shono
Advertisement

Breaking News

Encounter

এনকাউন্টার: আদালতের পরিবর্তে বন্দুকের নলে কি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়?

‘এনকাউন্টার’ কি অপরাধ দমনের একটি ‘অপরিহার্য অশুভ পদ্ধতি’– অর্থাৎ এমন একটি কঠোর ব্যবস্থা, যা সমাজের নিরাপত্তার জন্য মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই? না কি ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’ এতদ্দ্বারা ‘আইনি রূপ’ পায়, একটি সুবিধাজনক প্রশাসনিক ভাষ্য-সহ?
Published By: Subhodeep MullickPosted: 10:59 AM Jul 12, 2026Updated: 10:59 AM Jul 12, 2026

বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের মামলার অন্যতম অভিযুক্ত পুলিশের গুলিতে নিহত। খবরে প্রকাশ, ঘটনার পুনর্নিমাণে অভিযুক্তকে নিয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে সে পুলিশের রিভলবার ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। পুলিশ তাকে ধাওয়া করলে পুলিশকে ‘লক্ষ‌্য’ করে গুলি চালায়। তখনই আত্মরক্ষার্থে পুলিশ তাকে পাল্টা গুলি করে। বলা হচ্ছে, এনকাউন্টারে অভিযুক্তর মৃতু‌্য। আইনি পরিভাষায়, অপরাধের ক্ষেত্রে, পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে কোনও সশস্ত্র অপরাধীর ‘মুখোমুখি সংঘর্ষ’ বা ‘গুলিচালনার ঘটনা’-কে ‘এনকাউন্টার’ বলা হয়।

Advertisement

ঘটনাটি সামনে আসতেই সামাজিক মাধ্যম থেকে আড্ডা– সর্বত্র একটিই প্রতিক্রিয়া– ‌‘বেশ হয়েছে’। কোনও কোনও অপরাধ সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। সেসব ক্ষেত্রে আইনের ভাষার চেয়ে আবেগের ভাষাই অনেক বেশি জোরালো হয়ে ওঠে। ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের পরে মানুষ দ্রুত শাস্তি দেখতে চায়। এই ‘বেশ হয়েছে’ প্রতিক্রিয়া হয়তো তারই প্রতিফলন। কিন্তু সেই আবেগ-আকাঙ্ক্ষা কি বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দিতে পারে?
রাষ্ট্র কি আদালতের পরিবর্তে বন্দুকের নলের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে? সেই চর্চাও বহমান।

এখানেই ‘এনকাউন্টার’ নিয়ে মূল প্রশ্নটি উঠে আসে। এটি কি অপরাধ দমনের একটি ‘অপরিহার্য অশুভ পদ্ধতি’– অর্থাৎ এমন একটি কঠোর ব্যবস্থা, যা সমাজের নিরাপত্তার জন্য কখনও কখনও মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই? না কি এটি রাষ্ট্রক্ষমতার এমন এক ‘বেপরোয়া ঘোড়া’, যা একবার লাগামছাড়া হয়ে গেলে আইনের শাসন, সাংবিধানিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ– সবকিছু পদদলিত করে?

ভারতে এনকাউন্টারের ইতিহাস পুরনো। ঔপনিবেশিক আমলে বিদ্রোহ দমন, স্বাধীনতার পরে বিচ্ছিন্নতাবাদ মোকাবিলা, পরে সন্ত্রাসবাদ, নকশাল আন্দোলন এবং সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই– বিভিন্ন সময়ে পুলিশি এনকাউন্টারকে কার্যকর অস্ত্র রূপে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু ধীরে ধীরে এই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই যেন স্বাভাবিক পুলিশি সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় একই ধরনের পুলিশি বয়ান বারবার সামনে আসে। অভিযুক্তকে ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সে আচমকা হাতকড়া খুলে পালানোর চেষ্টা করে। পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হয়। শেষ পর্যন্ত অভিযুক্ত নিহত হয়। কখনও কখনও ঘটনাস্থলে আহত পুলিশকর্মীও থাকেন। তদন্তের ঘোষণা হয়। তারপর ধীরে ধীরে বিষয়টি জনস্মৃতি থেকে মুছে যায়।

এই পুনরাবৃত্ত চিত্রনাট্যই প্রশ্নের জন্ম দেয়। সত্যিই কি প্রতিটি ঘটনায় একই নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়? না কি এটি ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’-কে ‘আইনি রূপ’ দেওয়ার একটি সুবিধাজনক প্রশাসনিক ভাষ্য? সন্দেহ আরও বাড়ে যখন দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বাধীন তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে আসে না কিংবা খুব কম ক্ষেত্রেই পুলিশি জবাবদিহি নিশ্চিত হয়।
ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকার দেওয়া হয়েছে। সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা কেবল আইনের মাধ্যমে, আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই প্রয়োগ করা যায়। কোনও ব্যক্তি যতই ভয়াবহ অপরাধে অভিযুক্ত হোক না কেন, আদালতের বিচারের আগে সে আইনের চোখে অভিযুক্ত মাত্র– দোষী নয়। এই নীতিই গণতন্ত্রের ভিত্তি। কারণ, বিচারব্যবস্থার মূল দর্শন প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার।

কিন্তু এখানেই আর-একটি বাস্তব সামনে আসে। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষের ধৈর্য প্রায় শেষ করে দিয়েছে। একটি ধর্ষণ বা হত্যার মামলার নিষ্পত্তি হতে কখনও ৫ বছর, কখনও ১০ বছর, কখনও তারও বেশি সময় লেগে যায়। বহু ক্ষেত্রে সাক্ষীরা মুখ ফিরিয়ে নেয়, প্রমাণ নষ্ট হয়, তদন্ত দুর্বল হয়, অভিযুক্ত জামিনে মুক্ত হয়ে সমাজে ঘুরে বেড়ায়। ভুক্তভোগীর পরিবার বছরের-পর-বছর আদালতের বারান্দায় ঘুরেফিরে বেড়ায় ন‌্যায়বিচারের প্রত্যাশায়। এই পরিস্থিতি মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। তখন অনেকেই মনে করে– আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার ধীরগতির চাইতে ‘এনকাউন্টার’-ই বেশি কার্যকর। দেখা যায়, মানুষ সিনেমার পর্দায় ‘এনকাউন্টার’ দেখে হাততালি দেয়। সিনেমার ‘এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট’ পুলিশ অফিসার হয়ে ওঠেন ‘হিরো’, ‘সুপার কপ’!

আশ্চর্য হতে হয়, যে-সমাজ মানবাধিকারের জয়গান গায়, সে-ই আবার বিচারবহির্ভূত হত‌্যায় উল্লাস করে। এই উল্লাসের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সবচেয়ে বড় বিপদ। বিচারবহির্ভূত হত্যাকে একবার সমাজ সমর্থন করতে শুরু করলে তার সীমা কোথায় শেষ হবে? আজ ধর্ষণের অভিযুক্ত, কাল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, পরশু ভুল পরিচয়ের কোনও নিরপরাধ মানুষ– কে নিশ্চিত করে বলতে পারে, বন্দুকের নল কখন কাদের দিকে ঘুরবে? রাষ্ট্র যদি বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তাহলে নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনই বা কোথায়?

এরই অন‌্য পীঠে রয়েছে আরও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘এনকাউন্টার’ সংস্কৃতির জন্য শুধু পুলিশকে দায়ী করলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় না। এর নেপথ্যে রয়েছে বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার সঙ্গে কম দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, পুলিশ সংস্কারের ব্যর্থতা, ফরেনসিক পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং জবাবদিহিতার অভাব। এই
সমস্ত ব্যর্থতার ফলেই সমাজের একাংশ

‘দ্রুত বিচার’-এর নামে আইনবহির্ভূত হত্যাকে মেনে নিতে শুরু করেছে। অর্থাৎ এনকাউন্টার কোনও সমস্যার মূল সমাধান নয়, বরং ভেঙে পড়া বিচারব্যবস্থার একটি উপসর্গ বলে ধরা
যেতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, রাজনৈতিক মহলেও অনেক সময় এনকাউন্টারকে জনপ্রিয়তার হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করা হয়। কঠোর প্রশাসনের ভাবমূর্তি তৈরি করতে, জনরোষ প্রশমিত করতে বা দ্রুত রাজনৈতিক বার্তা দিতে পুলিশি অভিযানের প্রশংসা করা হয়। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনপ্রিয়তা কখনও আইনের বিকল্প হতে পারে না। আইনের শাসন যদি একবার দুর্বল হয়ে যায়, তার ক্ষতি বহন করতে হবে পুরো সমাজকেই।

মানবাধিকার নিয়ে আলোচনা হলেই অনেকে প্রশ্ন তোলে– ‘অপরাধীর মানবাধিকার থাকবে, আর নির্যাতিতার থাকবে না?’ এই প্রশ্নের আবেগকেও অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু ‘মানবাধিকার’ মানে অপরাধকে সমর্থন করা নয়। বরং মানবাধিকার নিশ্চিত করে যে, রাষ্ট্র নিজেই যেন অপরাধীর ভূমিকায় না নেমে পড়ে। কারণ রাষ্ট্র যদি আইন ভাঙে,
তাহলে সাধারণ নাগরিকের কাছে আইনের মর্যাদা আর কোথায় থাকে?

অপরাধীদের কঠোরতম শাস্তি অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু সেই শাস্তি আদালতের রায়ের ভিত্তিতে, স্বচ্ছ তদন্ত ও নিরপেক্ষ বিচারের মাধ্যমে হতে হবে। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালকে আরও কার্যকর করা, আধুনিক ফরেনসিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সাক্ষী সুরক্ষা নিশ্চিত করা, পুলিশি তদন্তের মান উন্নত করা এবং পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত বাধ্যতামূলক করা– এই সংস্কারগুলিই প্রকৃত সমাধানের পথ। বিচারব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে এনকাউন্টারের প্রতি জনসমর্থন কমবে না।

বারুইপুরের ঘটনায় মানুষের ক্ষোভ স্বাভাবিক। অতীতে বেশ কিছু নির্দিষ্ট ঘটনায় নির্যাতিতাদের ‘ন‌্যায়বিচার’ বিলম্বিত হয়েছে। বারুইপুরের নাবালিকার উপর নৃশংস অত্যাচারের বিচার প্রত্যেকে চায়। কিন্তু বিচার আর প্রতিশোধ এক জিনিস নয়। গণতন্ত্রের শক্তি বন্দুকের ট্রিগারে নয়, আদালতের রায়ে। রাষ্ট্রের শক্তি অভিযুক্তকে গুলি করে হত্যা করার মধ্যে নয়, তাকে আইনের কাঠগড়ায় দঁাড় করিয়ে দোষ প্রমাণ করার মধ্যে। কারণ বিচারবহির্ভূত হত্যায় একজন অভিযুক্তর মৃত্যু হতে পারে, কিন্তু আইনের শাসনেরও কিছুটা মৃত্যু ঘটে।

‘এনকাউন্টার’ তাই কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। এটি এমন এক রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার আয়না, যেখানে মানুষ আদালতের চেয়ে বন্দুকের উপর বেশি আস্থা রাখতে শুরু করেছে। সেই আস্থা যদি ফিরিয়ে আনা না যায়, তাহলে একদিন হয়তো আমরা বুঝতেই পারব না– ‘অপরাধী’ কে, আর ‘আইনের রক্ষক’-ই বা কে! একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্রের কাছে এর চেয়ে বড় সতর্কবার্তা আর কিছু হতে পারে না।

তবে রাষ্ট্র ও পুলিশের অবস্থানটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পুলিশ প্রতিদিন এমন অপরাধী, সন্ত্রাসবাদী ও সশস্ত্র দুষ্কৃতীদের মুখোমুখি হয়, যেখানে মুহূর্তের সিদ্ধান্ত জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দঁাড়ায়। আইনও আত্মরক্ষার্থে এবং জনসাধারণের জীবন রক্ষার স্বার্থে প্রয়োজনীয় ও যুক্তিসংগত বলপ্রয়োগের অধিকার পুলিশকে দিয়েছে। ফলে প্রতিটি এনকাউন্টারকে যেমন প্রশ্নাতীত বলেও মেনে নেওয়া যায় না, তেমনই প্রতিটি ঘটনাকে পূর্বধারণা থেকে ভুয়া বা পরিকল্পিত হত্যা বলে ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। যদি কোনও অভিযুক্ত সত্যিই পুলিশের উপর প্রাণঘাতী হামলা চালায় এবং আত্মরক্ষার ‘বিকল্প’ না থাকে, তবে বলপ্রয়োগ আইনসম্মত হতে পারে। তাই প্রতিটি এনকাউন্টারের ক্ষেত্রে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ তদন্তই হওয়া উচিত সত্য নির্ধারণের একমাত্র উপায়। এতে যেমন সৎ ও কর্তব্যনিষ্ঠ পুলিশকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে, তেমনই আইনবহির্ভূত কাজের অভিযোগও নিরপেক্ষভাবে বিচার করা সম্ভব হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশের কার্যকারিতা এবং নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার– উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করাই প্রকৃত আইনের শাসনের পরিচয়।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement