'লজ্জাই নারীর ভূষণ', এই শিক্ষাতেই শিক্ষিত আমাদের সমাজ। কিন্তু, যখন সেই 'লজ্জা'টাই হাটেবাজারে বিকিয়ে দেওয়া হয়!! রাজ্যে দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের (Bengal Election 2026) আগে সমাজমাধ্যমে ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়েছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিকর মিম (Mamata Banerjee Meme)। একজন ৭১ বছর বয়সী মহিলার শরীরকে কুৎসিত রসিকতার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের এক যুবকের অ্যাকাউন্ট থেকে ছবিটি শেয়ার হতেই অভিযোগের তীর বিজেপির দিকে।
ভোট আবহে বিরোধী দলই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে যৌনগন্ধী আক্রমণ চালাচ্ছে বলে ফুঁসে উঠেছে নাগরিকসমাজ। রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্রে একজন মহিলাকে সমাজমাধ্যমে 'বেআব্রু' করার মতো আগ্রাসী মনোভাবের তীব্র সমালোচনা করছে সাধারণ মানুষ থেকে সেলিব্রিটি প্রত্যেকেই। রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে একজন নারীর এই অসম্মান মেনে নিতে পারেননি কট্টর বামপন্থীরাও।
অরিত্র দত্ত বণিক থেকে শুরু করে অনন্যা চট্টোপাধ্যায় সহ টলিপাড়ার অনেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে তৈরি এই কুরুচিকর মিমের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। ব্যক্তি নির্বিশেষে দল পছন্দ হওয়াটা স্বাভাবিক, সেই বিষয়টিকে সামনে রেখে অরিত্রর বক্তব্য, 'সমালোচনা আক্রমণ মিম ট্রোল ইত্যাদি কখনোই সেই জায়গায় নামানো উচিৎ নয় যা সমাজকে ধ্বংস করে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পছন্দ নয়, ভোট দেবেন না তৃণমূল বাদে অন্য অনেক বোতাম ইভিএমে পাবেন। যাকে খুশি ভোট দেবেন। কাউকে না পোষালে নোটাতে দেবেন। আইন সেই অপশানও দিয়েছে নাগরিককে। তৃণমূল আসার আগেও পৃথিবী চলতো তৃণমূল না থাকলেও চলবে। কিন্তু ক্যারিকেচারের নামে যে মুখ্যমন্ত্রীর যে চিত্র ছড়ানো হচ্ছে তা অসভ্যতা এবং অসুস্থ মানসিকতার পরিচয়। আমি শুধু দেখছি নির্বাচন কমিশনের আওতায় থাকা পুলিশ বিভাগ বিশেষত সাইবার সেল আর কতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকে।' কারও নজরে ছবিটি পড়লে সেটা ডিলিট করার অনুরোধ করেছেন।
অভিনেত্রী রূপাঞ্জনা মিত্র ইন্ডাস্ট্রির সহকর্মী ও বিরোধী দলের সদস্য রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, পাপিয়া অধিকারী, শর্বরী মুখোপাধ্যায়ের উদ্দেশে প্রশ্নবাণ, একজন মহিলা হিসেবে এই মিমটি নিয়ে কী প্রতিক্রিয়া। পরিচালক-অভিনেত্রী মানসী সিনহা, ছবি নির্মাতা প্রদীপ্ত ভট্টচার্য সাইকোলজিস্ট রত্নাবলী রায়ের একরটি পোস্ট শেয়ার করে এই মিমের তীব্র বিরোধীতা করেছেন।
পরিচালক পারমিতা মুন্সীর মতে, 'যখন রাজনৈতিক বিরোধিতা বিকৃত হয়ে যৌন বিদ্রূপে পরিণত হয়, তখন গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় অশালীনতার অবক্ষয় প্রত্যক্ষ করি। যেমনটা আজ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর ব্যঙ্গচিত্রর দেখলাম। এই কদর্যতাকে ব্যঙ্গ বলা যায় না, রাজনীতির ভাষায় এগুলো একধরনের সিম্বলিক ভায়োলেন্স। সেখানে যৌন হয়রানি একটা মাধ্যম।' ক্ষোভ উগরে দিয়ে আর কী লিখলেন?
অভিনেত্রী অনন্যা চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিনি মিমটি নিজের চোখে দেখেননি আর দেখার ইচ্ছেও নেই। রাজনৈতিক মত আলাদা হলেও সর্বপ্রথম একজন মানুষ, তারপর একজন মহিলা। তাই নারীজাতির প্রতি এই ধরণের অপমান, কদর্যতা কখনই মেনে নিতে পারেন না। রাজনীতি সম্পর্কে খুব বেশি না বুঝলেও বাংলার রুচিবোধ, শিক্ষা, আদর্শ, সংস্কৃতির বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। তাই সেই মূল্যবোধের শিক্ষা থেকেই প্রতিটি ইন্দ্রিয় যেন তপ্ত হয়ে উঠছে। পোস্টের শেষে ধিক্কার জানিয়েছে লিখছেন, 'ধিক ধিক ধিক!'
অভিনেত্রী রূপালি রাই ভট্টাচার্যও একজন নারী হিসেবে মমতার সমর্থনে লিখেছেন, 'আমি ওঁর অনুগামী নই কিন্তু সাংবিধানিক চেয়ার তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মহিলা হিসেবে সম্মান করতে আমি বাধ্য। শুধু আমি নয় সবাই বাধ্য। যে নোংরামি হচ্ছে তার প্রতি ঘৃণা জানাই। আর যারা এই কাজ করেছে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কোনও মানুষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ক্ষোভপ্রকাশের এই পদ্ধতি শুধু অশিক্ষা নয়, বিকৃতির লক্ষণ ।'
