বৈভব অরোরা আজ জানেন, জীবন তাঁকে সহজে কিছু দেবে না। লাল কার্পেটের অভিজাত সুখী পৃথিবী বরাদ্দ নয় তাঁর। বরং ঘাত-প্রতিঘাতের জোয়াল টেনেই এগনোই বৈভবের বিধি। ছেলেবেলায় অর্শদীপ সিংয়ের সঙ্গে বড় সখ্য ছিল নাইট পেসারের। দু’জনে একই সাইকেলে চেপে ট্রেনিংয়ে যেতেন, লাল বল নিয়ে কসরৎ করতেন। শুধু বৈভব জানতেন না, অচিরেই দু’জনার দু’টি পথ, বেঁকে যাবে দু’টি দিকে! অর্শদীপ প্রথমে পাঞ্জাব। কালে-কালে ভারত। বৈভব সেখানে পাঞ্জাবে ডাকই পাননি। পাঞ্জাবপুত্তরের ক্রিকেট কেরিয়ার প্রথমেই ঘোর অমানিশায় ছেয়ে যেতে পারত। যদি না তাঁর শৈশবের কোচ হিমাচল প্রদেশে খেলার বন্দোবস্ত করতেন।
মন খারাপ হয় না? অদৃষ্টের কষাঘাত বারবার সহ্য করতে-করতে ক্লান্ত লাগে না? দিন শেষে আপনি মানুষ তো।
‘‘লাগে। মন বেশি খারাপ হলে, অর্শদীপকে ফোন করি। আমাদের বন্ধুত্বটা আজও টিকে আছে,’’ শুক্রবার মধ্য কলকাতার পাঁচতারা টিম হোটেলে বসে অস্ফুটে বলেন বৈভব। কেমন একটা ফ্যাকাশে হাসি দেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসকে মেনে নেওয়ার হাসি। দুঃখকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে সুখে থাকার ফাঁপা হাসি।
করবেন কী বৈভব? বরাবর ‘সেকেন্ড ফিডল’-এর কপাল তাঁর। চিরকাল দ্বিতীয় শ্রেণির কামরার অভিযাত্রী তিনি, প্রথম শ্রেণীর নন। আশৈশবের বন্ধু অর্শদীপ আজ বিশ্বজয়ী। কেকেআর সংসারে তাঁর সঙ্গে অ্যাদ্দিন বোলিং ওপেন করতেন যিনি, সেই হর্ষিত রানাও এখন ভারতীয় দলের নিয়মিত সদস্য মোটামুটি। কোথাও গিয়ে মনে হয়, সময়ের নিয়মে বৈভব নিয়তির সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে শিখে গিয়েছেন। অহেতুক ঝুট-ঝামেলায় না গিয়ে। বলেও দেন, ‘‘হয়তো ঈশ্বর তাই চান। চান, আমি আরও লড়ি। খাটি। পরিশ্রম করি। ঠিক আছে, লড়ব আমি।’’
বরাবর ‘সেকেন্ড ফিডল’-এর কপাল তাঁর। চিরকাল দ্বিতীয় শ্রেণির কামরার অভিযাত্রী তিনি, প্রথম শ্রেণীর নন। আশৈশবের বন্ধু অর্শদীপ আজ বিশ্বজয়ী। কেকেআর সংসারে তাঁর সঙ্গে অ্যাদ্দিন বোলিং ওপেন করতেন যিনি, সেই হর্ষিত রানাও এখন ভারতীয় দলের নিয়মিত সদস্য মোটামুটি।
কিন্তু ওই যে, দিন শেষে উপরওয়ালা বলে আছেন একজন। যাঁর আলাদা আদালত আছে। আলাদা বিচার রয়েছে। হর্ষিত রানা এ দিন সন্ধেয় সরকারিভাবে আইপিএল থেকে ছিটকে যাওয়ার পর পরিস্থিতি যা, তাতে কেকেআরের ভারতীয় পেস ব্যাটারিকে নেতৃত্ব দেওয়ার লোক একজনই–বৈভব অরোরা! বাকি ভারতীয় পেসাররা কেউ সোনালি-বেগুনি জার্সিতে অপরীক্ষিত, কেউ বা নবাগত। উমরান মালিক। আকাশ দীপ। কার্তিক ত্যাগী। এঁরা কেউ তিন তারা জার্সির ওজন জানেন না এখনও। অগত্যা বৈভব, ইহকাল ‘সেকেন্ড ফিডল’-এর জোড়াতালি জীবন কাটানো বৈভব, রাতারাতি ‘লিডার অফ দ্য প্যাক’!
চাপ লাগছে?
‘‘হর্ষিত আর আমার জুটিটা গত তিন বছর ধরে দারুণ জমে গিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ওর এ বছর লেগে গেল। জানি না ফিরবে কবে (তখনও বৈভব জানতেন না, সন্ধেয় পেস-বন্ধু ছিটকে যাবেন)। তাই এ বছর নতুন পেস পার্টনার খুঁজতে হবে। আমি জানি, সিনিয়র বলে আমার উপর দায়িত্ব অনেক বেশি থাকবে। যে আমার সঙ্গে জুটি বাঁধবে, সে তো নতুন। তাই আমাকেই পেস বোলিংয়ের নেতৃত্ব দিতে হবে,’’ চোয়ালচাপা এক সংকল্পের ছোঁয়া পাওয়া যায় বৈভবের গলায়। ‘‘তবে আমি চাপ হিসেবে এটাকে দেখি না। বরং অ্যাডভান্টেজ বলতে পারেন। দলের বোলিংকে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পায় ক’জন? আমার কাছে এটা একটা চ্যালেঞ্জ। যার মহড়া নিতে আমি প্রস্তুত।’’
হর্ষিত আর আমার জুটিটা গত তিন বছর ধরে দারুণ জমে গিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে ওর এ বছর লেগে গেল। আমি জানি, সিনিয়র বলে আমার উপর দায়িত্ব অনেক বেশি থাকবে। যে আমার সঙ্গে জুটি বাঁধবে, সে তো নতুন। তাই আমাকেই পেস বোলিংয়ের নেতৃত্ব দিতে হবে।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের অভিমত হল, কেকেআরের ব্যাটিং এবারও যথেষ্ট শক্তিশালী। কিন্তু চোট-আঘাতে জর্জরিত হয়ে টিমটার বোলিংকে প্রবল অনিশ্চিত দেখাচ্ছে। হর্ষিত রানা নেই। শ্রীলঙ্কা পেসার মাথিশা পাথিরানা কবে ম্যাচ ফিট হবেন, কেউ জানে না। কাগিসো রাবাডা-মিচেল স্টার্ক-প্যাট কামিন্স-জোফ্রা আর্চারের মতো ভয়াল গতির পেসার নেই দলে। তার মধ্যে বিপত্তি বাড়িয়েছে আন্দ্রে রাসেলের অবসর। ব্যাটে ছেড়েই দিলাম। রাসেলের বোলিংও অতুলনীয় ছিল। মিডল ওভারে এসে পার্টনারশিপ ভাঙাই হোক কিংবা ডেথ ওভারে কৃপণ বোলিং–দু’টোতেই অসম্ভব পারদর্শী ছিলেন ‘ড্রে রাস’। ক্যামেরন গ্রিন-রভম্যান পাওয়েল, দু’জনেই বোলিং করতে পারেন। কিন্তু তাঁরা মূলত ব্যাটার। যিনি প্রয়োজনে মিডিয়াম পেস বোলিং করে দিতে পারেন। নির্দ্বিধায় লিখছি, বোলিংয়ে এঁরা কেউ রাসেল নন।
‘‘দেখুন, রাসেলের দশ-বারো বছরের অভিজ্ঞতা ছিল। গত কয়েক বছরে মিডল ওভার, ডেথ ওভার বোলিং নিয়ে আমাদের ভাবতেই হয়নি,’’ বলে যান বৈভব। ‘‘আর বিশেষজ্ঞরা খুব একটা ভুল বলছেন না। চোট-আঘাত সত্যি ভোগাচ্ছে আমাদের। তবে আমাদের একটা প্লাস রয়েছে। আমাদের ব্যাকরুমটা দেখুন। টিম সাউদি। ডোয়েন ব্রাভো। আন্দ্রে রাসেল। প্রত্যেকে রয়েছে। অর্থাৎ, খেলার প্রতিটা পর্যায়ে কখন কী করতে হবে, বুঝিয়ে দেওয়ার লোক আছে আমাদের। পাওয়ার প্লে, মিডল ওভারস, ডেথ–সর্বত্র। স্পিন বোলিংটা আমাদের এখনও দারুণ। মানছি, পেস বিভাগে ঝটকা খেয়েছি। কিন্তু তার পরেও ভালো ব্যাকআপ রয়েছে আমাদের। কার্তিক ত্যাগী, উমরান মালিকরা আছে। আর বললাম তো, আমাকে ভালো পারফর্ম করতে হবে। আমাকে লিড করতে হবে,’’ বলা শেষ করে উঠে পড়েন লম্বা-চওড়া নাইট পেসার। একরাশ প্রত্যয়কে সঙ্গী করে।
ঝটিতি দেখলাম, বৈভবের চোখ দু’খানা জ্বলজ্বল করছে। সুযোগ সদ্ব্যবহারের প্রতীক্ষায়। উচিত, করাই উচিত। এবার যে আর ‘সেকেন্ড ফিডল’ নয়, এবার যে আর হর্ষিত ও বৈভব নয়, নাইট পেস ব্যাটারি এবার ‘বৈভব অ্যান্ড ফিউ আদার্স।’
একা বৈভব এবং কয়েকজন!
