সুমিত বিশ্বাস, পুরুলিয়া: ফের একবার মধ্যযুগীয় বর্বরতার উদাহরণ। ওঝার নিদান! তাই এক আদিবাসী মহিলা সরকারি কর্মীকে সালিশি সভা বসিয়ে ‘ডাইনি’ সাব্যস্ত করল পুরুলিয়ার বোরো থানার কুলটার গ্রামের মোড়লরা। মোড়লদের এই ফতোয়ায় ভয়ে ইতিমধ্যে গ্রাম ছেড়েছেন ওই অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী। আর তাই ওই মহিলার বৃদ্ধা মা এবং ভাইকে ১৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে মাঝিথান নামে একটি জায়গায় দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখল গ্রামবাসীদেরই একাংশ। ঘটনায় হতবাক পুলিশ প্রশাসন। ইতিমধ্যে এই ঘটনায় এলাকায় ছড়িয়েছে প্রবল উত্তেজনা।
[এক পরীক্ষায় দু’রকম প্রশ্নপত্র, বিভ্রান্তিতে পরীক্ষা ভণ্ডুল সোনারপুরে]
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, কুলটার গ্রামের বাসিন্দা এক আদিবাসী কলেজ ছাত্রী দিন সাতেক আগে দুপুরের খাওয়ার সময় হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে। তারপরেই সে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তাঁর পরিবারের সদস্যরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে না নিয়ে গিয়ে তাঁকে বোরো থানার বসন্তপুর ও ডাঙ্গরডি এলাকার দুই ওঝার কাছে নিয়ে যায়। এই ওঝারা জানায়, ওই কলেজ ছাত্রীকে নাকি ভূতে ধরেছে। কিন্তু তারা ওই ছাত্রীকে সুস্থ করতে পারেনি। তখন বলরামপুরের হরিপাল গ্রামের আরও এক ওঝার কাছে যায় ওই পরিবার। সেই ওঝার ঝাড়ফুঁক করার সময় ওই কলেজ ছাত্রী অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীর নাম মুখে আনে। তখনই ওই ওঝা তাঁদের পরিবারকে জিজ্ঞাসা করে ওই মহিলা কি তাঁদের পড়শি? পরিবার ওঝার কথায় সায় দিলে তিনি জানিয়ে দেন, ওই অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীর জন্যই কলেজ ছাত্রীর এই দুর্ভোগ। অঙ্গনওয়াড়ি ওই কর্মী ‘ডাইনি’। এরপরেই গ্রামে পরপর দু’টি সালিশি সভা বসে। সেখানে ওই আদিবাসী অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীও হাজির ছিলেন। মোড়লরা ওই মহিলার থেকে পাঁচ হাজার টাকা ছাত্রীর চিকিৎসা বাবদ আদায় করে বলেও অভিযোগ। সেইসঙ্গে ওই মহিলা মোড়লদের কাছে বলতে বাধ্য হন যে তিনি ওই কলেজ ছাত্রীকে সুস্থ করে দেবেন।
[ওলা চালককে তাড়া করে অপহৃত পুলিশকে উদ্ধার খাদ্যমন্ত্রীর]
সেই মোতাবেক ওই কলেজ ছাত্রীকে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তিও করেন। কিন্তু ওই ছাত্রী সুস্থ না হওয়ায় তাঁকে আবার গ্রামে নিয়ে আসা হয়। বৃহস্পতিবার ফের একটি সালিশি সভা বসে গ্রামে। সেখান থেকে ওই অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী প্রাণভয়ে কোনওভাবে পালিয়ে গেলে তাঁর পরিবারের সদস্যদের এভাবে বেঁধে রেখে ‘শাস্তি’ দেয় মোড়লরা। এখনও গ্রামছাড়া রয়েছেন ওই আদিবাসী অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী। বৃহস্পতিবার বিকেলে ওই গ্রামে গিয়ে পুলিশ বৃদ্ধা মা ও ভাইকে উদ্ধারের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। বরং মোড়ল ও গ্রামবাসীদের একাংশের বিক্ষোভের মুখে পড়ে তাঁরা। পুলিশ বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা থেকে রাতভর ওই গ্রামে ছিল। কিন্তু আদিবাসী ওই অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীর পরিবারের সদস্যদের তাঁরা উদ্ধার করতে পারেনি। পরে এক সিপিএম নেতাও সেখানে যান। কিন্তু তাঁকেও বেঁধে রাখা হয়। শেষপর্যন্ত বিশাল পুলিশ বাহিনীর হস্তক্ষেপে শুক্রবার সকাল ৬ টা নাগাদ ওই মহিলার মা এবং সিপিএম নেতাকে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর সকাল দশটা নাগাদ ছে়ড়ে দেওয়া হয় যুবকটিকেও। তবে গ্রামের মোড়লরা ১০০০ টাকা জমা দেওয়ার শর্ত রাখেন। শেষপর্যন্ত ছাগল বিক্রি করে ওই টাকা দেয় ওই মহিলার পরিবার। জানা গিয়েছে, এখনও কুলটার গ্রামে ব্যাপক উত্তেজনা রয়েছে। সেই সঙ্গে পুলিশও মোতায়েন রয়েছে। ইতিমধ্যে বিজ্ঞান মঞ্চের সদস্যরাও ওই গ্রামে হাজির হয়েছেন। এর পাশাপাশি ওঝার কাছ থেকে ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে পুরুলিয়া দেবেন্দ্রনাথ সদর হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছে।
[পুজোর আগেই থিমের চমক, শহর মাতাচ্ছে ‘বালির গণেশ’]
ছবি: অমিত সিং দেও।
The post ওঝার নিদানে ‘ডাইনি’ সাব্যস্ত মহিলা, বেঁধে রাখা হল ভাই ও মাকে appeared first on Sangbad Pratidin.
