আইপিএল মানেই বিনোদন! চার-ছক্কার ডিস্কো নাচের দামামায় চাপা পড়ে যায় 'সত্যিকারের' ক্রিকেট! নাচ-গান-বলিউডি মাদকতা আসলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে! ১৯তম সংস্করণে এসেও অনেকে আইপিএল নিয়ে এরকম ভাবেন। ভাবতেই পারেন। গণতান্ত্রিক দেশে ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে। মুশকিল কী জানেন, আমি-আপনি যখন এইসব আলোচনা করছিলাম, সেই সময় ব্রিজেশ শর্মা নামের এক আনকোরা ক্রিকেটার হত্যে দিয়ে ইডেনের নেটে পড়েছিলেন। বন্ধুদের থেকে টাকা নিয়ে এক দিনমজুরের সন্তান জম্মু থেকে দিল্লি হয়ে চলে এসেছিলেন কলকাতায়। আর বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টি লিগ থেকে সোজা রাজস্থান রয়্যালসের জার্সিতে। সেখানে স্বপ্নের অভিষেক। আমি-আপনি আলোচনা করে যেতেই পারি। ততক্ষণ ব্রিজেশ (Brijesh Sharma) তাঁর গতিতে-সুইংয়ে মুগ্ধ করে দিক গোটা ক্রিকেটবিশ্বকে।
এখন কেউ তাঁকে বলছে 'উধমপুর এক্সপ্রেস', কেউ-বা 'উধমপুরের শের'। এরকম নামডাক আরও হবে ব্রিজেশের। আলবাত প্রাপ্য। এখনও দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে খেলার সৌভাগ্য হয়নি। আজ থেকে মাস চারেক আগেও ভারতীয় ক্রিকেটমহলে অজানা ছিল ব্রিজেশের নাম। তবে যাঁরা জানার, ঠিকই জানত। বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টি লিগের সুবাদে বাংলার ক্রিকেটের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের কাজে ব্রিজেশ অচেনা ছিলেন না। আইপিএলের নিলামে রাজস্থান রয়্যালস ৩০ লক্ষ টাকা দিয়ে কেনায় দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের নজর পড়ে। খবর হয়। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, সংগ্রাম বা ক্রিকেট সাধনার গল্প নিয়ে চর্চা হয়। তা বেশ। এরকম অনেকেই দল পান, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রথম একাদশে সুযোগই হয় না। ক্রমশ তাঁদের গল্পগুলো গুগলের পাতায় বহু বহু পিছনে চলে যায়। যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না।
ব্রিজেশের গল্প কী হবে, সেটা সময়ই বলবে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার। নিলামে নেওয়ার পর তিনি রাজস্থান ম্যানেজমেন্টের আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন। তাই এবারের আইপিএলের প্রথম ম্যাচেই দলে জায়গা করে নিয়েছেন। আর শুরুতেই চমক। সিএসকে'র ১৪.২০ কোটির তারকা কার্তিক শর্মাকে জব্দ করলেন ব্রিজেশ। আইপিএলের অভিষেক ম্যাচে উইকেট। কোটি টাকার লিগে বোলারদের তুলোধোনা করা হবে, এটাই দস্তুর। সেখানে প্রথম ম্যাচে ব্রিজেশের বোলিং পরিসংখ্যান ৩ ওভারে ১৭ রান দিয়ে ১ উইকেট। ভুলে গেলে চলবে না সঞ্জু স্যামসনকে তারকা বানিয়েছে এই রাজস্থান রয়্যালস। কিংবা ১৩ বছরের বৈভব সূর্যবংশীকে কোটি টাকা দিয়ে তারাই তুলে নিয়েছিল। কয়লা থেকে হিরে খুঁজে বের করতে তারা জানে। ব্রিজেশকে মাথা ঠান্ডা রেখে ধারাবাহিক পারফর্ম করে যেতে হবে। কাজটা নিঃসন্দেহে কঠিন, কিন্তু অসম্ভব কি?
আসলে ব্রিজেশের জীবনে 'অসম্ভব' শব্দটার জায়গা বড্ড কম। তাঁর ২৭ বছরের জীবন বারবার অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করেছে। বাবা পেশায় দিনমজুর। জম্মু ও কাশ্মীরের উধমপুরের শর্মা পরিবারে অনটন ছিল নিত্য সঙ্গী। পড়াশোনায় কোনও দিনই সেভাবে টান ছিল না ব্রিজেশের। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকতেন ক্রিকেট মাঠে। জম্মু ও কাশ্মীরের অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২৫ বিভাগে খেলেছেন। কিন্তু কোনও দিনই নিয়মিত হতে পারেননি। জীবনে মোড় এল দু'টো ঘটনায়। এক, দিল্লিতে 'ইউনিক স্পোর্টস ক্লাব'-এ দীপক পুনিয়ার কোচিংয়ে বোলিংয়ের আগাগোড়া শুধরে নেন। দ্বিতীয়টার সঙ্গে রয়েছে এই বাংলার মাটির যোগ। গত বছর বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টি লিগে মালদা স্ম্যাশার্সের হয়ে তাঁর পারফরম্যান্স সবাইকে চমকে দেয়। ৭ ম্যাচে নিয়েছিলেন ১১টি উইকেট। ইডেন গার্ডেন্সের ব্যাটিং-স্বর্গে ডেথ ওভারে ব্রিজেশের নিয়ন্ত্রিত বোলিং নজর কাড়ে রাজস্থান রয়্যালসের স্কাউটিং দলের। অবশেষে নিলামে তাঁকে ৩০ লক্ষ টাকায় তুলে নেয় রাজস্থান।
ব্রিজেশের জীবনে 'অসম্ভব' শব্দটার জায়গা বড্ড কম। তাঁর ২৭ বছরের জীবন বারবার অসম্ভবকে সম্ভবে পরিণত করেছে। বাবা পেশায় দিনমজুর। জম্মু ও কাশ্মীরের উধমপুরের শর্মা পরিবারে অনটন ছিল নিত্য সঙ্গী।
এখানে আরেকজনের কথা না বললেই নয়। যাঁর ক্রিকেট জীবন কামব্যাকে মোড়া, তাঁর জীবনে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অবদান থাকবে না, তা কখনও হয়। নিলামে দল পাওয়ার পর ব্রিজেশ বলেছিলেন, "বাইরে থেকে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কঠিন কাজ ছিল। আমার সৌভাগ্য যে, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কে সব সময় পাশে পেয়েছি। স্যর বুঝেছিলেন, আমার মধ্যে ভালো খেলার প্রতিভা আছে। ওঁর জন্য বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টি লিগেও খেলতে পেরেছি। যখন নিলামে নাম লিখিয়েছিলাম, তখনও উনি পাশে ছিলেন।" জহুরি জহর চেনে। সৌরভ ভুল করেননি। বেঙ্গল প্রো টি-টোয়েন্টি লিগের পারফরম্যান্সের সুবাদে এবার ভারত মাতাতে তৈরি ব্রিজেশ। তবে এখনও বাংলার হয়ে খেলা হয়নি বুমরাহ-রাবাডার ভক্তের। আশা করা যায়, এবার সেই লক্ষ্যপূরণও হবে। কে বলতে পারে মহম্মদ শামি, আকাশ দীপ, মুকেশ কুমারের পর ভারতীয় দলকে আরও এক গতিতারকা উপহার দেবে না বাংলা!
সেই সঙ্গে এটাও আগ বাড়িয়ে বলে রাখা যায়, সুযোগ এলে সদ্ব্যবহার করতে ছাড়বেন না ব্রিজেশ। জীবন তো আসলে পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনার কাহিনি। ভালো-মন্দ থাকবে। আলো-অন্ধকার আসবে। তার মাঝে বিপিএলের মতো একটা সুযোগও আসবে। তার জন্য তৈরি থাকতে হবে। আইপিএলের চোখ ধাঁধানো আলোর উলটো পিঠে ব্রিজেশের মতো কোনও এক ক্রিকেটার জীবনযুদ্ধে লড়ে যাবেন। মাটি কামড়ে পড়ে থেকে অনুশীলন চালিয়ে যাবেন। আমার-আপনার আলোচনা থামবে না। ব্রিজেশরাও থামতে জানেন না। শুধু তাঁরা জিতে গেলে ক্রিকেট জিতে যায়। জিতে যায় জীবন। জেতে আমার-আপনার গল্পগুলো। বিনোদনের মোড়কে আইপিএল নাহয় সেই গল্পগুলোই লিখে রাখুক।
