠেছে। এবার রাজ্য পূর্ত দপ্তরের চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়ায় শুধুমাত্র যে সামরিক বাহিনীর দ্রুত যাতায়াতের পথ মসৃণ হবে সেটাই নয়। চিকেনস নেকের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র হওয়ার পাশাপাশি উত্তরের অবহেলিত বিভিন্ন জনপদের দ্রুত অর্থনৈতিক বিকাশের জট খুলতে চলেছে। কার্যত এই তৎপরতা 'চিকেনস নেক' সংলগ্ন এলাকাকে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন’ অর্থাৎ 'এনএসআর' হিসেবে গড়ে তোলার প্রাথমিক পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন গোয়েন্দারা।
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই সুপরিকল্পিত উন্নয়নের পরিকাঠামো দিয়ে ‘চিকেনস নেক'-এর নিরাপত্তা আরও আঁটসাঁট করতে শিলিগুড়িকে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন’ অর্থাৎ 'এনএসআর' হিসেবে গড়ে তোলার কথা ভাবছে দিল্লি। দিল্লিতে কূটনৈতিক স্তরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সুপরিকল্পিত উন্নয়ন হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। বঞ্চনার অভিযোগ মিটবে। ফলে দুর্বল হবে পৃথক রাজ্যের দাবি। চিকেনস নেকের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য যেটা জরুরি। কিন্তু তৎকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের বৈরী সম্পর্কের জন্য সেটা হয়ে ওঠেনি। অথচ নিরাপত্তার প্রয়োজনে ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক রিজিওনের আদলে পরিকাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। রাজ্যে পালাবদল কেন্দ্রীয় সরকারের সেই লক্ষ্য পূরণের পথ মসৃণ করেছে। প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পর্যটনের মতো বিষয়গুলিকে মাথায় রেখে এই অঞ্চলের জন্য বাজেট বরাদ্দ যে বাড়তে চলেছে, সেটা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যতেও স্পষ্ট।
শিলিগুড়িতে হেড কোয়ার্টার বানাবে বিএসএফ, বেসক্যাম্প আইটিবিপির!
জানা গিয়েছে, এনসিআর-এর অধীন যেমন, দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকার মধ্যে সুসংহত নগরোন্নয়ন, পরিকাঠামো এবং অর্থনীতির সেতুবন্ধন করেছে একইভাবে শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে পাহাড় ও সমতলকে মিলিয়ে এই স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন গঠন করার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। এখনই ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন প্ল্যানিং বোর্ড’ গঠন করা না-হলেও উত্তরে উন্নয়নমূলক কাজে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, সড়ক ও পরিবহণ এবং অর্থ মন্ত্রকের অংশগ্রহণ বাড়বে। মূলত বঞ্চনার অভিযোগ মুছে দিতে এই যৌথ ব্যবস্থা পরোক্ষে চলবে। এমন উদ্যোগের সুবিধা এটি রাজ্যের যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো অর্থাৎ রাজ্যের সীমানায় আঘাত করবে না। উল্টে উন্নয়ন ও সুরক্ষার প্রয়োজনে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করবে।
এনসিআর-এর অধীন যেমন, দিল্লি ও সংলগ্ন এলাকার মধ্যে সুসংহত নগরোন্নয়ন, পরিকাঠামো এবং অর্থনীতির সেতুবন্ধন করেছে একইভাবে শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে পাহাড় ও সমতলকে মিলিয়ে এই স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন গঠন করার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে।
ইতিমধ্যে উত্তরবঙ্গ, পাহাড় ও সীমান্তবর্তী এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নত করতে চারটি রাস্তার দায়িত্ব রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি 'ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড' (এনএইচআইডিসিএল)-এর হাতে তুলে দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, সেবক সেনা ছাউনি-করোনেশন সেতু-কালিম্পং-বাংলা ও সিকিম সীমান্তের নতুন ১০ নম্বর জাতীয় সড়কের ৬৬ কিলোমিটার, হাসিমারা-জয়গাঁ থেকে ভারত-ভুটান সীমান্ত পর্যন্ত নতুন ৩১৭-এ জাতীয় সড়ক, বড়দিঘি-ময়নাগুড়ি-চ্যাংড়াবান্ধা থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পর্যন্ত নতুন ৭১৭ নম্বর জাতীয় সড়ক এবং শিলিগুড়ির দার্জিলিং মোড়-কার্শিয়াং-দার্জিলিং পর্যন্ত ১১০ নম্বর জাতীয় সড়ক।
সীমান্তে পাহারায় জওয়ানরা। ফাইল ছবি
এই সড়কগুলো ফোর লেনে উন্নীত হলে শুধু যে সামরিক ঘাঁটিগুলোতে রসদ এবং যুদ্ধের সামগ্রী দ্রুত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে সেটা নয়। নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শিলিগুড়ি হয়ে উঠবে প্রধান ক্লিয়ারিং এবং লজিস্টিক হাব। ফলে পরিবহণ, গুদামজাতকরণ, প্যাকেজিং এবং সাপ্লাই চেনের মতো ক্ষেত্রগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি ডুয়ার্স, দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়ের বিপর্যস্ত ইকো সিস্টেম রক্ষা করে সেখানে আন্তর্জাতিক মানের হসপিটালিটি সেক্টর, ওয়েলনেস ট্যুরিজম এবং আইটি পার্ক গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এছাড়াও সামরিক এবং আধাসামরিক বাহিনীর রসদ সরবরাহের জন্য যে বিরাট বাজার রয়েছে স্থানীয় কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সরাসরি সাপ্লাই চেনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ বাড়বে। ফলে ডুয়ার্স এবং তরাইয়ের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে।
নিরাপত্তা এজেন্সিগুলির তরফে বারবার জানানো হয়েছে, শুধু সামরিক ব্যবস্থার উন্নতি করে 'চিকেনস নেক'-এর সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যদি অসামরিক পরিকাঠামোর উন্নয়ন না হয় তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে লজিস্টিক সাপোর্ট পওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, নিরাপত্তা এজেন্সিগুলির তরফে বারবার জানানো হয়েছে, শুধু সামরিক ব্যবস্থার উন্নতি করে 'চিকেনস নেক'-এর সার্বিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যদি অসামরিক পরিকাঠামোর উন্নয়ন না হয় তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে লজিস্টিক সাপোর্ট পওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। ওই কারণে অনুপ্রবেশ রুখতে 'স্মার্ট বর্ডার' ব্যবস্থা চালু, উত্তরবঙ্গে এমস, আইআইএম, আইআইটি, ক্যান্সার হাসপাতাল, ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয়, ট্রাইবাল বিশ্ববিদ্যালয়, চারটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল শহর তৈরি এবং দার্জিলিং থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত ন্যাশনাল হাইওয়ে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাগডোগরা বিমানবন্দর, নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশন, এশিয়ান হাইওয়ে এবং পাহাড়ের বিকল্প সড়কগুলির আধুনিকীকরণ একটি ছাতার তলায় আনা হচ্ছে।
গোয়েন্দাদের একাংশের মতে, শিলিগুড়ি এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট এবং শিল্প পরিকাঠামোর অভাব বাণিজ্য বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই কারণে কেন্দ্রীয় সরকার মনে করছে, যদি এই এলাকাকে 'স্পেশাল ইকনমিক জোন' এবং 'লজিস্টিক হাব' হিসেবে গড়ে তোলা হয় তবে এলাকার চেহারা বদলে যাবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। পাশাপাশি দার্জিলিং পাহাড় এবং উত্তরের সমতলের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অনুন্নয়ন নিয়ে ক্ষোভ, বঞ্চনার অভিযোগ, পৃথক রাজ্যের দাবিরও স্থায়ী সমাধান মিলবে।
