আর ক'দিন পরই সরস্বতীপুজো। তার ঠিক আগে বুধবার জন্মদিন মহাশ্বেতা দেবীর (Mahasweta Devi)। শতবর্ষে পা রাখলেন কিংবদন্তি মানুষটি। সরস্বতীরই অপর নাম মহাশ্বেতা। এ কি কেবলই সমাপতন? আসলে মৃত্যুর দশ বছর পরও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষায় তাঁর রচনাগুলির প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করে দেয় তিনি সরস্বতীরই আশীর্বাদধন্যা। সুতরাং এ আসলে কোনওভাবেই সমাপতন নয়। মহাশ্বেতা নেই। কিন্তু তাঁর কলম ও লড়াইয়ের কাহিনি রয়ে গিয়েছে একই রকম। অপরাজিত।
জন্ম ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি। বাবা কল্লোল যুগের সাহিত্যিক ও কবি মণীশ ঘটক। আমরা যাঁকে চিনি 'যুবনাশ্ব' নামে। মা ধরিত্রী দেবীও লেখা ও সমাজসেবা নিয়েই জীবন কাটিয়েছেন। এমন দুই গুণী মানুষের সন্তান মহাশ্বেতা আসলে রক্তের ভিতরেই পেয়েছিলেন এই অমোঘ উত্তরাধিকার। মহাশ্বেতার ছোটকাকার নাম ঋত্বিক ঘটক। বাংলা চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তি মাত্র নন তিনি। সামগ্রিক ভাবে চিন্তাশীল বাঙালির এক উজ্জ্বল নিদর্শন। নিশ্চিত ভাবেই তাঁর প্রভাবও মহাশ্বেতার ভিতরে ছিল।
প্রান্তিক মানুষ, অসহায় মানুষ, পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের কণ্ঠস্বর তিনি বুনে গিয়েছেন তাঁর লেখনীতে। যে লেখা স্রষ্টার শতবর্ষেও উজ্জ্বল চকমকি পাথরের মতো জ্বলে আছে এদেশের নিপীড়িত মানুষদের পথ দেখাতে, তাঁদেরই কণ্ঠ হয়ে।
শান্তিনিকেতন থেকে ইংরেজিতে স্নাতক হওয়ার পর মহাশ্বেতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর সম্পূর্ণ করেন। এর মধ্যেই গণনাট্য আন্দোলনের উজ্জ্বল নক্ষত্র বিজন ভট্টাচার্যের সঙ্গে পরিণয়। ১৯৪৮ সালে জন্ম তাঁদের একমাত্র পুত্র নবারুণের। কিন্তু বালকপুত্র সাক্ষী থাকে মা-বাবার বিচ্ছেদের। ১৯৫৯ সালে ডিভোর্স হয়ে যায় মহাশ্বেতা-বিজনের। ততদিনে প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে মহাশ্বেতার প্রথম বই 'ঝাঁসির রানি'। নিছক তথ্য জোগাড় করে রচিত জীবনীগ্রন্থ নয়, ঝাঁসি অঞ্চলে রীতিমতো ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছিলেন লেখার উপাদান। দেখা করেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। সেখান থেকেই পেয়েছিলেন প্রয়োজনীয় তথ্য ও ঝাঁসির রানিকে নিয়ে লিখিত লোকগীতি। সেটা ১৯৫৬ সাল। দাম্পত্য ততদিনে টালমাটাল। শুরু হল লেখিকা মহাশ্বেতার সংগ্রাম। ১৯৬২ সালে অসিত গুপ্তের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর।
১৯৬৪ সালে বিজয়গড় কলেজে অধ্যাপনা শুরু। তার আগে জীবিকা নির্বাহের জন্য এমনকী সাবানও বিক্রি করতে হয়েছে তাঁকে পাশাপাশি লেখালেখি চলল পুরোদমে। এবং অবশ্যই মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের অংশীদার হয়ে ওঠা। এক আশ্চর্য আগ্নেয় জীবন! কিংবদন্তি পরিচালক গোবিন্দ নিহালানি বলেছিলেন, পাঠক তাঁর লেখায় পায় 'ভয়েস অফ আ কমিউনিটি দ্যাট ইস আদারওয়াইজ ভয়েসলেস'। এক সম্প্রদায়ের স্বর তিনি ফুটিয়ে তোলেন আখ্যানে, যা অন্য সময় 'মূক'ই থাকে।
মহাশ্বেতার সামগ্রিক লেখালেখি নিয়ে একটি ছোট রচনায় খুব বেশি কিছু বলার থাকে না। সারা জীবনে লিখেছেন ১০০টিরও বেশি উপন্যাস। সেই সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে ২০টিরও বেশি ছোটোগল্প সংকলন। 'অরণ্যের অধিকার', 'হাজার চুরাশির মা'র মতো উপন্যাস কিংবা 'স্তনদায়িনী', 'রুদালি'র মতো ছোটগল্প... এবং আরও বহু রচনা। নিজের লেখা সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য, 'আমি সর্বদাই বিশ্বাস করি যে, সত্যকারের ইতিহাস সাধারণ মানুষের দ্বারা রচিত হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সাধারণ মানুষ যে লোককথা, লোকগীতি, উপকথা ও কিংবদন্তিগুলি বিভিন্ন আকারে বহন করে চলেছে, তার পুনরাবির্ভাবের সঙ্গে আমি ক্রমাগত পরিচিত হয়ে এসেছি। ...আমার কাছে লেখার উপাদানের অফুরন্ত উৎসটি হল এই আশ্চর্য মহৎ ব্যক্তিরা, এই অত্যাচারিত মানুষগুলি।... মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার লেখাগুলি আসলে তাদেরই হাতে লেখা।'
এটাই ছিল তাঁর লেখালেখির মূল সুর। প্রান্তিক মানুষ, অসহায় মানুষ, পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের কণ্ঠস্বর তিনি বুনে গিয়েছেন তাঁর লেখনীতে। যে লেখা স্রষ্টার শতবর্ষেও উজ্জ্বল চকমকি পাথরের মতো জ্বলে আছে এদেশের নিপীড়িত মানুষদের পথ দেখাতে, তাঁদেরই কণ্ঠ হয়ে। মহাশ্বেতা চলে গিয়েছেন। তাঁর রেখে যাওয়া রচনাগুলি রয়ে গিয়েছে। চিরকালীন হয়ে।
