শুধু কিউআর কোডের উপর ভরসা করা যাবে না। প্রস্তুতকারকের নাম, ব্যাচ নম্বর, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, প্যাকেটের মান ও বিক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতা– সব মিলিয়ে বিচার করতে হবে। ভেরিফিকেশন ওয়েবসাইটের পুরো ইউআরএল ভালো করে দেখতে হবে; সম্ভব হলে অফিসিয়াল সাইট বুকমার্ক করে রাখা উচিত। লিখলেন দীপ্র ভট্টাচার্য।
একটুকরো কালো-সাদা বর্গাকার ছাপ– এখন সেটাই নাকি আমাদের জীবনের রক্ষাকবচ! ওষুধের গায়ে থাকা ‘কিউআর কোড’ স্ক্যান করলেই মনে হয়, সব সন্দেহ দূর, সব ঝুঁকি শেষ! প্রযুক্তির এই ছোট্ট ‘টিক’ চিহ্নে আমরা অন্ধবিশ্বাস রাখতে শিখেছি। কিন্তু প্রশ্ন হল– এই অন্ধবিশ্বাস কি আদৌ নিরাপদ? না কি আমরা অজান্তেই আমাদের স্বাস্থ্য আর জীবনকে তুলে দিচ্ছি নতুন এবং আরও সূক্ষ্ম প্রতারণার হাতে? ডিজিটাল যুগে ভেজাল ওষুধের চেহারা বদলেছে; বোতল বা স্ট্রিপ নয়, এখন প্রতারণা লুকিয়ে থাকে স্ক্যানের পরের স্ক্রিনে।
ওষুধের গায়ে কিউআর কোড– শুনতে আধুনিক, নিরাপদ, আশ্বস্ত করার মতো। রোগী কিংবা সাধারণ উপভোক্তার হাতে যেন ডিজিটাল ঢাল তুলে দেওয়া হয়েছে। স্ক্যান করুন, যাচাই করুন, নিশ্চিত হোন– এই ছিল প্রতিশ্রুতি। ভারত-সহ বহু দেশে সরকার ও ওষুধ-নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্যোগে ‘কিউআর কোড’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে। কিন্তু বাস্তবতা এখন অনেক বেশি জটিল ও উদ্বেগজনক। যে-প্রযুক্তির মানুষের জীবনরক্ষার কথা ছিল, সেই প্রযুক্তিই এখন অপরাধীদের হাতে নতুন অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
‘কিউআর কোড’ যুক্ত করার নেপথ্যে উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক। এর মাধ্যমে ‘উপভোক্তা’ সহজে বুঝতে পারবেন ওষুধটি ‘আসল’ না ‘নকল’, উৎপাদন থেকে বিতরণ পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলকে ট্র্যাক করা যাবে, ভেজাল বা নিম্নমানের ওষুধের বাজার কমবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু প্রযুক্তিগত এক মৌলিক দুর্বলতা এখানে থেকেই গিয়েছে– ‘কিউআর কোড’ সহজেই কপি, ক্লোন ও রিডাইরেক্ট করা যায়। আর, ঠিক এই ফাঁকই অপরাধীরা দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাচ্ছে।
ওষুধের গায়ে কিউআর কোড– শুনতে আধুনিক, নিরাপদ, আশ্বস্ত করার মতো। রোগী কিংবা সাধারণ উপভোক্তার হাতে যেন ডিজিটাল ঢাল তুলে দেওয়া হয়েছে। স্ক্যান করুন, যাচাই করুন, নিশ্চিত হোন– এই ছিল প্রতিশ্রুতি।
ভেজালচক্রের প্রথম কৌশল হল ‘কিউআর কোড ক্লোনিং’। একটি ‘আসল’ ওষুধের প্যাকেট থেকে ‘কিউআর কোড’ কপি করে হাজার হাজার ‘নকল’ স্ট্রিপ বা বাক্সে ছাপা হয়। উপভোক্তা যখন স্ক্যান করেন, অনেক সময় সিস্টেম ‘জেনুইন’ দেখায়। একাধিকবার স্ক্যান হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে তা ধরা পড়ে না। যদি কোনও অ্যালার্ট আসে, ততক্ষণে বাজারে বিপুল পরিমাণ ভেজাল ওষুধ ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতি হয়ে যায়, তারপর সতর্কতা।
এর থেকেও ভয়ংকর কৌশল– ভুয়ো ভেরিফিকেশন ওয়েবসাইট। অপরাধীরা এমন ওয়েবসাইট তৈরি করে– যা দেখতে হুবহু ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা বা সরকারি যাচাইকরণ পোর্টালের মতো। ‘নকল’ কিউআর কোড স্ক্যান করলে উপভোক্তা সেই সাইটে পৌঁছন, যেখানে বড় সবুজ ‘টিক’ চিহ্ন, ‘Product Verified’ বা ‘Genuine Medicine’ লেখা ভেসে ওঠে। সঙ্গে থাকে বানানো ব্যাচ নম্বর, উৎপাদনের তারিখ। সাধারণ মানুষের চোখে সবই বিশ্বাসযোগ্য। এই মিথ্যা নিশ্চয়তাই আসলে সবচেয়ে বিপজ্জনক– কারণ, রোগী মনে করেন তিনি নিরাপদ, অথচ ভিতরে ভিতরে বিপর্যয় ঘটে চলেছে।
আর-একটি দিক আরও উদ্বেগজনক– ‘কুইশিং’, অর্থাৎ কিউআর কোডের মাধ্যমে ‘ফিশিং’ সাইবার অপরাধ। কিছু ‘নকল’ কিউআর কোড আদৌ ওষুধ যাচাইয়ের জন্য নয়। স্ক্যান করলেই ব্যবহারকারী পৌঁছে যান ম্যালিসিয়াস ওয়েবসাইটে, যেখানে ম্যালওয়্যার ডাউনলোড হয়, অথবা ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য চুরি করার চেষ্টা চলে। স্বাস্থ্য প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত হয় সাইবার অপরাধ– ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়।
‘নকল’ কিউআর কোড স্ক্যান করলে উপভোক্তা সেই সাইটে পৌঁছন, যেখানে বড় সবুজ ‘টিক’ চিহ্ন, ‘Product Verified’ বা ‘Genuine Medicine’ লেখা ভেসে ওঠে। এই মিথ্যা নিশ্চয়তাই আসলে সবচেয়ে বিপজ্জনক– কারণ, রোগী মনে করেন তিনি নিরাপদ, অথচ ভিতরে ভিতরে বিপর্যয় ঘটে চলেছে।
এই পরিস্থিতি কেন এত বড় জনস্বাস্থ্য সংকট? কারণ, ভেজাল ওষুধ সমাজের কাছে এক ভয়ানক বিপদ। এতে ভুল মাত্রা থাকতে পারে, কার্যকর উপাদান নাও থাকতে পারে, এমনকী বিষাক্ত বা অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকও থাকতে পারে। ফলাফল হতে পারে চিকিৎসা ব্যর্থতা, ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়া, তেমন-তেমন হলে মৃত্যুও। যখন যাচাইকরণ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে, তখন মানুষের আস্থা ধসে যায়– আর, সেই আস্থার ফঁাক দিয়েই বিপদ ঢুকে পড়ে।
উপভোক্তাদের সেজন্য কিছু সতর্ক সংকেত উপেক্ষা করা উচিত নয়। যদি কিউআর কোড স্ক্যান করলে অপরিচিত বা নিম্নমানের ওয়েবসাইট খোলে, ইউআরএলে বানান ভুল বা অদ্ভুত ডোমেন থাকে, মুহূর্তের মধ্যে ‘জেনুইন’ ফলাফল দেখায় কিন্তু কোনও বিস্তারিত তথ্য দেয় না, প্রস্তুতকারকের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় না থাকে, প্যাকেটের ছাপা বা গুণমান খারাপ লাগে, অথবা ইন্টারনেট ছাড়াই কিউআর কোড কাজ করে– তবে সতর্ক হওয়া জরুরি। এসবই বিপদের রেড ফ্ল্যাগ।
নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে উপভোক্তাদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, কিউআর কোডের উপর ভরসা করা যাবে না। প্রস্তুতকারকের নাম, ব্যাচ নম্বর, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, প্যাকেটের মান ও বিক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতা– সব মিলিয়ে বিচার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভেরিফিকেশন ওয়েবসাইটের ইউআরএল ভাল করে দেখতে হবে; সম্ভব হলে অফিসিয়াল সাইট বুকমার্ক করে রাখা উচিত। তৃতীয়ত, সব স্ক্যানে যদি সবসময় ‘জেনুইন’ দেখায় এবং কোনও স্ক্যান ইতিহাস বা সতর্কতা না থাকে, তাহলে সন্দেহ করা দরকার। চতুর্থত, কোনও যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় কখনওই ওটিপি, ব্যাঙ্ক বা ইউপিআই তথ্য, কিংবা অজানা অ্যাপ ডাউনলোডের অনুমতি চাওয়া উচিত নয়। পঞ্চমত, শুধুমাত্র অনুমোদিত ও পরিচিত ফার্মেসি বা বিক্রেতার কাছ থেকেই ওষুধ কেনা জরুরি। আর সন্দেহ হলে তা ফার্মাসিস্ট, প্রস্তুতকারক সংস্থা এবং ওষুধ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত– আগাম রিপোর্টিং অনেক প্রাণ বঁাচাতে পারে। তবে দায়িত্ব শুধু উপভোক্তার নয়। প্রস্তুতকারক ও নিয়ন্ত্রকদেরও এগিয়ে আসতে হবে– ‘ডায়নামিক’ বা একবার ব্যবহারযোগ্য কিউআর কোড চালু করা, রিয়েল-টাইম স্ক্যান প্যাটার্ন নজরদারি, জনসচেতনতা বাড়ানো, সিরিয়াল নম্বর বা অফিসিয়াল অ্যাপের সঙ্গে কিউআর যাচাই যুক্ত করা, এবং ভুয়া ওয়েবসাইট দ্রুত বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।
শেষ পর্যন্ত একটি কথাই সত্য– সচেতনতাই আসল ওষুধ। কিউআর কোড প্রযুক্তি খারাপ নয়– খারাপ হল আমাদের নিঃশর্ত আস্থা। যত দিন না যাচাইকরণ ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ, শক্ত ও জবাবদিহিমূলক হচ্ছে, তত দিন একটি সবুজ ‘Verified’ লেখা কোনও সুরক্ষার গ্যারান্টি নয়। ওষুধের মতো জীবন-মরণ প্রশ্নে সন্দেহ করা অপরাধ নয়, বরং দায়িত্ব। তাই স্ক্যান করুন, কিন্তু ভাবুন। যাচাই করুন, কিন্তু প্রশ্ন তুলুন। বিশ্বাস করুন, কিন্তু অন্ধভাবে নয়। স্মার্টভাবে স্ক্যান করুন– নিরাপদ থাকুন। এখন ভেজাল কেবল ওষুধে নয়– ভেজাল নিশ্চয়তায়, বিশ্বাসেও।
