সে দেশে একটাও ক্রিকেট মাঠ নেই। রাজার খেলা খেলে অর্থ নেই। খেলা দেখার লোক নেই। ইটালিতে বরং ক্রিকেট নিয়ে একটা রসিকতা চলে। চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচ-ট্যাচে প্রথমে গুণে দেখা হয়, লোক কত? মাঠে প্লেয়ারের চেয়ে সংখ্যায় বেশি কি না? একজনও বেশি হলে, ইটালি ক্রিকেটের লোকজন ঘোর সন্তুষ্টির সঙ্গে বলে ফেলেন, যাক বাবা, আজ ‘কোরাম’ হল!
প্রাক্ নয়ের দশক যুগে ক্রিকেট নামক খেলাটা খায় না মাথায় দেয়, ইটালীয়রা জানতেন না সঠিক। তা সে যতই সতেরো সালের শেষে ইংরেজ খালাসিদের হাত ধরে ক্রিকেটের গোড়াপত্তন দেল পিয়েরোদের দেশে হয়ে যাক না কেন। ভাগ্যিস, বিরানব্বই বিশ্বকাপের পর নিউজিল্যান্ডের কিংবদন্তি ক্রিকেটার মার্টিন ক্রো ইটালি গিয়েছিলেন। গিয়ে, ক্রিকেটের সহজ পাঠ সম্পর্কে ধারণা প্রদান করেছিলেন। বুঝিয়েছিলেন, খেলাটার ‘অ-আ-ক-খ’। তার আগে ইটালীয় ক্রিকেটারদের যে বদ্ধমূল ধারণা ছিল, ব্যাটার আর বোলার হল প্রকৃত ‘সহোদর’। একই টিমের অংশ। একজন বল করছে! আর একজন ব্যাট! কিছুতেই ব্যাটার-বোলার একে অন্যের প্রতিপক্ষ নয়! আসল ‘শত্রু’ হল, নচ্ছার ফিল্ডারগুলো! গোটা দিন যে ব্যাটাচ্ছেলেরা আউট করার জন্য ওঁত পেতে বসে থাকে!
রবিবাসরীয় ইডেনে বসে ওয়েন ম্যাডসন নেতৃত্বাধীন ইটালি টিমের প্র্যাকটিস কভার করার সময় মনে হচ্ছিল, দেখছি যা, আদৌ তা সত্যি তো? বছর তিরিশ পূর্বে যে দেশের ক্রিকেটাররা ব্যাট কীভাবে ধরে জানতেন না, সিঙ্গলস কাকে বলে বুঝতেন না, তারা কি না টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলছে! নামিবিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, এমনকী স্কটল্যান্ড যারা কি না সোমবারের ইডেন প্রতিপক্ষ, তাদের হারাচ্ছে! ফুটবলে চার বার বিশ্বজয়ী দেশকে ক্রিকেট দিয়ে অনুপ্রেরণা জোগানোর বাক্যি বলছে! হে ক্রিকেটপ্রেমীবৃন্দ, রূপকথাকে যদি ম্যাডসনের টিমের মতো দেখতে না হয়, তা হলে ঠিক কেমন দেখতে?
মার্টিন ক্রো। ফাইল ছবি।
‘‘আমরা চাই, আমাদের ফুটবল টিমকে অনুপ্রেরণা জোগাতে। নিজেরা ভালো খেলে,’’ ফিকফিক হাসার ফাঁকে বলছিলেন ইটালি অধিনায়ক ম্যাডসন। আসলে আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপে এখনও খেলা নিশ্চিত করতে পারেনি ইটালি। মার্চ মাসে তাদের প্লে অফ খেলতে হবে। ইটালি ক্যাপ্টেনকে দ্রুত জিজ্ঞাসা করা হয় যে, অধুনা ফুটবলে দেশের হারানো জায়গা, সৃষ্টি হওয়া অসীম শূন্যস্থান তাঁরা আগামীতে ক্রিকেট দিয়ে ভর্তি করতে চান কি না? জবাবে ফের স্মিত হাস্যে উত্তর আসে, ‘‘কেন নয়? বিশ্বাস করি, ক্রিকেট একদিন দেশে ভালো জনপ্রিয়তা পাবে। এখন থেকেই কিন্তু শুরু হয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন কাগজপত্র লেখালেখি করছে।’’
ঘটনা। করছে। মজা করে সোমবারের ইটালি-স্কটল্যান্ড বিশ্বকাপ ম্যাচকে ‘ইউরো কাপ কোয়ালিফায়ার্স’ বলা হচ্ছে বটে। কিন্তু দু’টো দেশই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে যথেষ্ট সিরিয়াস। গতকাল প্রবাদপ্রতিম রাহুল দ্রাবিড়ের সঙ্গে দেখা করেছে ইটালি টিম। ম্যাডসন বললেন, ‘‘আমি নিজে ছিলাম না। কিন্তু ওঁর মতো একজন বিশ্ববন্দিত কথা বললে যে টিম উদ্বুদ্ধ হবে, সেটাই স্বাভাবিক।’’ পারিপার্শ্বিক থেকেও ক্রিকেট টিমকে উদ্বুদ্ধ করার বার্তা আসছে। আন্দ্রে পির্লো বার্তা পাঠিয়েছেন। মোটো জিপি টিম পাঠিয়েছে। তবে বিশ্বকাপ খেলার ঐশ্বরিক অনুভূতির মোহমায়া কাটিয়ে দু’টো কাজ অবিলম্বে করতে চায় ইটালি।
এক, অর্থের জোগান। দুই, স্বদেশীয় প্লেয়ার তৈরি করা। ইটালীয় ক্রিকেট সংস্থার সাম্মানিক প্রেসিডেন্ট সিমোনো গ্যাম্বিনো বলছিলেন, ‘‘একটা বিশ্বকাপ খেললে শুধু হবে না। নিজেদের দেশের প্লেয়ার দিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে হবে। ভাড়া করা প্লেয়ারদের দিয়ে নয়। আর লাগবে টাকা। শুধু মোটিভেশন দিয়ে ক্রিকেট চলে না।’’
কোথাও গিয়ে মনে হয়, পারবে ইটালি। যে দেশ নিছক একখানা বিশ্বকাপ খেলে ‘সব পেয়েছি-র দেশে’ বন্দি থাকতে চায় না। যারা চায় বিশ্বকাপকে ভাবীকালের প্রতিষ্ঠা মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করতে, তারা না পারলে, আর পারবে কারা?
