দেশে মহাগুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্ট-যজ্ঞ চললে, ভারতীয় কোচ গৌতম গম্ভীর দু'খানা কাজ অবধারিত করেন। প্রথমত, গভীর মনযোগ দিয়ে পিচ দেখা। দ্বিতীয়ত, জাগ্রত দেব-দেবীর মন্দির দর্শন। চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেই যেমন গিয়েছেন। যাচ্ছেন। উদ্বোধনী ম্যাচের আগে সিদ্ধি বিনায়ক মন্দির গিয়েছিলেন। আর শনিবার সকালে কালীঘাট মন্দির। কলকাতায় এলে অবশ্য তৃতীয় একটা বিষয়ও এর সঙ্গে যোগ হয়।
ভালোবাসা!
ভালোবাসার হোটেল। ভালোবাসার রুম। ভালোবাসার কফি লাউঞ্জ। ভালোবাসার কেদারা। আসলে কলঝতার সঙ্গে কর্কশ পেশাদারিত্বের নয়, বরাবরই হৃদয়ের গ্রন্থি গম্ভীরের। কেকেআর অধিনায়ক থাকার সময় থেকে। সময়ের প্রবাহে এ শহর তাঁর এতটাই প্রিয় হয়ে ওঠে যে, নাইট হোটেলের উলটো দিকে ফ্ল্যাট কিনবেন ঠিক করে ফেলেছিলেন এক সময়। বাইপাসের ধারে। কেকেআর ছেড়ে যাওয়ার পর তা আর বাস্তবরূপ পায়নি বটে। কিন্তু সেই হোটেলকে আজও ছাড়তে পারেননি গম্ভীর। ছাড়তে পারেননি তার দার্জিলিং লাউঞ্জ। ছাড়তে পারেননি তার নির্দিষ্ট এক পাচককে। যাঁর হাতের মশালা ধোসা বড় প্রিয় গম্ভীরের। আর ন্যূনতম টান জীবিত না থাকলে বিশ্বকাপ টিম নিয়ে এবার সে হোটেলে উঠতেন কখনও গম্ভীর? কলকাতায় অভিজাত হোটেল তো কম নেই।
আর খামোখা হোটেলের খতিয়ানই বা লিখছি কেন? ইডেন, ইডেনের মানুষজনেরও সঙ্গেও কি গম্ভীরের 'প্রণয়' কম গভীর? শোনা যায়, 'হোম' ড্রেসিংরুমের একটা কেদারা নির্দিষ্ট রয়েছে তাঁর। সেখানে বসলে, হাই কোর্টের দিক থেকে সূর্যাস্ত দেখতে ভালো লাগে, তাই। এ দিন আবার দেখলাম, হাতে একটা সাদা রংয়ের প্যাকট নিয়ে ঢুকছেন জাতীয় কোচ। যা গিয়ে সটান ইডেন কিউরেটর সুজন মুখোপাধ্যায়ের হাতে ধরিয়ে দিলেন! কী ব্যাপার? কালীঘাটের প্রসাদ নাকি? একগাল হেসে সুজন পরে বললেন, "না, না। একটা ট্যুকসুট। আমি বলিওনি। গৌতম নিজেই ধরিয়ে দিয়ে বলল, দাদা এটা তোমার!"
শুনলাম, ইডেন কিউরেটরের কাছে দুঃখ করে গম্ভীর নাকি বলেছেন যে, টিমটা কখনও ভালো খেলছে, কখনও খারাপ। আর দেশের মানুষের যত রাগ এসে পড়ছে তাঁর উপর। রোববারের পর ব্যাপারখানা কী দাঁড়াবে, জানি না। জানি না, শংসা নাকি শাপান্ত-কোনটা অপেক্ষা করবে গম্ভীরের টিমের জন্য। শুধু এটুকু জানি, কোচিং জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোহনায় আজ দাঁড়িয়ে তিনি। তাঁর টিম। রোববার পারলে, সেমিফাইনাল। না পারলে, সব শেষ।
আর সেই জীবন-মত্যুর দরিয়া পারে যে টিমকে বধ করতে হবে গম্ভীরদের, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাদের বিরুদ্ধে ভারতের রেকর্ড বেশ শোচনীয়। আজ পর্যন্ত ১-৪। ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ততম ফর্মাটের মহাপরাক্রমী যারা, অমিত বলশালী ওয়েস্ট ইন্ডিজ! শনিবার ভারতের সহকারী কোচ রায়ান টেন দুশখাতে বলছিলেন, "উই উইল ফাইট ফায়ার উইথ ফায়ার। আগুন দিয়ে আগুনের বিরুদ্ধে লড়ব আমরা।" ভালো। কিন্তু এ দিন প্রাক্ ম্যাচ মহড়ায় যে ভাবে নেটে তাণ্ডব চালাচ্ছিলেন হেটমায়ার-হোল্ডার-শেফার্ডরা, তা রোববারও চললে থামাতে আগুন নয়, সোজা কামান দাগতে হবে! শাই হোপের ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং গভীরতা ঠিক কতটা, বুঝতে একটা প্রামাণ্য নথিই যথেষ্ট। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে গত ম্যাচে ৮৩ রানে ৭ উইকেট পড়ে যাওয়ার পরেও টিমটা ১৭৬ তুলেছে! ন'নম্বর পর্যন্ত ব্যাটিং রয়েছে টিমটায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ কোচ ড্যারেন স্যামির প্রেস কনফারেন্সে শিস দিতে-দিতে, 'লাস্ট টাইম ইট ওয়াজ মুম্বই," শুনে প্রমাদ গোনা বাড়ে আরও। কে আর ভুলেছে, দশ বছর পূর্বের ওয়াংখেড়েতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে কী ঘটেছিল? এবং পরিশেষে স্যামি যখন হিমহিমে গলায় বললেন, "মাই অল সোলজার্স আর রেডি," যখন বলেন, "আগের বারও ব্যাপারটা ডেভিড বনাম গোলিয়াথ ছিল। প্লেয়ারদের সেটা মনে করিয়ে দিয়েছি," হাত-পা কেমন যেন শিরশির করে। সূর্যকুমাররা আজ শেষ পর্যন্ত পারবেন তো? জিতবেন তো? ইডেন তার 'দ্বিতীয় সন্তান' গম্ভীরকে শূন্য হাতে ফেরাবে না তো? আর সে ভয়াল প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমরে যাঁর থেকে প্রেরণা নিচ্ছে টিম, রোববার তিনি সম্ভবত খেলবেন না। নামটা পরে লিখছি। সর্বাগ্রে বলে রাখি যে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে 'কোয়ার্টার ফাইনালের' গুরুত্ব বুঝেই হোক বা আগের দিন ট্রেনিং না করার কারণে, এ দিন নিজেদের প্রাক্ ম্যাচ প্রথা বদলে ফেলল ভারত। খেলার আগের দিন এখন আর ভারতীয় প্লেয়াররা মাঠে আসেন না সে ভাবে। বিশ্রামে থেকে নিজেদের তাজা রাখেন। কিন্তু এ দিনের ইডেনের ঐচ্ছিক ট্রেনিং সেশনে অনুপস্থিতের তালিকা মাত্র তিন জন। হার্দিক পান্ডিয়া। সঞ্জ স্যামসন। রিঙ্কু সিং। যা খবর, শেষের নামটাই আপাতত টিমের কাছে চলমান প্রেরণা।
শুক্রবারই পিতৃহারা হয়েছেন রিঙ্কু। কিন্তু দেশের প্রতি অতুলনীয় দায়বদ্ধতা দেখিয়ে তিনি এ দিন ফিরে এসেছেন শহরে। রাত্তির সাড়ে আটটা নাগাদ যোগ দিয়েছেন টিমের সঙ্গে। যা বুঝছি, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে খুব সম্ভবত মাঠে নামবেন না রিঙ্কু। জিম্বাবোয়ে ম্যাচের টিমই মাঠে নামবে হয়তো। অর্থাৎ, ওপেনিংয়ে সঞ্জু-অভিষেক। তিনে ঈশান। চারে সূর্য। পাঁচে হার্দিক। ছয়ে তিলক। কিন্তু প্লেয়িং ইলেভেনে না থাকলেও, টিমটার সঙ্গে ওতঃপ্রোতভাবে থাকবেন দেশের বীর বাঁহাতি। শুনলাম, গম্ভীর নাকি এ দিন টিমকে বলেছেন যে, সময়-অসময়ে রিঙ্কুর দিকটা ভাবতে। তাঁর আত্মত্যাগের মর্মার্থ বুঝতে। তাঁর থেকে প্রেরণা নিতে।
নিশ্চিত ভাবে লিখছি, ডারেন স্যামিরা এ নামটা হিসেবে রাখেননি। দুই টিম মিলিয়ে সম্মিলিত 'টোয়েন্ট টু সোলজার্স' বাদে থাকবেন যিনি, থাকবেন পিতৃশোকের অশ্রু মুছে, থাকবেন অদৃশ্য 'এক্স ফ্যাক্টর' হয়ে। যাঁর পিঠে পিতৃদত্ত নামের বদলে আজকের মতো একটাই নাম লেখা থাকবে। ইন্ডিয়া।
