মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত ‘বোর্ড অফ পিস’-এ ভারতের অনুপস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে কূটনৈতিক দ্বিধা বলেই মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে সচেতন সিদ্ধান্ত। কারণ, এই প্রস্তাবের আড়ালে শান্তির যে-কাঠামো তুলে ধরা হয়েছে, তার ভিত কতদূর ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য– সেই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও অস্পষ্ট।
গাজা যুদ্ধবিরতির পর নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে একটি বহুপাক্ষিক উদ্যোগ নিশ্চয়ই সময়োপযোগী। লক্ষ লক্ষ বাস্তুচ্যুত, অবরুদ্ধ ও বিধ্বস্ত মানুষের জন্য দ্রুত সহায়তা পৌঁছনো এখনও মানবিক দায়িত্ব। আবার, ঐতিহাসিকভাবে ভারত প্যালেস্তাইনের মানুষের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে থেকেছে। সেই পরম্পরা থেকে দেখলে, পুনর্গঠনের যে কোনও বাস্তব প্রচেষ্টায় ভারতের গঠনমূলক ভূমিকা থাকা স্বাভাবিক।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এই বোর্ড আদৌ কি নিরপেক্ষ, আন্তর্জাতিকভাবে জবাবদিহিমূলক শান্তি-প্রক্রিয়া, না কি একটি শক্তিধর রাষ্ট্রের প্রভাববিস্তারের নতুন মঞ্চ? রাষ্ট্র সংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন পাওয়া মূল প্রস্তাবের সঙ্গে বর্তমান বোর্ডের গঠন ও ম্যান্ডেটের অমিল হলে তা উদ্বেগজনক। যদি এই গাজার প্রসঙ্গকে কাঠামোগতভাবে সরিয়ে দিয়ে একটি বিস্তৃত, কিন্তু অস্পষ্ট মঞ্চ বানানোর চেষ্টা হয়, তবে তা রাষ্ট্র সংঘের ভূমিকাকেই পাশ কাটানোর ইঙ্গিত দেয়। শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক নজির হয়ে দাঁড়াবে।
গাজা যুদ্ধবিরতির পর নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বহুপাক্ষিক উদ্যোগ সময়োপযোগী।
আরও বড় প্রশ্ন: প্রতিনিধিত্বের। যে-সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু প্যালেস্তাইনের জনগণ, সেই বোর্ডে যদি তাদের স্বীকৃত রাজনৈতিক নেতৃত্বের কোনও জায়গাই না থাকে, তবে সেটি কেবল অন্যায় নয়, কার্যকারিতার দিক থেকেও ভঙ্গুর। প্রযুক্তিগত বিশেষজ্ঞ বা প্রশাসনিক পরামর্শদাতা দিয়ে একটি জাতির রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিস্থাপন করা যায় না। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে প্যালেস্তাইনের প্রতিনিধিত্ব অস্বীকার করা নৈতিক ভারসাম্যকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
পশ্চিম এশিয়ার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশ এই বোর্ডে যোগ দিয়েছে। ফলে নয়াদিল্লির উপর চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ভারতের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সমীকরণও কম জটিল নয়। পশ্চিম এশিয়ার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশ এই বোর্ডে যোগ দিয়েছে। ফলে নয়াদিল্লির উপর চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আবার, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের ওঠাপড়া এবং বাণিজ্যিক দরকষাকষির বাস্তবতাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে একটি পরিণত, আত্মবিশ্বাসী দেশের পররাষ্ট্রনীতি কেবল চাপ এড়াতে বা প্রভাবের বৃত্তে থাকার তাগিদে ঘূর্ণিত হতে পারে না।
বিশেষত এমন একটি কাঠামোতে, যেখানে সদস্য পদের স্তরভেদ, অর্থের বিনিময়ে স্থায়ী মর্যাদা, কিংবা রাষ্ট্র সংঘের বাইরে সামরিক স্থিতিশীলতা রক্ষা বাহিনীতে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা– সব মিলিয়ে ভবিষ্যতে অপ্রত্যাশিত দায়বদ্ধতা তৈরি হতে পারে। ভারত বরাবরই দ্বিরাষ্ট্র সমাধান, আন্তর্জাতিক আইন, এবং রাষ্ট্রসংঘ-নির্ভর বহুপাক্ষিকতার পক্ষে কথা বলেছে। সেই অবস্থান হঠাৎ করে বদলানো কারণ নেই এখনই!
