ভারত ও চিন সম্পর্কের অভিধানে ‘বিশ্বাস’ শব্দটি দুর্লভ। ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর দুই দেশের সীমান্তে যে অবিশ্বাস, উত্তেজনা ও কৌশলগত দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা রাতারাতি মুছে যাওয়ার নয়। ‘প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা’ বরাবর সেনা মোতায়েন, সীমান্ত পরিকাঠামো, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুই দেশের প্রতিযোগিতা চলছেই। এই পরিস্থিতিতে নাথু-লা গিরিপথ দিয়ে ৬ বছর পর ভারত-চিন সীমান্ত বাণিজ্য ফের শুরু হওয়া দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
১৯৬২ সালে ভারত-চিন যুদ্ধের পর দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পরে ২০০৬ সালে এই পথে সীমান্ত বাণিজ্য ফের চালু হয়েছিল। কিন্তু কোভিড অতিমারীর অভিঘাতে ২০২০ সালে তা আবার বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এত দিন পরে বাণিজ্যের দরজা ফের খোলা মানে– শুধু স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য বাজার খুলে দেওয়া নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরে যোগাযোগের একটি বন্ধ জানালা পুনরায় খোলার চেষ্টা।
সীমান্ত সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান, ‘প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা’ বরাবর শান্তি ও স্থিতাবস্থা এবং দুই দেশের মধ্যে আস্থার পুনর্গঠন এখনও অনেক দূরের পথ।
এই প্রক্রিয়ার আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর সঙ্গে সঙ্গে সীমান্তবর্তী মানুষের অর্থনৈতিক স্বার্থকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা। সীমান্ত বাণিজ্য যত বেশি মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হবে, সীমান্তকে শুধুই নিরাপত্তা ও সামরিক প্রতিযোগিতার চোখে দেখার প্রবণতাও ততটা কমানো সম্ভব। তবে এই জায়গায় কূটনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে আবেগের পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি। নাথু-লা দিয়ে বাণিজ্য ফের চালু হয়েছে বলেই ভারত-চিন সম্পর্কের সমস্ত সমস্যা মিটে গিয়েছে, এমন ভাবার কারণ নেই।
ব্রিক্স সম্মেলনে যোগ দিতে শি ভারতে এলে দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে।
সীমান্ত সমস্যার পূর্ণাঙ্গ সমাধান, ‘প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা’ বরাবর শান্তি ও স্থিতাবস্থা এবং দুই দেশের মধ্যে আস্থার পুনর্গঠন এখনও অনেক দূরের পথ। বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানো যেমন প্রয়োজন, তেমনই সীমান্তে কোনও নতুন উত্তেজনা যাতে সে প্রক্রিয়াকে ফের পিছিয়ে না দেয়, তাও নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি কখনও কূটনৈতিক সমস্যার ‘বিকল্প’ হতে পারে না, বরং তা সমস্যার সমাধানের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এ কারণেই আগামী সেপ্টেম্বর মাসে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারতে আসার সম্ভাবনার সঙ্গে নাথু-লা দিয়ে বাণিজ্য পুনরারম্ভকে পাশাপাশি দেখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
ব্রিক্স সম্মেলনে যোগ দিতে শি ভারতে এলে দুই রাষ্ট্রনেতার মধ্যে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হবে। সেই বৈঠকের আগে সীমান্ত বাণিজ্য চালু হওয়া একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। এর ‘অর্থ’ এই নয় যে, দিল্লি বেজিংয়ের সঙ্গে তার কৌশলগত সতর্কতা সরিয়ে ফেলছে। নাথু-লা দিয়ে বাণিজ্য ফের চালু হওয়া তাই ‘বরফ সম্পূর্ণ গলে যাওয়ার’ ঘোষণা নয়; বরং বরফ গলানোর প্রথম কয়েকটি দৃশ্যমান পদক্ষেপের একটি। সেপ্টেম্বরের ব্রিক্স সম্মেলন যদি সেই প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক স্তরে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তবে নাথু-লার বাণিজ্যপথ শুধু পণ্য বহন করবে না, বহন করবে ভারত-চিন সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও।
