টুর্নামেন্টের ব্র্যান্ড আম্বাসাডর রোহিত শর্মাকে এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের বিবিধ মাঠে দেখা গেলেও, রবিবারের আহমেদাবাদে তিনি ছিলেন না। আর বিরাট কোহলি বিশ্বকাপের বাজার থেকে রীতিমতো অদৃশ্য হয়ে গিয়েছেন প্রায়। কী করছেন, কেউ জানে না। সোশাল মিডিয়াতেও কোথাও কিছু নেই। মধ্যিখানে ইনস্টাগ্রাম আকাউন্ট উড়িয়ে বড়সড় গোলযোগও বাঁধিয়েছিলেন যিনি। দেশের মাটিতে বিশ্বকাপের হোম যজ্ঞ চলছে, অথচ ভারতবর্ষের দুই ক্রিকেট মহাতারকা অনুপস্থিত, দেখতে যেন কেমনতর লাগে। বিশেষ করে পূর্ব টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রেক্ষিতে। কে আর ভুলতে পেরেছে, পনেরো বছর পর ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়কের নাম ছিল রোহিত শর্মা। যিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত সে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পরাক্রমী অস্ট্রেলিয়াকে চুরমার করে ছেড়েছিলেন। একা ফাইনালে আবার রাজত্ব করেছিলেন কোহলি। এরপর দু'জনের একজনকেও রোববরের আহমেদাবাদে দেখতে না পেলে মনখারপ হবেনা? বিশেষ করে সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ব্যাটিং বিপর্যয়ের সময় যাদের কথা বারবার মনে পড়ছিল। অভাব আরও বেশি করে হচ্ছিল।
কিন্তু ওই যে। দিন শেষে বলে না, দেব-দ্বিজের প্রকৃত স্থান ভক্তের মনে। আরাধ্যের উপাসনা করতে মন্দির-গিজা লাগে না। ক্রিকেটেও তা ধ্রুব সত্য। দেবতার পুজো দিতে ক্রিকেট সমর্থকদেরও বিগ্রহকে স্বচক্ষে দেখার প্রয়োজন পড়ে না। রবিবার দুপুর থেকে হোটেল, রাস্তাঘাট, অটো-ট্যাক্সি-সর্বত্র নীল জার্সি পরিহিত যে মানুষ অবয়ব দেখছিলাম, অধিকাংশের পিঠে হয় রোহিত কিংবা বিরাট লেখা। সন্ধেয় রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটারের মতো অতিকায় নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামে পা দেওয়ার পর, সংখ্যাটা অধিকতর বেড়ে গিয়ে প্রায় প্লাবনে রূপান্তরিত হল। 'রো-কো'-র এক প্রতিদ্বন্দ্বী জুটলেন বটে। তবে তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাত্র। সূর্যকুমার যাদব। এদিনের মতো কখনওই ভারত অধিনায়ক তাঁর দুই প্রিয় সিনিয়রকে মাপিয়ে যেতে পারেননি । না খেলায়, না জনপ্রিয়তায়।
আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ছেড়ে দেওয়ার প্রায় দু'বছর পরেও রোহিত-বিরাটের ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম ফর্ম্যাটে এ হেন উথাল-পাথাল জনপ্রিয়তা অভিভূত করে দেওয়ার মতো। তবে রবিবারের আহমেদাবাদে বিস্ময়কর আরও একটা দৃশ্যপট দেখা দিয়েছে। রাত সাড়ে আটটা নাগাদ প্রেসবক্সে ঘোষণ হল, মাঠে দর্শক এসেছেন উনআশি হাজার মতো। মানছি, জনসংখ্যা হিসেবে যা ক্রিকেট মাঠে দারুণ। কিন্তু দর্শকাসন কত রয়েছে, সেটাও তো দেখতে হবে। আহমেদাবাদ স্টেডিয়ামের সর্বমোট দর্শকাসন এক লক্ষ তিরিশ হাজার। গুজরাট ক্রিকেট সংস্থার কর্তারা বললেন যে, সরকারি হিসেব অনুযায়ী তা হলেও, আদতে তার চেয়ে দশ-পনেরো হাজার মতো কম টিকিট ছাড়া হয়। ঠিক আছে। সেক্ষেত্রেও সংখ্যাটা দাঁড়ায় এক লক্ষ পনেরো হাজার। আর যোগ-বিয়োগ করে যা দাঁড়াচ্ছে, তাতে প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার সিট এ দিন আহমেদাবাদ মাঠে ফাঁকা পড়ে থাকল। ভারতের ম্যাচে যা অকল্পনীয়। আর ক'দিনের মধ্যে ইডেনে ভারতের সুপার এইট মাচ রয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে। যা সম্ভবত সূর্যকুমারদের জীবন-মৃত্যুর ম্যাচ হয়ে দাঁড়াবে। কল্পনা করতে একটু কষ্টই হচ্ছে যে, আগামী রবিবার ইডেনে একখানা সিটও ফাঁকা পড়ে আছে। আরে, ভারত ম্যাচ ছেড়ে দিন। নিতান্ত নাদান ইতালি বনাম স্কটল্যান্ড ম্যাচে আঠেরো হাজার লোক সাতসকালে ইডেনে চলে এসেছিলেন খেলা দেখতে। ইংল্যান্ড বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বেলায়, ইডেনে জনসংখ্যা হাজার তিরিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে যেঘারাফেরা করেছে।
জাতীয় ক্রিকেটমহলে অনুচ্চস্বরে প্রায়ই একটা অভিযোগ করা হয় যে, ভারতে বিশ্বপর্যায়ের টুনামেন্টের আসর বসলে, প্রভাবশালীদের 'অঙ্গুলিহেলনে' সব মহার্ঘ্য খেলা পেয়ে থাকে আহমেদাবাদ। দ্রুত এঁরা মনে করিয়ে দেন, ২০২৩ বিশ্বকাপ। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। ফাইনাল। সবই অনুষ্ঠিত হয়েছিল আমেদাবাদে। এবারও পাকিস্তান না খেললে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল আহমেদাবাদে। সঙ্গে এ দিনের সুপার এইটের ম্যাচখানাও হল এখানে। অথচ ক্রিকেট-কৌলিন্যের বিচারে আহমেদাবাদ স্টেডিয়াম ওয়াংখেড়ে কিংবা ইডেনের আশেপাশে নেই। ক্রিকেট সংস্কৃতিতেও মুম্বই-কলকাতা-চেন্নাইয়ের চেয়ে আহমেদাবাদ আলোকবর্ষ পিছিয়ে। নইলে তিন বছর আগে বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারত বধের নায়ক ট্রাভিস হেডের দুর্ধর্ষ সেঞ্চুরির পর তাঁর উদ্দেশ্যে শুকনো করতালি পর্যন্ত বরাদ্দ রাখেনি আহমেদাবাদ জনতা। এ দিনও ডেভিড মিলারের ক্ষেত্রে সে ব্যবহার বদলায়নি। যা ইডেন বা ওয়াংখেড়েতে ভাবাই যায় না। অবশ্যই দেশ সবার আগে। দেশের সমর্থন সবচেয়ে আগে। কিন্তু তাই বলে প্রতিপক্ষ ভালো ক্রিকেট খেললে, ক্রিকেট-কুলীন মাঠ কখনও তাকে অসম্মান করে না। বিশ্বের কোথাও না।
কিন্তু বলে কী লাভ। লিখে কী লাভ? শুনবে কে? প্রতিকার হবে কী করে? শুধু ক্রিকেটের নোটবুকে সত্যিটা লেখা থাকবে। লেখা থাকবে যে, বিশ্বকাপের ভারত-দক্ষিণ আফ্রিকা নামক দুর্ধর্ষ ম্যাচ পেয়েও আহমেদাবাদ মাঠ 'হাউসফুল' করতে পারেনি। লেখা থাকবে, ইডেন যা পারে, আহমেদাবাদ আজও পারে না।
