এই বাংলায় অদ্ভুত এক সাংস্কৃতিক ভণ্ডামির আমদানি করেছেন কিছু তাত্ত্বিক। যাদবপুর থেকে দুর্গাপুরের ঘরে ঘরে কিউবার জন্য চাল সংগ্রহ করার সময় এঁদের মনের ত্রিসীমানায় উঁকি দেয় না কুপার্স ক্যাম্প বা ধুবুলিয়ায় কিংবা পশ্চিমবঙ্গের হাজারো জায়গায় রেললাইনের ধারে, ফুটপাতে-ঝুপড়িতে, কিংবা খোলা আকাশের নিচে বাংলা ভাষায় কাতরানো উদ্বাস্তু মা-ভাই-বোনের মর্মন্তুদ যন্ত্রণা।
গাছ বড় হয়ে যাওয়ায় অক্ষরগুলি আরও বড় হয়ে গেছে। যেন দেশের মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর জন্যই অক্ষরগুলি যতদিন যাবে তত বড় হয়ে যাবে। বাংলাদেশের মানুষ বড় বড় হরফে পড়বে, জ্যাঠামশায় আমরা হিন্দুস্তানে চলিয়া গিয়াছি– ইতি সোনা।
(নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে: অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়)
কথাটা বলেছিল মাকরেল ক্যাম্পের ছিনাথ। শ্রীনাথ মালাকার। তার বক্তব্য: আজ্ঞে বাবুমশয়, পেরথমে তো ক’ন নাই, যে বিচারে আমাদের অরণ্যদণ্ড হইছে।... কারাদণ্ডরে চিনি, মিত্যুদণ্ডও না চিনি তা নয়, কিন্তুক এমন অরণ্যদণ্ড দিবার ব্যবস্থা হইছে, তা তো ক’ন নাই।
(অরণ্যদণ্ডক: নারায়ণ সান্যাল)
খালেদা কিংবা হাসিনা হয়ে ইউনূস কিংবা তারেক রহমানের আমলেও নিরন্তর খুন হয়ে চলেছে হিন্দুরা। তবু এরই মধ্যে অনবদ্য কাজ করছেন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন এবং তঁার সহযোগীরা।
...হিন্দুর মেয়ের পুকুরঘাটে স্নান করতে যাওয়া আর সম্ভব নয়।... হিন্দুর মেয়েরা ঘাটে স্নান করতে গেলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের লোক পাড়ে এসে দঁাড়ায়। তাদের মধ্যে বয়সে নবীন যুবক যেমন আছে, তেমন বয়সে প্রবীণ প্রৌঢ়ও আছে।... তারা ছড়া কেটে গান ধরে। এক পাড়ের লোক গায়: ‘পাক পাক পাকিস্তান;’ আর অন্য পাড়ের লোক বলে, ‘হিঁদুর ভাতার মুসলমান’। এই অদ্ভুত আচরণে যে মেয়েটি স্নান করতে জলে নেমেছে সে স্বভাবতই আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। নির্যাতনকারীদের মনে তার সেই আচরণ ভারী কৌতুকবোধ জাগায়। তারা হেসে কুটিকুটি হয়। এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটে না।... ঘাটের দিকে একজন প্রৌঢ় পুরুষ এগিয়ে এসে বলে– ও বিবি, বেলা যে বেড়ে চলল। আর দেরি কেন? এবার ঘরে চলো। সে কথা শুনে মেয়েটি ভয়ে আরও আড়ষ্ট হয়ে পড়ে। আবার ওদিকে হাসির হুল্লোড় বয়ে যায়। তখন সেই প্রৌঢ়... এক নবীন সঙ্গীকে উদ্দেশ করে বলে– ওরে তোর চাচির পায়ে বুঝি খিল ধরেছে। উঠতে কষ্ট হচ্ছে। হাত ধরে তুলে নিয়ে আয় না।
(উদ্বাস্তু: হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়)
এক হাজারেরও বেশি উদ্বাস্তুর অস্থায়ী বাসস্থান শিয়ালদহ স্টেশন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভ্যান এসে প্রতিদিন ৩০০ উদ্বাস্তুকে আশ্রয় শিবিরে নিয়ে যায়। নতুন উদ্বাস্তুর দল এসে তাদের শূন্যস্থান পুরণ করে।... উদ্বাস্তুদের পোটলা-পুটলি, নোংরা বিছানাপত্র প্ল্যাটফর্মের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। এত মানুষ এভাবে গাদাগাদি করে থাকায় প্ল্যাটফর্মের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে কলেরা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডায়েরিয়া, বদহজম ও আমাশয় দেখা দিয়েছে।... মধ্যবিত্ত হিন্দুরা কলকাতা ও শহরতলীর আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে তাদের বোঝা হয়ে দঁাড়িয়েছে। কৃষক, শ্রমিক, কারিগর, দিনমজুর এবং নিম্নমধ্যবিত্ত দোকানদার স্টেশন প্ল্যাটফর্মে সরকারি আশ্রয়শিবিরে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে।
(স্টাফ রিপোর্টার: ইউপিআই)
এই মানুষ-বিনিময় এমন জিনিস যা সম্পূর্ণভাবে আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং আত্মিক নীতির বিরোধী। তার সঙ্গে আরও একটি নীতি জড়িত আছে। তা হল আমাদের বিশ্বাসভঙ্গের প্রশ্ন।
(পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু: লোকসভায় দেওয়া বক্তব্য, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০)
পণ্ডিত নেহেরু যখন পাঞ্জাবে মানুষ বিনিময়ের ব্যবস্থা নিজেই করেছিলেন, তখন তঁার এই বিশ্বাসভঙ্গের প্রশ্নটিকে ঠান্ডাঘরে বন্ধ রেখেছিলেন মনে হয়। বর্তমান ক্ষেত্রেও তঁার উচিত হবে বিশ্বাসভঙ্গের প্রশ্নটিকে ঠান্ডা ঘরে আবদ্ধ রেখে অভিজ্ঞ রাজনীতি বিশারদদের মতো বাস্তবের সম্মুখীন হওয়া।
(ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়: লোকসভায় নেহরুর কথার উত্তরে রাখা বক্তব্য, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০)
অবাক হয়ে লক্ষ করেছি এই বাংলায় এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক ভণ্ডামির আমদানি করেছেন কিছু তাত্ত্বিক। এঁরা সর্বার্থেই চিন এবং পাকিস্তানের মানসপুত্র– কারণ তিয়েনানমেনে হাজার-হাজার মানুষ মারা গেলে এঁরা প্রতিবাদ করেন না, সিন্ধু কিংবা বালোচে অসংখ্য হত্যার পর কুলুপ অঁাটা থাকে এঁদের মুখে।
১৯৫০-এর প্রথমদিকে কলকাতায় খবর এল যে পূর্ববঙ্গের খুলনা, বরিশাল ও অন্যান্য জেলায় নমঃশূদ্রদের ওপর হিংস্র অত্যাচারের ফলে অসংখ্য মানুষ চলে আসছে। কিন্তু এবার পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তুদের সীমান্ত পেরিয়ে চলে আসাও সহজ হয়নি। হাজার হাজার উদ্বাস্তু পূর্ববঙ্গের রেলস্টেশন, স্টিমারঘাট ও ঢাকা বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে লাগল। পূর্ব-পাকিস্তান সরকার তাদের মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করার কোনও ব্যবস্থা করেনি। এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতির অপেক্ষা না করেই ডা. রায় এই মৃত্যুপথযাত্রী মানুষগুলিকে বঁাচাবার দায়িত্ব কঁাধে তুলে নিলেন। ঢাকা বিমানবন্দর থেকে উদ্বাস্তুদের নিয়ে আসার জন্য ১৬টি ভাড়াটে বিমান অবিলম্বে কাজে লাগালেন। ফরিদপুর, বরিশালের স্টিমারঘাটে যে হাজার হাজার উদ্বাস্তু মৃত্যুর দিন গুনছিল তাদের নিয়ে আসার জন্য পনেরোটি যাত্রীবাহী স্টিমার পাঠালেন। হিন্দুরা যখন পালিয়ে আসছে তখন পথেই তাদের খুন করা হচ্ছে, এই খবর ছড়িয়ে পড়ায় পশ্চিমবঙ্গ অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠল।
(প্রান্তিক মানব: প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী)
একদিন সন্ধ্যাবেলা রাইটার্স থেকে ফিরে ডা. রায় জানতে পারলেন যে বনগঁা সীমান্ত থেকে শিয়ালদহ স্টেশনে যে গাড়ি এসেছে, তার কয়েকটি কামরায় যাত্রী ছিল না; ছিল মেয়েদের হাতের বালা ও শঁাখার ভাঙা টুকরো, ছেঁড়া শাড়ি ও রক্তাক্ত মানুষের মৃতদেহ। ডাঃ রায় তৎক্ষণাৎ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বললেন। আমরা যারা একতলায় ছিলাম তারাও ফোনে ডা. রায়ের উত্তপ্ত কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলছিলেন যে... যুদ্ধ ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। তঁার ধৈর্যের সীমা ছাড়িয়েছে।
(সরোজ চক্রবর্তী: With Dr. B. C. Roy and other Chief Ministers)
আমাদের কেন্দ্রীয় সরকার স্বীকার করেছেন যে ১৯৪৮-এর জুলাই মাসের শেষ নাগাদ সাড়ে এগারো লাখ মানুষ পূর্ববঙ্গ ছেড়ে চলে এসেছে। এই উদ্বাস্তু প্রবাহ শেষ হয়নি... দূর ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েও এই উদবাসন কখনও থামার সম্ভাবনা আছে বলে তো মনে হয় না; বছরের পর বছর আসবে এবং প্রতিদিন পূর্ববঙ্গ থেকে... লোক চলে আসবে...।
(‘স্যর’ যদুনাথ সরকার: ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হল-এ দেওয়া ভাষণের অংশ)
১৯৬০-’৬১তে বিপুল সংখ্যায় উদ্বাস্তু আগমনের তৃতীয় পর্যায় শুরু হয়ে যায়। ১৯৬১-৬৫-র মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে অন্তত ১০ লক্ষ উদ্বাস্তু চলে আসে। ১৯৬২-তে পাবনা ও রাজশাহিতে এবং ১৯৬৪ ও ১৯৬৫-তে ঢাকা ও অন্যান্য এলাকায় ব্যাপকভাবে হিন্দু সংখ্যালঘুদের হত্যা করা হয়। তারই ফল বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তুর পশ্চিমবঙ্গে চলে আসা। মন্ট্রিয়েলের ‘টাইমস ইনক’-এর কানাডীয় সংবাদদাতা এ বিষয়ে তঁার যে প্রতিবেদন পাঠান তা হল, ‘এই ধ্বংসলীলার ফলে একমাত্র ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় প্রায় ১০ হাজার লোক গৃহহীন হয়েছিল; অসংখ্য হিন্দুর ঘড়বাড়ি ভস্মীভূত করা হয়েছিল। যে সব পুড়িয়ে দেওয়া হিন্দু বাড়ির মাটির দেওয়াল তখনও দঁাড়িয়ে ছিল তাদের গায়ে কালি দিয়ে উর্দুতে লিখে দেওয়া হয়েছিল, ‘এই বাড়ি মুসলমানের’। শত শত আহত মানুষকে খোলা ট্রাকে ঢাকার হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যা ছিল অত্যন্ত কম। বিদেশি ডাক্তাররা স্বেচ্ছায় সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সহায়তার জন্য তাদের প্রসারিত হাত ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই পাশব হত্যাকাণ্ডের ওপর লৌহ যবনিকা ফেলে দেওয়া হয়েছিল।... পূর্ব পাকিস্তান যখন বাংলাদেশে রূপান্তরিত হল তখন অনেক কিছুই হয়তো পালটাল। পালটাল না শুধু হিন্দুদের চলে আসাটা।... মুজিব নিহত হলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হল। বাংলাদেশ ইসলামি রাষ্ট্র হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের চেহারা নিল। হিন্দুদের চলে আসার প্রক্রিয়া আবার শুরু হল। এই প্রক্রিয়া এখনও চলছে। এখন আর শুধু হিন্দু নয়, খৃষ্টান ও বৌদ্ধদেরও বাংলাদেশ থেকে বিতাড়ন পর্ব চলছে।
(প্রান্তিক মানব: প্রফুল্লকুমার চক্রবর্তী)
এত উদ্ধৃতির পর প্রতিবেদকের আর বিশেষ কিছুই বলার থাকে না। তবু যেটুকু বলতেই হয় তা হল: ‘মুক্তচিন্তা’-র স্রোতকে ক্রমাগত কোণঠাসা করে বাংলাদেশে বিপুল শক্তিবৃদ্ধি করে চলেছে ভয়ংকর মৌলবাদী শক্তি, যা আইসিস এবং তালিবানের দোসর। এদের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে হুমায়ুন আজাদ থেকে অভিজিৎ রায় খুন হয়েছেন, খুন হয়েছেন অসংখ্য মুক্তচিন্তক এবং বাকিরাও প্রতিনিয়ত আতঙ্কে রয়েছেন। পাশাপাশি খালেদা কিংবা হাসিনা হয়ে ইউনূস কিংবা তারেক রহমানের আমলেও নিরন্তর খুন হয়ে চলেছে হিন্দুরা। তবু এরই মধ্যে অনবদ্য কাজ করছেন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন এবং তঁার সহযোগীরা।
’৭১-এর আগে-পরে বাংলাদেশের অজস্র এলাকায় যে একের পর এক গণহত্যা ঘটিয়েছিল পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী ও রাজাকার মিলে– তারই এক প্রামাণ্য ইতিহাস তুলে ধরছেন তঁারা, তঁাদের ‘গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা’-য়। হাড়হিম করা সেসব বইয়ে দেখতে পাচ্ছি চুকনগর গণহত্যায় একদিনে খুন করা হয়েছিল অন্তত ১০ হাজার মানুষকে, যাদের সিংহভাগ সংখ্যালঘু হিন্দু। শুধু চুকনগর কেন, দেয়াড়া, কালীগঞ্জ, গোলাহাট, লালমাটিয়া, কাঠিরা– প্রায় সর্বত্র পশ্চিমবাংলায় পালিয়ে যাওয়ার জন্য জড়ো হওয়া হিন্দুদের উপর নেমে এসেছে অকথ্য নির্যাতন।
মামুন সম্পাদিত গ্রন্থমালায় পড়ছি, ‘হত্যা-নির্যাতনের গতিপ্রকৃতি একইরকম। দলবদ্ধভাবে শুধু হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে লুট-অগ্নিসংযোগ এবং হত্যা, নির্যাতন শেষে ধর্ষণ দিয়ে শেষ হয়েছে অপারেশন।’ এই গ্রন্থমালায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে চঁাদপুর পৌরসভার ডোম ব্রজনাথ বলেন, ‘... রক্তাক্ত মৃত্যুর স্তূপ দেখিয়ে পাকিরা বলত, ইয়ে জলদি সাফ করো।... সারা রাত ধর্ষণের পর ভোরবেলা মহিলাদের মালগাড়ির ওয়াগনে ঢুকিয়ে বাহির থেকে তালা মেরে রাখত এবং পরবর্তী রাতে আবার ক্যাম্পে নিয়ে ধর্ষণ করত।’
পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘পরিবর্তন’ করে ‘বাংলা’ রাখার চেষ্টা সেই চক্রান্তেরই একটি অংশ, যা পূর্বতন রাজ্য সরকারকেও গেলাতে সক্ষম হয়েছিল। এদের আজ্ঞাবহ কিছু ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের কাছে জানতে সাধ হয়, এতই যখন সম্প্রীতি তখন আপনারা কেন ওপার থেকে পালিয়ে এপারে এসে আছেন?
ভুলে যাব? সব ভুলে যাব? ভিয়েতনামে আমেরিকার নৃশংসতার বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন আমার বাবা, গুজরাত দাঙ্গার পর রাস্তায় নেমেছি আমি নিজে। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ করেছি এই বাংলায় এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক ভণ্ডামির আমদানি করেছেন কিছু তাত্ত্বিক। এঁরা সর্বার্থেই চিন এবং পাকিস্তানের মানসপুত্র– কারণ তিয়েনানমেনে হাজার-হাজার মানুষ মারা গেলে এঁরা প্রতিবাদ করেন না, সিন্ধু কিংবা বালোচে অসংখ্য হত্যার পর কুলুপ অঁাটা থাকে এঁদের মুখে। যাদবপুর থেকে দুর্গাপুরের ঘরে ঘরে কিউবার জন্য চাল সংগ্রহ করার সময়ে এঁদের মনের ত্রিসীমানায় উঁকি দেয় না কুপার্স ক্যাম্প বা ধুবুলিয়ায় কিংবা পশ্চিমবঙ্গের হাজারো জায়গায় রেললাইনের ধারে, ফুটপাতে-ঝুপড়িতে, কিংবা খোলা আকাশের নিচে বাংলা ভাষায় কাতরানো উদ্বাস্তু মা-ভাই-বোনের মর্মন্তুদ যন্ত্রণা।
সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল এঁদের সম্পর্কেই একটি চিঠিতে বলে গিয়েছিলেন যে, কিছু সোনা দিয়ে কেবল ছুরিই বানানো সম্ভব। কাশ্মীর নিয়ে ঝামেলায় বিশ্বের দরবারে নিজেকে প্রগতিশীল দেখানোর জন্য কোটি-কোটি বাঙালির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন যে নেহরু (পাঞ্জাবের জনবিনিময় বাংলায় হতে না দিয়ে)– এঁরা সেই নেহরুরই স্যাঙাত। প্যাটেল-বর্ণিত ‘ছুরি’ হয়েই স্বাধীনতার আগে এবং পরে এরা ভারতকে খণ্ড-খণ্ড করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, কখনও ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’-এর দাবিকে সমর্থন করে, কখনও বা ‘চিনের চেয়ারম্যান’-কে নিজেদের চেয়ারম্যান দাবি করে।
পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘পরিবর্তন’ করে ‘বাংলা’ রাখার চেষ্টা সেই চক্রান্তেরই একটি অংশ, যা পূর্বতন রাজ্য সরকারকেও গেলাতে সক্ষম হয়েছিল। এদের আজ্ঞাবহ কিছু ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের কাছে জানতে সাধ হয়, এতই যখন সম্প্রীতি তখন আপনারা কেন ওপার থেকে পালিয়ে এপারে এসে আছেন? ওপারে গিয়ে নিজেদের ‘ভিটে’য় বসে শিল্প-সাহিত্যচর্চা করুন না! আসলে কেউ-কেউ নিজেদের শিকড় অস্বীকার করতে চান। তাই সল বেলো কিংবা মালামাড অথবা ফিলিপ রথের মতো বিশ্ববরেণ্য সাহিত্যিক যখন নিজেদের ইহুদি পরিচয় গোপন না করে ‘হলোকাস্ট’-এর যন্ত্রণা নিয়ে লিখেছেন, লিখে গিয়েছেন– তখন ওই বঙ্গীয় তালেবরদের লেখা পড়লে মনে হয় পূর্ববঙ্গ থেকে পিকনিক করতে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিল, কোটির উপরে মানুষ। আর তারপর সেই পিকনিক স্পটেই থেকে গিয়েছে।
‘বৃহত্তর বাংলাদেশ’ তৈরির যে চেষ্টা চলছে খাগড়াগড় ও মালদা-মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন জায়গা কেন্দ্রে রেখে, তা যদি সফল হয়, তাহলে নতুন পিকনিক স্পটের সন্ধানে বেরতে হবে এখানকার বাঙালিকে। রঁাচি কিংবা কটকের রেল স্টেশনে চট বিছিয়ে শোয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আর, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে, ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে এগতে হবে। শুধু পূর্ব বাংলার নিজামুদ্দিন বা নুরুল আমিনের মতো ধৃতরাষ্ট্র কিংবা জিন্নার ‘ডায়রেক্ট অ্যাকশন’-এর সার্থক রূপকার, কলকাতার রাস্তায় লাশের পাহাড় বানানো সোহরাওয়ার্দি-ই নন; ইতিহাসের আদালতে বিচার চাই, দণ্ডকারণ্যে নির্বাসিত দলিত-নিরন্ন-সর্বস্বান্ত ‘বাঙালগুলো’-র উপর যঁারা মরিচঝঁাপিতে গুলি চালানোর অর্ডার দিয়েছিলেন– সেই ‘উদ্বাস্তু’-নেতা জ্যোতি বসু, অশোক মিত্রদেরও। আর, যত দিন সেই বিচার না হচ্ছে– তত দিন ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামটি হৃদয়ে গেঁথে যাওয়া বেয়নেট। তাকে উপড়ে ফেলতে চাইলে, আগে আমাদের হৃৎপিণ্ড উপড়ে ফেলতে হবে, মাই লর্ড।
(মতামত নিজস্ব)
