shono
Advertisement
T20 World Cup

শত্রু যখন বন্ধু ছিল! ৩০ বছর আগে শ্রীলঙ্কায় এক দলে খেলেন শচীন-আক্রমরা, নেপথ্যে কী কারণ?

শ্রীলঙ্কাতেই ঠিক ৩০ বছর আগে একটি বিশেষ ম্যাচে মাঠে নেমেছিল ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা। তবে প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, সতীর্থ হিসেবে। ওয়াসিম আক্রমের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বল করছেন অনিল কুম্বলে। শচীনের সঙ্গে ব্যাট করতে নামছেন সইদ আনোয়ার।
Published By: Arpan DasPosted: 05:17 PM Feb 13, 2026Updated: 05:17 PM Feb 13, 2026

ক্রিকেটের মহারণ, মহাযুদ্ধ। কত নামেই তো ডাকা হয় ভারত-পাকিস্তান ম্যাচকে। বর্ডারের দু'পারে উত্তেজনার লাভাস্রোত। ক্রিকেটারদের মধ্যে গরমাগরম বাক্য বিনিময়। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত-পাক লড়াই নিয়ে চড়ছে পারদ। এবারের রণাঙ্গন শ্রীলঙ্কা। আর এই শ্রীলঙ্কাতেই ঠিক ৩০ বছর আগে একটি বিশেষ ম্যাচে মাঠে নেমেছিল ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা। তবে প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, সতীর্থ হিসেবে। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। ওয়াসিম আক্রমের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বল করছেন অনিল কুম্বলে। শচীনের সঙ্গে ব্যাট করতে নামছেন সইদ আনোয়ার। কেমন অবিশ্বাস্য লাগছে না?

Advertisement

তা লাগতেই পারে। কিন্তু সত্যিই এরকম এক ম্যাচের সাক্ষী থেকেছিল ক্রিকেটদুনিয়া। ১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬। কলম্বোয় শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিল ভারত-পাকিস্তানের যৌথ দল। যার পোশাকি নাম ছিল উইলস একাদশ। এই বিশেষ ম্যাচের নেপথ্যে ছিল মহৎ উদ্দেশ্য, হিংসার ঊর্ধ্বে ক্রিকেটের জয়গান গাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

১৯৯৬ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের আয়োজক ছিল ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। পিছিয়ে যাওয়া যাক, আরও বছর কয়েক আগে। ১৯৯৩ সালে পাক-ইন্দো-লঙ্কার একটি যৌথ কমিটি (পিলকম) ইংল্যান্ডকে টপকে ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপ আয়োজনের ছাড়পত্র ছিনিয়ে নেয়। ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার দাপটের বিরুদ্ধে এটা কিন্তু এশিয়ান ব্লকের জন্য বিরাট সাফল্য ছিল। সেক্ষেত্রে এশিয়ার তিনদেশ বুঝেছিল, একসঙ্গে থাকলে তারা বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের কর্তৃত্ব দেখাতে পারবে। দু'টো সেমিফাইনাল হয় ভারতে, ফাইনাল পাকিস্তানে। আর শ্রীলঙ্কা পায় পাঁচটি ম্যাচ আয়োজনের দায়িত্ব।

কিন্তু বিপদ বাঁধল বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক পনেরো দিন আগে। ৩১ জানুয়ারি কলম্বোর সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কে এক মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটায় এলটিটিই। ওই হামলায় মারা যান ৯১ জন, আহত অন্তত ১৪০০ জন। মৃতদের মধ্যে ছিলেন দু'জন আমেরিকার, ছ'জন জাপানের ও একজন নেদারল্যান্ডসের বাসিন্দা। শ্রীলঙ্কার দীর্ঘকালীন গৃহযুদ্ধে এমনিতেই পরিস্থিতি যথেষ্ট উত্তপ্ত ছিল, এর মধ্যে তামিল টাইগারদের এই আত্মঘাতী জঙ্গিহানা দেশব্যাপী আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরি করে। পুরো কলম্বো স্তব্ধ, স্কুল-কলেজ বন্ধ, ঘরে-ঘরে হাহাকার। এই পরিস্থিতিতে ক্রিকেট বিশ্বকাপের কথা যেন লোকে ভুলতেই বসেছে।

প্রতীকী ছবি।

যেখানে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এরকম ভয়াবহ জঙ্গিহানা হয়, সেখানে কি ক্রিকেট নিরাপদ? হঠাৎই প্রশ্ন খাঁড়া হল ক্রিকেটবিশ্বের সামনে। এমনিতেই এশিয়ান ব্লকে বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল ইংল্যান্ড-সহ কয়েকটি দেশ। এর সঙ্গে জুড়ল নিরাপত্তার সমস্যা। অস্ট্রেলিয়া পত্রপাঠ জানিয়ে দেয়, এই পরিস্থিতিতে তারা শ্রীলঙ্কায় যাবে না। এরপর একই পদক্ষেপ নেয় ওয়েস্ট ইন্ডিজও। ইংল্যান্ডের মতো 'কুলীন' দেশগুলোর বক্তব্য ছিল, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য এমনিই 'যোগ্য' নয়। সেটাই যেন ফের প্রমাণিত হচ্ছিল এই বিস্ফোরণের ঘটনায়।

৩১ জানুয়ারি কলম্বোর সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কে এক মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটায় এলটিটিই। ওই হামলায় মারা যান ৯১ জন, আহত অন্তত ১৪০০ জন। মৃতদের মধ্যে ছিলেন দু'জন আমেরিকার, ছ'জন জাপানের ও একজন নেদারল্যান্ডসের বাসিন্দা।

সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজনই প্রশ্নের মুখে। শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, দেশের সম্মানও প্রশ্নের মুখে। এই অবস্থায় শ্রীলঙ্কার পাশে দাঁড়াতে হাতে হাত রেখে এগিয়ে এল ভারত-পাকিস্তান। ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু বিশ্বকাপ। ১১ ফেব্রুয়ারি ছিল ইডেনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। সেদিনই ঠিক হয়ে যায়, ভারত ও পাকিস্তান, দুই দল নিজেদের ৬ জন করে প্লেয়ার পাঠাবে শ্রীলঙ্কায়। কে সেই আইডিয়া দিয়েছিল, তা এখন আর জানা যায় না। কিন্তু নিজেদের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি বাদ দিয়ে এই প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে কুর্নিশযোগ্য।

অবশেষে এল ১৩ ফেব্রুয়ারি। উইলস একাদশ নামে এই প্রথমবার একসঙ্গে মাঠে নামল ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা। অধিনায়ক মহম্মদ আজহারউদ্দিন। প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কার নেতৃত্বে ছিলেন অর্জুন রণতুঙ্গা। প্রথমে ব্যাট করে শ্রীলঙ্কা তোলে ১৬৮ রান। ওয়াসিম আক্রম ও ওয়াকার ইউনিসের সঙ্গে বোলিং করেন শচীন তেণ্ডুলকর, অনিল কুম্বলে। মাত্র ১২ রানে চার উইকেট তোলেন কুম্বলে। জবাবে শচীনের সঙ্গে ওপেন করতে নামেন সইদ আনোয়ার। আজহারউদ্দিন, অজয় জাদেজা, রশিদ লতিফ, ইজাজ আহমেদদের ব্যাটিংয়ে ৬ উইকেট হারিয়ে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রান তুলে নেয় উইলস একাদশ।

১৯৯৬ সালে, সেই ম্যাচে ভারত-পাকিস্তান যৌথ একাদশ।

দুই চিরশত্রু দেশ 'বন্ধু' হয়ে একসঙ্গে মাঠে নেমে প্রমাণ করেছিল হিংসার ঊর্ধ্বে ক্রিকেট। মাত্র ২৪ ঘণ্টার আহ্বানে প্রেমদাসা স্টেডিয়ামে হাজির হয়েছিল ১০ হাজার দর্শক। অবশ্য তা সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়া শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় যেতে রাজি হয়নি। ম্যাচ থেকে দু'পয়েন্ট পায় শ্রীলঙ্কা। সেমিফাইনালে সনৎ জয়সূর্যরা ইডেনে ভারতকে হারানোর পর কী হয়েছিল, সেটা আর নতুন করে বলার নয়। আর ফাইনালে সেই অস্ট্রেলিয়াকেই হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল শ্রীলঙ্কা। পরে জয়সূর্য স্বীকার করেছিলেন, ভারত-পাকিস্তানের শক্তিশালী প্লেয়ারদের বিরুদ্ধে খেলার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন তাঁরা।

ক্রিকেটের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। সেই অঙ্ক বহুদিন ধরে চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে। এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ তার নতুন চেহারা দেখেছে। পাকিস্তানের বয়কট নাটক যে এই ম্যাচের গুরুত্ব যে বাড়িয়ে দিয়েছে, সেটা বলাই বাহুল্য। ভারত-পাকিস্তান এখন আর প্রতিবেশী দেশের মাটিতে গিয়ে খেলে না। হাইব্রিড মডেলে জমি খুঁজে নেয় অন্য জায়গায়। পহেলগাঁও জঙ্গিহানা, অপারেশন সিঁদুরের পর এশিয়া কাপে হ্যান্ডশেক বিতর্ক নিয়েও কম চর্চা হয়নি। নিরাপত্তার ইস্যুকে সামনে রেখে এখন দুই দেশ ক্রিকেট-যুদ্ধেও দূরত্ব বাড়াচ্ছে, আর সেখানে ৩০ বছর আগের ছবিটা ছিল অন্যরকম। রবিবার শ্রীলঙ্কার মাটিতে সূর্যকুমার যাদব, সলমন আলি আঘারা টস করতে নামার আগে কি সেই ইতিহাসের পাতা একবার উলটে দেখবেন?

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement