দারিদ্র, অনিশ্চয়তা আর লড়াই - এই তিন শব্দেই যেন গড়ে উঠেছে মধ্যপ্রদেশের তরুণ পেসার মঙ্গেশ যাদবের জীবনকথা। কিন্তু সেই সংগ্রামের গল্পই নতুন মোড় নিয়েছে। আইপিএলের মিনি নিলামে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু তাঁকে ৫.২০ কোটি টাকায় দলে নিয়েছে। মঙ্গেশের এই উত্থান তাঁর পরিবারের বহু বছরের কষ্টের অবসান ঘটানোর গল্পও।
মধ্যপ্রদেশের বোরগাঁও গ্রামের এক ভাড়াবাড়িতে বেড়ে ওঠা মঙ্গেশের জীবন ছিল সীমিত আয়ের মধ্যে টিকে থাকার লড়াই। তাঁর বাবা রাম আওধ যাদব পেশায় ট্রাকচালক। ভোর ৩টেয় উঠে দিনভর ঝুঁকিপূর্ণ পথে গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাতেন। ছেলের ক্রিকেটের স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে তাঁকে বহুবার ঋণ নিতে হয়েছে, ধার করতে হয়েছে আত্মীয়-পরিজনের কাছে।
রাম আওধ যাদবের কথায় ফুটে উঠেছে সেই অসহায়তার ছবি। "আমি রোজগারের জন্য অনেক কষ্ট করেছি। বহু রাত বিনিদ্র কাটাতে হয়েছে। ভাবতাম, কীভাবে ওর জন্য টাকা জোগাড় করব! ট্রাক ড্রাইভারের জীবন কোনও জীবনই নয়। খাওয়া-দাওয়ারও সময় থাকে না। গাড়ি ভর্তি থাকলে নামানোর চিন্তা, আর খালি থাকলে মাল তোলার চিন্তা! এই নিয়েই দিন কেটে যায়।" বলছেন মঙ্গেশের বাবা।
"আমি রোজগারের জন্য অনেক কষ্ট করেছি। বহু রাত বিনিদ্র কাটাতে হয়েছে। ভাবতাম, কীভাবে ওর জন্য টাকা জোগাড় করব! ট্রাক ড্রাইভারের জীবন কোনও জীবনই নয়। খাওয়া-দাওয়ারও সময় থাকে না।" বলছেন মঙ্গেশের বাবা।
ক্রিকেটের আসার আগে মঙ্গেশ জীবিকা নির্বাহ করতেন টেনিস বল টুর্নামেন্ট খেলে। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের বিভিন্ন জায়গায় খেলে বেড়িয়েছেন। তবে সেসব জায়গায় গিয়েছেন লোকাল ট্রেন আর সাধারণ বাসে। ১৬ বছর বয়সে তাঁর জীবনে নয়া মোড় আসে। বন্ধুর সাহায্যে তিনি নয়ডায় যান। 'ওয়ান্ডার ক্রিকেট ক্লাবে' যোগ দেন। সেখানেই কোচ ফুলচাঁদ শর্মা তাঁর প্রতিভা চিনে নেনে। তাঁর সুপারিশেই তিন বছরের জন্য হস্টেলের খরচ মকুব করে দেন। মঙ্গেশের কথায়, "ফুলচাঁদ স্যরের জন্যই এতটা পথ আসতে পেরেছি। বাবা অনেক কষ্টে ২৪ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। যা এক মাসেই শেষ হয়ে যায়।"
কোচ ফুলচাঁদ শর্মার কথাতেও উঠে আসে লড়াইয়ের কথা। "মঙ্গেশের মধ্যে প্রতিভা দেখেছিলাম। কিন্তু ওর থাকা-খাওয়ারও কোনও ঠিক ছিল না। আমি ওকে হস্টেলে থাকতে বলি। আমার কাছে টাকা নয়, খেলোয়াড়ের যোগ্যতাই আসল।" ২০২৫ সালের মধ্যপ্রদেশ টি-টোয়েন্টি লিগে গোয়ালিয়র চিতার হয়ে ছ'ম্যাচে ১৪ উইকেট নিয়ে 'প্লেয়ার অফ দ্য টুর্নামেন্ট' হন মঙ্গেশ। এরপর সৈয়দ মুস্তাক আলিতে অভিষেক। সেখান থেকেই আইপিএলের দরজা খুলে যায় তাঁর সামনে।
কোচ ফুলচাঁদ শর্মার কথায়, "মঙ্গেশের মধ্যে প্রতিভা দেখেছিলাম। কিন্তু ওর থাকা-খাওয়ারও কোনও ঠিক ছিল না। আমি ওকে হস্টেলে থাকতে বলি। আমার কাছে টাকা নয়, খেলোয়াড়ের যোগ্যতাই আসল।"
আইপিএল (IPL 2026) ট্রায়ালে দীনেশ কার্তিকের কাছে রীতিমতো পরীক্ষা দিতে হয়েছিল। সেখানে দেখা হয়, নানান পরিস্থিতিতে কীভাবে বল করতে পারেন মঙ্গেশ। সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে মঙ্গেশ বলেন, "ডিকে স্যর আমাকে নতুন বল থেকে শুরু করে ডেথ ওভার পর্যন্ত বল করতে বলেন। ওখানেই বুঝেছি, বড় স্তরের ক্রিকেটাররা কতটা ভিন্নভাবে চিন্তা করেন।" আজ আইপিএলের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মঙ্গেশ শুধু নিজের স্বপ্নই পূরণ করেননি, পূরণ করেছেন তাঁর বাবার বহু বছরের ত্যাগ ও কষ্টের মূল্য। আবেগঘন কণ্ঠে তাঁর বাবা বলেন, "আমি কখনও ভাবিনি, একজন ট্রাক ড্রাইভার এত সম্মান পেতে পারে। মঙ্গেশ আমার জন্য যা করেছে, তা আমি কোনওদিন কল্পনাও করিনি।" আসন্ন আইপিএলের উদ্বোধনী ম্যাচে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে মাঠে নামবে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। যশ দয়ালের অনুপস্থিতিতে সুযোগ পেয়ে যেতে পারেন মঙ্গেশ।
