সলমন রুশদির ‘দ্য সেটানিক ভার্সেস’ প্রকাশ পেয়েছিল ১৯৮৮ সালের সেপ্টেম্বরে। অব্যবহিত পরেই বেশ কিছু মুসলিম দেশে তা ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষিত হয়। ইরান প্রথম ৫ মাস কিছু করেনি। কিন্তু ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাকিস্তানে ৬ জনের মৃত্যু হলে নড়েচড়ে বসে ইরান। তৎকালীন সর্বোচ্চ ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। জারি করেন মৃত্যু-ফতোয়া, সলমন রুশদির বিরুদ্ধে। তাঁর মতে এই বইয়ে রুশদি ইসলামের অবমাননা করেছেন। তিনি এও বলেন, যে কোনও ভাষায় যদি কেউ এই বইটি প্রকাশ করেন, তাহলে সেই ব্যক্তি ইসলাম ধর্মাবলম্বী না হলেও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় চলে আসবেন।
আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনির প্রখ্যাত মন্তব্যটি এরকম– ‘আই ক্যান কল অন অল ভ্যালিয়েন্ট মুসলিম্স হোয়্যারএভার দে মে বি ইন দি ওয়ার্ল্ড টু কিল দেম উইদাউট ডিলে, সো দ্যাট নো ওয়ান উইল ডেয়ার ইনসাল্ট দ্য স্যাক্রেড বিলিফ্স অফ মুসলিম্স হেনসফোর্থ।’ এহেন নিষেধাজ্ঞার পরে সলমন রুশদির জীবনে যে দুর্বিষহ দিন নেমে এসেছিল, তার বর্ণনা তিনি আত্মজৈবনিক ‘জোসেফ আন্তন’ বইয়ে বিবৃত করেছেন। অনুবাদক এবং প্রকাশকরাও খুব ভালো ছিলেন না। ১৯৯১ সালে এত্তোরে ক্যাপ্রিলো, ‘দ্য সেটানিক ভার্সেস’-এর ইতালীয় অনুবাদক মিলানের ফ্ল্যাটে ছুরিকাহত হন। কিছু পরে জাপানের অনুবাদক হিতোশি ইগারাশি টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটে আক্রান্ত হন। ছুরির নির্মম আঘাতে মৃত্যু ঘটে তাঁর।
এই বইয়ে রুশদি ইসলামের অবমাননা করেছেন, মনে করতেন কট্টরপন্থী খামেনেই।
১৯৯৩ সালে গুলিবিদ্ধ হন উইলিয়াম নিগার্ড। নরওয়েতে রুশদির এই বিতর্কিত বইপ্রকাশে তাঁর ভূমিকা ছিল। বুঝতে অসুবিধা হয় না, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনির জারি করা মৃত্যু-ফতোয়াকে ধর্মবিশ্বাসী মুসলিম বিশ্ব যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছিল। সদ্যপ্রয়াত ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু আয়াতুল্লাহ আলি হোসেইনি খামেনেই (Ayatollah Ali Khamenei) এ নির্দেশ জারি করেননি বটে, তবে পূর্বনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞাকে দস্তুরমতো সমর্থন করেছেন। এ কারণেই তিনি ‘হার্ডলাইনার’। মাঝে মহম্মদ খাতামি (১৯৯৭-২০০৫) যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, চেষ্টা করেছিলেন পশ্চিমি বিশ্বের সঙ্গে আলোচনা করে এই নিষেধাজ্ঞার নির্বাপণ ঘটাতে।
১৯৯৩ সালে গুলিবিদ্ধ হন উইলিয়াম নিগার্ড। নরওয়েতে রুশদির এই বিতর্কিত বইপ্রকাশে তাঁর ভূমিকা ছিল।
বিশেষত, ব্রিটেনের সঙ্গে কূটনৈতিক দৌত্যের প্রশ্নে রুশদির মৃত্যু-ফতোয়া জরুরি হয়ে ওঠে, কেননা ব্রিটেন দীর্ঘ দিন রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিল রুশদিকে। মহম্মদ খাতামির জমানায় ইরান সরকারিভাবে ঘোষণাও করে, রুশদিকে মারতে পারলে অর্থমূল্যের যে-ঘোষণা করা হয়েছিল, তা আর কার্যকর নয়। কিন্তু তত দিনে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মগুরুর পদে আসীন আলি খামেনেই বলে দেন, ইমাম খোমেইনি-র আদেশ এখনও পালনীয়। ২০২২ সালের ১৩ আগস্ট হাজি মাতার প্রাণঘাতী হামলা চালান রুশদির উপর। আলি খামেনেইয়ের সমর্থন না থাকলে তা ঘটা সম্ভব হত কি?
