অকালে অস্তাচলে অরুণোদয়! সহজ কথার জীবন পাঁচালিতে জটিল গোলকধাঁধায় রেখে রাহুল যে কখন ‘কাট’বলে চলে গেলেন তা ঘুণাক্ষরেও কেউ টের পেল না! অভিনেতা, থিয়েটার শিল্পী সর্বোপরি একজন ভালো বক্তা-লেখকের এই আকস্মিক মৃত্যুতে তৈরি হয়েছে বিরাট শূন্যতা। দেখতে দেখতে রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছাড়া ১৩ দিন অতিক্রান্ত। তালসারিতে 'ভোলে বাবা পার করেগা'-র শুটিং চলাকালীন কীভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন, সঠিক তদন্তের দাবিতে তোলপাড় টলিপাড়া। রাহুলের অকাল প্রয়াণ ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক কলাকুশলীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। নতুন এসওপি তৈরি করতে উদ্যোগী হয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। এর মাঝেই নাকি ইমপা, আর্টিস্টস ফোরাম এবং টেকনিশিয়ানদের ফেডারেশনকে চিঠি দিলেন রানা সরকার।
সূত্রের খবর, প্রযোজকের দাবি, শুটিং চলাকালীন তা ইন্ডোর হোক বা আউটডোর নেশাগ্রস্থ জিনিস নিষিদ্ধ করতে হবে। শুটিং ফ্লোর বা লোকেশনে ধূমপান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছেন বলেই খবর। মদ ও অন্য নেশা সংক্রান্ত কোনও কিছুই শুটিং সূচি জুড়ে বলবৎ করার প্রস্তাব রেখেছেন রানা সরকার। কেউ যদি এই নিয়ম ভঙ্গ করে তাহলে তন মসের জন্য তাঁকে কর্মচ্যুত করা হবে যার মেয়াদ প্রয়োজনে এক বছর পর্যন্ত বাড়তে পারে। সেই সঙ্গে এক লক্ষ টাকা জরিমানাও ধার্য করা হবে। কাস্ট ও ক্রুর কোনও সদস্যকে মদ্যপ বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া গেলে সেই দায় গ্রহণ করতে হবে প্রযোজক, পরিচালক, কার্যনির্বাহী প্রযোজক এবং প্রোডাকশন কন্ট্রোলারকেও।
পাওলির মতে, "বুম্বাদা সহ ইন্ডাস্ট্রির প্রত্যেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে রানাদার এই প্রস্তাব রাহুলের মৃত্যুর সঠিক তদন্তের দাবি, এসওপি কার্যকর হওয়ার মতো মূল বিষয়গুলো থেকে ফোকাস সরিয়ে ফেলছে।"
রানা সরকারের এই প্রস্তাবে কী মত ইন্ডাস্ট্রির প্রথম সারির পরিচালক, অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের?সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালকে পরিচালক শুভ্রজিৎ মিত্রর মতে, "মদ, গাঁজা বা মারাত্মক নেশাগ্রস্থ কোনও জিনিস হলে সেটা অবশ্যই নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। কারণ এগুলো দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু, সিগারেট, বিড়ি বা গুটকা খেয়ে তো কেউ নেশাগ্রস্থ হয়ে পড়বে না। শুটিংয়ের ফাঁকে অনেক অভিনেতা, অভিনেত্রী, টেকনিশিয়ান, লাইটম্যান ক্লান্তিভাব কাটাতে সিগারেটে সুখটান দেয়। সেটা তো অসুবিধার কিছু নয়। একজন পরিচালক শটের শেষে মনিটারে চোখ রাখার সময় যদি সিগারেট খায় সেখানে সমস্যা কোথায়? ফ্লোর বা শুটিং লোকেশনের বাইরে গিয়ে সিগারেট খেয়ে আবার ফিরে আসাটাও তো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। এতে কাজেরও অনেক দেরি হয়ে যায়। অগ্নিকাণ্ড না ঘটে সেই জন্য বহুদিন আগেই ফ্লোরে সিগারেট খাওয়া বন্ধ করা হয়েছে। কিন্তু, কোনও বাড়িতে বা রাস্তায় শুটিং চলাকালীন সিগারেট খেলে তো সমস্যা হওয়ার কথা নয়, বরং সেটা ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয়ে যায়।"
ইমপা, আর্টিস্টস ফোরাম এবং টেকনিশিয়ানদের ফেডারেশনকে চিঠি দিলেন রানা সরকার। সূত্রের খবর, প্রযোজকের দাবি শুটিং চলাকালীন তা ইন্ডোর হোক বা আউটডোর নেশাগ্রস্থ জিনিস নিষিদ্ধ করতে হবে।
অভিনেতা রণজয় বিষ্ণুর বক্তব্য, "প্রথমত শুটিং ফ্লোরে কেউ নেশাগ্রস্থ অবস্থায় ক্যামেরায় শট দেয় না। কোনও শিল্পী অস্বাভাবিক অবস্থায় এলে তাঁকে তো শুটিং-ই করানো হবে না। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে শুটিং চলাকালীন মদ বা নেশাগ্রস্থ জিনিস নিষিদ্ধ করার প্রশ্নই ওঠে না। আর যদি সিগারেটের কথা বলা হয়, তাহলে বলব প্যাকেটের গায়েই তো লেখা থাকে শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। যাঁরা খায় বা খাবে তাঁদের নিজেদের জন্যই তো খারাপ। তাই স্বাস্থ্যের কথা ভেবে বিড়ি-সিগারেট না খাওয়াই শ্রেয়।"
রানা সরকারের প্রস্তাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া পাওলি দামের। তাঁর অকপট জবাব রাহুলের মৃত্যর সঠিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এই ধরনের প্রস্তাব পেশ করে মুখ্য বিষয়টার উপর থেকেই ফোকাস সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালকে অভিনেত্রী বলেছেন, "শুটিং সেট প্রত্যেকের কাছে তাঁর কর্মক্ষেত্র। সেখানে একটা স্মোকিং জোন থাকে। যাঁরা কাজ করেন প্রত্যেকে পেশাদার শিল্পী। কেউ-ই কখনও নেশাগ্রস্থ অবস্থায় চলে এসে শুটিং করে না। এই মুহূর্তে যেটা সবচেয়ে বেশি জরুরি সেটা হল এসওপি-গুলো কার্যকরী করা। শুটিং চলাকালীন ইউনিটের কারও কোনও ক্ষতি হলে সেই দায় প্রযোজনা সংস্থাকে নিতেই হবে, নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব তো প্রযোজকেরই হওয়া উচিত।"
ক্ষোভ উগরে দিয়ে পাওলির সংযোজন, "রাহুলের মতো একজন শিল্পী যখন আমাদের ছেড়ে চলে গেল তখন নিরাপত্তা নিয়ে টনক নড়ল। অনেক আগে হওয়া উচিত ছিল। আমরা প্রত্যেকেই কাজকে ভালোবাসি বলেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করি। যত দ্রুত সম্ভব এসওপি মেনে শুটিং লোকেশনে অ্যাম্বুলেন্স, প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা উচিত। বুম্বা দা সহ ইন্ডাস্ট্রির যাঁরা বয়জ্যেষ্ঠ তাঁরা প্রত্যেকে চেষ্টা করছেন নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নিশ্চিত করতে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে রানাদার এই প্রস্তাব পেশ অযৌক্তিক।"
