প্রেমজ সম্পর্কে ‘না’ শুনতে এখনও ভারতীয় পুরুষমানস অভ্যস্ত নয়। গুরুগ্রামে লিভ-ইন পার্টনার যৌনতায় ‘না’ বলায় উগ্রচণ্ড হল পুরুষ।
কিছু চিঠির নিয়তি, তারা কখনও যার উদ্দেশে লেখা, তার কাছে গিয়ে পৌঁছবে না। হয়তো হাওয়ায় বিচূর্ণ হবে। হয়তো রোদে মিশে যাবে। হয়তো সমুদ্রের ঢেউয়ে ফসফরাসের মতো ভাসতে ভাসতে রাতের অঁাধারে অনবরত জ্বলতে থাকবে। হয়তো মাটিতে মিশে যাবে সার হয়ে, সংবেদ হয়ে। অ্যালিস ওয়াকারের ‘দ্য কালার পার্পল’ উপন্যাসের সেই চতুর্দশী কালো মেয়েটির লেখা সেসব চিঠির কথা আমরা কী করেই-বা ভুলতে পারি, যার প্রাপক হওয়ার কথা ছিল স্বয়ং ঈশ্বরের– ‘গড’ যঁার নাম।
সব চিঠিতেই মেয়েটি সম্বোধন করে লেখে– ‘ডিয়ার গড’। একটি চিঠিতে যেমন সে লিখেছিল– ‘ডিয়ার গড, ও আজ আমাকে খুব মেরেছে। কেন জানো? আমি নাকি চার্চে গিয়ে একটি ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখ মেরেছি। বিশ্বাস করো, আমি কাউকে চোখ মারিনি। হয়তো আমার চোখে তখন কিছু পড়েছিল সেই সময়, তাই চোখ রগড়াচ্ছিলাম। ও ভাবল, আমি নষ্টামি করছি। অথচ জানো, আমি কোনও ছেলের দিকেই তাকাই না। পুরুষদের দিকে তাকাতে আমি ভয় পাই। আমি শুধু মেয়েদের দিকে তাকাই। মেয়েরা চিৎকার করে না, মারে না।’
পুরুষের এহেন দুর্দমনীয় দম্ভর নজির অঢেল। নারী, পুরুষের কাছে, নেহাত সম্ভোগের উপাদান নয়– একইসঙ্গে প্রতাপ দেখানোর, আধিপত্য চালানোর, নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার রক্তমাংসের পুত্তলিকাও বটে।
একজন পরাক্রান্ত পুরুষমানস এখানে যেন ভেসে ওঠে আমাদের চোখের সামনে, যার ভয়ে কুঁকড়ে যায় চতুর্দশী মেয়েটির সত্তা। এই ভয় তার মধ্যে এমনভাবে জঁাকিয়ে বসেছে যে, মেয়েদের দিকে তাকাতে সে নিরাপদ বোধ করে, কারণ, মেয়েরা শারীরিকভাবে নির্যাতন করে না তাকে। পুরুষের এই ভাবমূর্তি নিঃসন্দেহে গর্ব করে বলার মতো নয়। কিন্তু সত্য উদ্ঘাটনের দায় কঁাধে নিলে, বলতে তো হবেই, পুরুষের এহেন দুর্দমনীয় দম্ভর নজির অঢেল। নারী, পুরুষের কাছে, নেহাত সম্ভোগের উপাদান নয়– একইসঙ্গে প্রতাপ দেখানোর, আধিপত্য চালানোর, নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার রক্তমাংসের পুত্তলিকাও বটে। এবং এর সহজ পন্থা– প্রেমজ সম্পর্ক ও যৌনতা। যৌনসঙ্গিনীকে কবজায় রাখার জন্য পুরুষের হিংস্রতা কোথায় যেতে পারে, তার সাম্প্রতিক নিদর্শন গুরুগ্রামের একটি ঘটনা, যেখানে একটি মেয়ে, বিয়ের আগে, লিভ-ইন পার্টনারের সঙ্গে যৌনতায় লিপ্ত হতে চায়নি। এই ভুল-বোঝাবুঝি থেকে নাছোড় প্রেমিক স্যানিটাইজার ঢেলে দিয়েছে প্রেমিকার গোপনাঙ্গে, শুধু তা-ই নয়, আগুনও ধরিয়ে দেয়। গুরুতর জখম অবস্থায় মেয়েটি এখনও চিকিৎসাধীন।
‘না’। এই শব্দের অভিঘাতের সঙ্গে যে ভারতীয় পুরুষ, হলই-বা ‘জেন জি’, এখনও অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি, বলা বাহুল্য। ‘না’ কেবল নেতিবাচক মনোভাবকে বোঝায় না, সম্পর্কে ‘না’ একটি মেয়ের নিজস্ব ইচ্ছাজগৎকে প্রতিফলিত করে। শরীরের অধিকার যদি নারীর হয়, তাহলে সেই শরীর কখন যৌনতায় অংশ নেবে বা নেবে না, তা নির্ভর করা উচিত নারীর সম্মতি বা অসম্মতির উপর। লিভ-ইন করা অবস্থায় কোনও নারী বলতেই পারে, যৌনতার জন্য সে প্রস্তুত নয়। শুনতে ভালো লাগল বা খারাপ, মনোবাঞ্ছা ধাক্কা খেল বা খেল না, এই ‘না’-র প্রতি আস্থা ও সম্মান রাখা ছাড়া পুরুষের আর কী করার থাকতে পারে। আর যা করার আছে, তাতে যে পৌরুষ নেই!
