shono
Advertisement
Donald Trump

'শিল্ড গাঁয়ের বাইরে যেতে দেব না...' 'নোবেল-খ্যাপা' ট্রাম্পের রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেলিং

মাচাদোর দেওয়া মেডেলটি ট্রাম্পের ‘ইগো’-র জন্য একটি মলম রূপে কাজ করলেও তা বিশ্বমঞ্চে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে না।
Published By: Biswadip DeyPosted: 06:23 PM Jan 27, 2026Updated: 07:49 PM Jan 27, 2026

ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) যখন দাবি করেন যে, তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কার না দিলে তিনি আর ‘শান্তির কথা ভাববেন না’, তখন তিনি মূলত শান্তিস্থাপনকে একটি পণ্যে পরিণত করেন। বাকি বিশ্বের কাছে ব্যাপারটা হাস্যকর ও পাগলামি বলে মনে হলে কোরিনা মাচাদোর দেওয়া মেডেলটি হয়তো ট্রাম্পের ‘ইগো’-র জন্য একটি মলম রূপে কাজ করবে, কিন্তু তা বিশ্বমঞ্চে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে না। লিখলেন সুজনকুমার দাস

Advertisement

বাংলা সিনেমার দর্শক মাত্রই জানেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ধন্যি মেয়ে’ ছবিতে ফুটবল কাপ নিয়ে সেই মজাদার লড়াইয়ের কথা। কলকাতার ‘সর্বমঙ্গলা ক্লাব’ আর হাড়ভাঙা গ্রামের ফুটবল দলের মধ্যে ম্যাচ যখন মান-সম্মানের লড়াইয়ে দঁাড়ায়, তখন ‘কাপ জেতা’-র চেয়েও বড় হয়ে ওঠে ‘কাপের দখল’ নেওয়া। হাড়ভাঙা গ্রামের জমিদারের চরিত্রে জহর রায় ফুটবল কাপটি নিজেদের দখলে রাখার জন্য কি না করেছেন! রেফারির ভূমিকায় রবি ঘোষকে ঘুষ দেওয়ার অঙ্গীকার থেকে শুরু করে খেলায় নিশ্চিত শোচনীয় পরাজয় বুঝে খেলা ভেস্তে দেওয়া, আরও কত কী! এমনকী, কাপ পরিবারের মধ্যে রাখার মরিয়া চেষ্টায় নিজের ভাগনির সঙ্গে জোর করে সর্বমঙ্গলা ক্লাবের প্রধান খেলোয়াড় ‘বগলা’-র বিয়ে পর্যন্ত দিয়ে দেন বন্দুকের নলের সামনে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘নোবেল আকাঙ্ক্ষা’ আর এই বছরের শান্তি নোবেল প্রাপক মারিয়া কোরিনা মাচাদোর কাছ থেকে ‘নোবেল মেডেল’ উপহার নেওয়ার ঘটনাটি দেখলে মনে হয়, ট্রাম্প যেন সেই সিনেমার জহর রায়ের চরিত্রটি– যিনি মূল খেলায় গোল করতে না পারলেও ট্রফি বগলদাবা করে বাড়ি ফিরতে মরিয়া। সিনেমায় ‘ফুটবল কাপ’-টি শেষ পর্যন্ত আবেগের প্রতীক হয়ে থাকলেও, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এই ‘মেডেল দখল’ এবং পরবর্তী গ্রিনল্যান্ড হুমকি বিশ্ব রাজনীতিতে অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ট্রাম্প হয়তো মেডেলটি হাতে পেয়েছেন, কিন্তু নরওয়ের নোবেল কমিটির রেফারিরা বঁাশি বাজিয়ে জানিয়ে দিলেন, এভাবে ‘ম্যান অফ দ্য ম্যাচ’ হওয়া যায় না। পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন– নোবেল পুরস্কার হস্তান্তরযোগ্য নয়।

বারাক ওবামা ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মাথায় যখন নোবেল পান, তখনই ট্রাম্পের মনে এই পুরস্কারের প্রতি এক ধরনের ‘প্রতিযোগিতামূলক আকাঙ্ক্ষা’ তৈরি হয়েছিল বলে অনুমান করা যেতে পারে। তঁার আক্ষেপ– সহজ মাঠে খেলেই ওবামা যদি নোবেল পেয়ে যান, তবে তিনি আব্রাহাম অ্যাকর্ডস বা উত্তর কোরিয়ার মতো কঠিন পিচে এত ‘ড্রিবলিং’ করে কী পেলেন? ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, যেখানে তিনি একের পর এক বড় বড় শক্তির সঙ্গে ডিল করে ‘যুদ্ধের সম্ভাবনা’ আটকে দিয়েছেন, সেখানে রেফারির বঁাশি বারবার তঁাকেই ‘অফসাইড’ করে দিয়েছে। এই অবজ্ঞার জ্বালা থেকেই ২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক রূপ। তঁার দাবি, কয়েক মাসের ব্যবধানে ৮টিরও বেশি যুদ্ধ থামিয়েও যখন তিনি গ্যালারির করতালি বা নোবেলের মেডেল পাচ্ছেন না, তখন তিনি সরাসরি ‘শান্তির বাধ্যবাধকতা’ ত্যাগের ঘোষণা দিচ্ছেন। প্রসঙ্গত, ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ নাকি তিনিই থামিয়েছেন বলে বারবার দাবি করছেন, যদিও ভারত তা স্বীকার করেনি, মন্তব্য দেয়নি।

​নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরকে পাঠানো ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বার্তাটি বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে, নরওয়ে তাকে ‘নোবেল’ না দেওয়ায় তিনি আর মনপ্রাণ দিয়ে ‘শান্তি’-র কথা ভাবতে বাধ্য নন। এই ক্ষোভকে তিনি সরাসরি গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের হুমকির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন। ট্রাম্পের দর্শন অনুযায়ী, ‘শান্তিরক্ষা’ কোনও নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি ‘ট্রানজাকশন’ বা বাণিজ্যিক লেনদেন। পুরস্কার দিলে শান্তি থাকবে, না দিলে অশান্তির পথে হঁাটা হবে– এমন হুমকি আধুনিক কূটনীতির ইতিহাসে নজিরবিহীন। এটি যেন কোনও শক্তিশালী প্রতিবেশীর জমি দখলের এক অদ্ভুত ‘নৈতিক অজুহাত’ তৈরি করার চেষ্টা।

​২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো যখন নিজের মেডেল ট্রাম্পকে উপহার দিলেন, তখন সেটিকে কেবল একটি সৌজন্য বিনিময় বললে মস্ত বড় ভুল হবে। এটি ছিল ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের (মাদুরোকে অপসারণ) এক ধরনের কৃতজ্ঞতা স্বীকার। ইতিহাসের পাতায় এটি একটি বিতর্কিত দৃষ্টান্ত হিসাবেই থাকবে।

ইতিহাসবিদরা এখানে ১৯৪৩ সালের কলঙ্কিত একটি ঘটনার ছায়া দেখছেন। নরওয়ের লেখক নাট হামসুন সাহিত্যে ১৯২০ সালে যে নোবেল মেডেল পেয়েছিলেন, ১৯৪৩ সালে সেই মেডেল তিনি হিটলারের সহযোগী প্রোপাগান্ডা প্রধান জোসেফ গোয়েবল্‌সকে দিয়েছিলেন। হামসুনের সেই কাজ যেমন নোবেল লরিয়েট রূপে তঁার মর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল, নরওয়ের রাজনীতিবিদেরা ট্রাম্পের এই মেডেল গ্রহণকে সেই ‘অ্যাবসার্ড’ ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি বলে মনে করছেন। তঁাদের মতে, নোবেল শান্তি পুরস্কার রাজনৈতিক তোষণের প্রতীক নয়। নোবেল ফাউন্ডেশন এবং নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি অত্যন্ত কঠোরভাবে স্পষ্ট করেছে যে, ‘The Nobel Prize and the Laureate Are Inseparable’। অর্থাৎ, মেডেলটি একটি ধাতব বস্তু রূপে ট্রাম্পের ড্রয়ারে বা হোয়াইট হাউসের শো-কেসে শোভা পেতে পারে, কিন্তু তিনি কখনওই ‘নোবেল লরিয়েট’ রূপে স্বীকৃত হবেন না। আলফ্রেড নোবেলের উইল এবং কমিটির প্রথা অনুসারে, এই সম্মান ‘হস্তান্তরযোগ্য’ নয়। অতএব ট্রাম্প মেডেলটি ফ্রেমে বঁাধিয়ে যতই প্রচার করুন না কেন, রেফারি কিন্তু আগেই ‘অফসাইড’ ডাক দিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে ট্রাম্পের এই মেডেল প্রাপ্তি আন্তর্জাতিক মহলে কোনও আইনি বা নৈতিক ভিত্তি পাচ্ছে না।

তবে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড হুমকি কেবল নোবেল না-পাওয়ার অভিমান নয়, এর নেপথ্যে রয়েছে গভীর স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ। চিন এবং রাশিয়ার আর্কটিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প এই দ্বীপটিকে আমেরিকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে চান। নোবেল না-পাওয়ার হতাশাকে তিনি এই আগ্রাসী পথে হঁাটার একটি ‘পাবলিক রিলেশন’ স্টান্ট রূপে ব্যবহার করছেন। তিনি বিশ্বকে বার্তা দিচ্ছেন: ‘তোমরা আমাকে শান্তির জন্য পুরস্কৃত করতে ব্যর্থ হয়েছ, তাই এখন আমি পেশি প্রদর্শনের পথ বেছে নিচ্ছি।’ ডেনমার্ক এবং নরওয়ের মতো নর্ডিক দেশের কাছে এটি সরাসরি সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত বলেই প্রতীয়মান।

এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে বড় পরাজিত পক্ষ হল নোবেল শান্তি পুরস্কারের ‘মর্যাদা’। ট্রাম্প যখন দাবি করেন যে, তঁাকে পুরস্কার না দিলে তিনি আর ‘শান্তির কথা ভাববেন না’, তখন তিনি মূলত শান্তিস্থাপনকে একটি পণ্যে পরিণত করেন। বাকি বিশ্বের কাছে ব্যাপারটা হাস্যকর ও পাগলামি বলে মনে হলে মাচাদোর দেওয়া মেডেলটি হয়তো ট্রাম্পের ‘ইগো’-র জন্য একটি মলম রূপে কাজ করবে, কিন্তু তা বিশ্বমঞ্চে তঁার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে না। বরং এটি নোবেল পুরস্কারের সেই নিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যা দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে সযত্নে লালন করা হয়েছে।

ইতিহাস হয়তো মাচাদোকে একজন ‘নোবেল লরিয়েট’ রূপেই মনে রাখবে, কিন্তু ট্রাম্পের এই ‘মেডেল দখল’ এবং গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নর্ডিক দেশদের হুমকি দেওয়– একটি রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেলিং বলেই বিবেচিত হবে। শান্তির স্বীকৃতি কখনও দান বা উপহার রূপে পাওয়া যায় না, এটি অর্জন করতে হয়। আর, ট্রাম্পের বর্তমান আগ্রাসী ভাষা তঁাকে সেই অর্জন থেকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। ‘ধন্যি মেয়ে’ সিনেমার শেষে দুই দল মানুষের মধ্যে আনন্দের মিলন ঘটলেও, ট্রাম্পের এই নোবেল-নাটক কিন্তু বিশ্বশান্তির জন্য বড় কোনও ট্র্যাজেডির ইঙ্গিত দিচ্ছে। কারণ, যখন কোনও সর্বোচ্চ পরাশক্তির রাষ্ট্রপ্রধান পুরস্কারের নেশায় বিশ্বব্যবস্থাকেই হুমকির মুখে ফেলেন, তখন সেটি আর খেলা থাকে না, হয়ে ওঠে এক ভয়ানক ভূ-রাজনৈতিক সংকট।

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement