সুনীতা উইলিয়ামস অবসাদে ভুগছেন। যিনি ক'দিনের জন্য মহাকাশ গিয়ে ৬০৮ দিন কাটিয়ে অবশেষে পৃথিবীতে ফিরেছেন। পৃথিবীতে ফিরেই তিনি তাঁর সাদা চুল কালোতে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে বয়স কমিয়ে ফেলতে পেরেছেন। ভেবেছিলেন- চুলে কালো রং ফিরে পেলেই তাঁর মনের কাতরতা কাটবে। কিন্তু তা হল কই? রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, 'কিছুতেই যায় না মনের ভার'।
মহাকাশে দীর্ঘ দিন থাকার পরে আমেরিকায় সুনীতাকে থাকতে হয় দীর্ঘ শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার মধ্যে। শারীরিক স্বাভাবিকতায় তিনি ফিরেছেন। কিন্তু তাঁর মন তো ফিরতে পারেনি স্বাভাবিক ছন্দে। বিষাদ কাটছে না এখনও।
মহাশূন্যের শূন্যতা যেন গ্রাস করেছে মন। সুনীতা ভেবেছিলেন মাতৃভূমি কেরলের সাহিত্য-সংস্কৃতির মধ্যে ফিরে এলে হয়তো কাটবে বিষন্নতা। কিন্তু কেরলের এক সাহিত্য উৎসবে বৃহস্পতিবার তিনি এই ইশারা দিয়েছেন যে মহাশূন্যে দীর্ঘ সময় কাটাতে কাটাতে তাঁর মনে হয়েছে যে এই পৃথিবীর কত সুন্দর সুন্দর জায়গা তাঁর দেখা হয়নি! এমনকী, তিনি কি কেরলকেও তেমনভাবে দেখেছেন? চিনেছেন? তাঁর মনের ক্লান্তি হয়তো দূর হবে নিজের দেশ, এবং পৃথিবীকে আরও ব্যাপ্তভাবে আবিষ্কার করতে পারলে।
কিন্তু সত্যিই কি তাই? মনে রাখতে হবে, এই বছরেই নাসা-র চন্দ্রাভিযান 'আর্টেমিস ২' চার মহাকাশচারীকে নিয়ে চাঁদের পথে রওনা হবে। সুনীতা থাকবেন পৃথিবীতে। দূর থেকে খবর পাবেন চার অভিযাত্রী পৌঁছে গিয়েছেন। এই সংবাদ কি তাঁকে আরও বিষণ্ণ করবে না? হয়তো না।
সুনীতা তাঁর জীবনের ২৭ বছর কাটিয়েছেন মহাকাশ নিয়ে গবেষণায়। দীর্ঘ ন'মাস কাটিয়েছেন মহাশূন্যে অনিকেত বিপন্নতায়। কিন্তু মহাশূন্য বা মহাবিশ্বের ওই প্রাণহীন অন্তহীন প্রসার কী তাঁকে দিয়েছে? এই প্রসঙ্গে আরও একবার ফিরে যাওয়া যাক রবীন্দ্রনাথে। তিনি যে গানের প্রথম পঙ্ক্তিতে বলছেন, 'আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার' সেই গানেরই শেষ পঙ্ক্তিতে বলছেন, বুক ভরে সে নিয়ে গেল বিফল অভিসার'। সুনীতাও কি সেইটুকুই নিয়ে ফিরে আসেননি প্রাণের কোনও প্রমাণ, কোনও চিহ্নহীন, মানুষের নাগাল, নিয়ন্ত্রণ, নিরীক্ষণের অতীত মহাশূন্যের অভিসার থেকে? মহাবিশ্ব এতই বিপুল, মানুষের অতি সীমিত বোধবুদ্ধির পক্ষে তার সমস্তটা বোঝার চেষ্টা অবসাদে শেষ হতে বাধ্য- এই দর্শন বিম্বিত হয়েছে কাফকা থেকে কামু থেকে মহাকাশবিজ্ঞানী ব্রায়ান গ্রিনের লেখায়।
১৮ কোটি আলোকবর্ষ দূরের কোনও গ্রহে প্রাণ থাকলেই বা কী? মহাবিশ্বর কাছে এ দূরত্বও কিছু না! কিন্তু মানুষের জীবন, মেয়াদ, বোধ সেই অলঙ্ঘ দূরত্ব থেকে পাবে বিফল অভিসারের অবসাদ। এমনকী, মানুষের সীমাবদ্ধতা তাকে কি শেষ পর্যন্ত বুঝতে দেয় তার নিজের যাপন ও অস্তিত্বের অর্থ? কোথা থেকে এলাম? কেনই-বা এলাম? কোনও উত্তর আছে? আমাদের সীমিত আকাশ থেকে মহাকাশে গিয়েও কোনও উত্তর কি পেয়েছেন সুনীতা? সেটাই কি হতে পারে না তাঁর অবসাদের যথেষ্ট কারণ?
