তিনি স্বনামধন্য লেখক। এছাড়াও আরও তিনটি কারণে মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল আমার। তার একটি হল: আমরা দু’জনেই একদা পূর্ব রেলের জনসংযোগ দপ্তরের কাজ করেছি। তবে কেন জানি না, তিনি কস্মিনকালেও তাঁর পেশার তালিকায় এই জায়গার কথা উল্লেখ করেননি। লিখছেন সমীর গোস্বামী।
পোশাকি নাম– মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। লেখার জগতে ‘শংকর’ নামেই পরিচিত। আমার সৌভাগ্য, ‘লেখক’ পরিচিতি ছাড়াও, আরও তিনটি কারণে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। শুধুই যোগাযোগের পরিবর্তে, আর-একটু বেশি কাছের সম্পর্ক ছিল বললেও বোধহয় বাড়িয়ে বলা হবে না। এবং আমারও একটু ভাল লাগবে।
আমার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের কারণ, আমি পূর্ব রেলের জনসংযোগ দপ্তরের কাজ করেছি। আর মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ও তাঁর প্রথম জীবনের একটা সময় একই দপ্তরে, অর্থাৎ পূর্ব রেলের জনসংযোগ দপ্তরেই , কয়েক বছর চাকরি করেছেন। পূর্ব রেলের জনসংযোগ দপ্তর তখন ছিল এসপ্ল্যানেড ইস্টে, রাজভবনের উলটো দিকে কোণার বিশাল বাড়িটার একতলায়
রাস্তার উপরে (সম্প্রতি কয়লাঘাট স্ট্রিটে, জিপিও-র উলটোদিকে রেলের লাল বাড়িটায়
স্থানান্তরিত হয়েছে)।
শংকরের বাবার অকালপ্রয়াণ হলে, তাঁদের সংসারে অনটন দেখা দেয়। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, তখন তাঁকে ফেরিওয়ালা, টাইপ রাইটার ক্লিনার, প্রাইভেট মাস্টার, অন্নসংস্থানের জন্য বিভিন্ন কাজ করতে হয়েছিল। কিন্তু কেন জানি না, শংকর কস্মিনকালে কোথাও পূর্বরেলে জনসংযোগ দপ্তরের কাজের কথা প্রকাশ করেননি।
কিন্তু যখনই আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে, বা নিজেই গল্প করার জন্য ভিক্টোরিয়া হাউসে সিইএসসি-র সদর দপ্তরে তাঁর নিজের ঘরে ডেকেছেন, তখনই নিজের এককালের অফিসের কথা আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে তাঁর পুরনো সহকর্মীদের কথা। মজার কথা হল, তখনও তাঁর এক সহকর্মী ছিলেন, যাঁর নাম ‘সত্য বোস’। দেখা হলেই, ‘সত্যদা’-র কথা জিজ্ঞেস করতেন। সত্য বোস পরে নিজের অফিসে ‘স্যাটা বোস’ নামেই পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন।
আমার সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের কারণ, আমি পূর্ব রেলের জনসংযোগ দপ্তরের কাজ করেছি। আর মণিশংকর মুখোপাধ্যায়ও তাঁর প্রথম জীবনের একটা সময় একই দপ্তরে, অর্থাৎ পূর্ব রেলের জনসংযোগ দপ্তরেই , কয়েক বছর চাকরি করেছেন।
রেলের হাউস জার্নালে শংকরের লেখা পড়ে মুগ্ধ হয়ে যেতাম। যতবার ওঁকে জিজ্ঞেস করেছি, ‘আচ্ছা, আপনি রেল অফিসে আপনার চাকরির কথা কোনও ক্ষেত্রেই বলেন না কেন?’ জবাবে তিনি স্বভাবসিদ্ধ আলতো হাসিটা দিতেন। দ্বিতীয় কারণটা ছিল জনসংযোগবিদদের ‘পাবলিক রিলেশনস সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া’ নামে পেশাগত সংস্থায় দু’জনেরই সদস্য পদ। উনি কলকাতা চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন। সব পদেই ভোটাভুটি হত। আমি ছিলাম ওঁর বিপক্ষ শিবিরে।
শংকরের মতো অমন সজ্জন, মধুর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ মেলা ভার।
কিন্তু তাহলেও, ওঁর অফিসে ফিশ ফ্রাই থেকে কখনও বঞ্চিত হইনি। ব্যক্তিগত পর্যায়ে দু’জনের মধ্যে এতটুকু সদ্ভাব নষ্ট হয়নি। ওঁর অফিসে গিয়ে গল্পে বসলে, বর্তমান জনসংযোগ পেশার নতুন কৌশলের উদ্ভাবন অথবা অবনমন নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হত।
এবার তৃতীয় বা শেষ কারণটায় আসি। উত্তরপাড়ায় আমার বাড়ির গলিটাতেই ছিল ওঁর শ্বশুরবাড়ি! আমার সৌভাগ্যের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। তা বলার যথেষ্ট কারণ আছে। একদিকে ওঁর মতো বরেণ্য লেখক, আবার অপর দিকে তুখড় জনসংযোগবিদ সচরাচর
দেখা যায় না। ওঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ পেয়েছি।
‘পাবলিক রিলেশনস সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া’ (পিআরএসআই) আয়োজিত হিন্দি সাংবাদিকতা বিষয়ে একটি আলোচনা সভায় হিন্দি সংবাদমাধ্যমের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্যিকরাও উপস্থিত ছিলেন। বক্তা মণিশংকর মুখোপাধ্যায়। যথারীতি মাইকের সামনে দাঁড়ালেন এবং হিন্দিতেই বলতে শুরু করলেন। কী বলে শুরু করলেন? সবাইকে সম্ভাষণের পরে বললেন, ‘মেরা এক দুখ অউর শরম কি বাত হ্যায় কি, ম্যায় গলদ হিন্দি বোলতা হুঁ। ইস লিয়ে ম্যায় বাংলা মে হি বলুঙ্গা।’ সভা জুড়ে উঠল হাসির রোল। লিখতে বসেও ওঁর ধুতি-পাঞ্জাবি পরা, মৃদু হাসি মাখা চেহারাটা মনের মধ্যে যেন ভেসে উঠছে। অমন সজ্জন, মধুর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ মেলা ভার।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
