কলকাতায় শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ছে বিষাদময় শৈত্যকে ভালবাসার মতো রোম্যান্টিক বাঙালিও, যারা চায় শীত আরও দীর্ঘস্থায়ী হোক। কিন্তু শীতের কুয়াশা ভালবাসে, তাতে নিহিত রোমান্টিকতাকে মনেপ্রাণে আদর করতে পারে– এমন বাঙালির সংখ্যা সত্যিই বিরল।
অধিকাংশ বাঙালিই রবীন্দ্রপূজারি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ঋতুদর্শনে বাঙালির তেমন সময় ও সাড়া আছে বলে মনে হয় না। বর্ষার ইলিশ নিয়ে বাঙালির মাতামাতি আছে বটে। কিন্তু ঘনঘোর বর্ষার প্রাবল্য রবীন্দ্রনাথ যেভাবে অাজীবন উপভোগ করেছেন, অধিকাংশ বাঙালির মধে্য সেই নিরবচ্ছিন্ন বর্ষাপ্রেম আছে বলে মনে হয় না। গ্রীষ্মে শান্তিনিকেতনে অসহনীয় তাপপ্রবাহ থেকে বাঙালি পালাতে পারলে বঁাচে।
কিন্তু এসি-হীন, এককালে ইলেকট্রিক পাখাহীন রবীন্দ্রনাথ সেই তাপপ্রবাহ উপভোগ করার জন্য গ্রীষ্মেও কলকাতায় আসতেন না। শীতের প্রতিও রবীন্দ্রের কোনও নালিশ নেই। কিন্তু এই বছর শীত যেই না একটু বাড়াবাড়ি করেছে অমনি বাঙালি জবুথবু, তারা কঁাপছে, এবং শীত আরও বাড়তে পারে শুনে আতঙ্কিত। বাঙালি এবং বাঙালির সংবাদপত্র, কেউ-ই কিন্তু তেমনভাবে চাইছে না যে শীত যেন আরও জবরদস্ত হয়ে আসে। আসুক না দার্জিলিংয়ের শীত কলকাতায়, মন্দ কী! অথচ, এই ‘অমঙ্গল’ চিন্তা মাথায় আসাই উচিত নয়, এই ভাবনার সঙ্গে অধিকাংশ বাঙালিই একমত হবে।
তবে এমন বাঙালিও আছে, এবং তাদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, যারা চায় শীত আরও দীর্ঘস্থায়ী হোক বাংলায়। এবং আরও বাড়ুক শীতের প্রকোপ। এই যে শীতের আকাশ মেঘলা, ঘরের মধে্য একটা সঁ্যাতসেঁতে ভাব, সেই বিষাদময় শৈত্যকে ভালবাসার মতো রোমান্টিক বাঙালিও কোথা থেকে যেন এসে পড়েছে আমাদের মধে্য!
একটা সময় শীত পড়তে না পড়তেই শহরের পাড়ায় পাড়ায় কানঢাকা বঁাদুড়ে-টুপি পরা বাঙালির দেখা মিলত। এখন তাদের সংখ্যা শুধু কমেইনি, জব্বর শীতে আধুনিক বাঙালি দার্জিলিং-কাশ্মীর-অরুণাচল, সব চষে ফেলছে। কিছু বাঙালি কি লাচেন বা কেলং বা কারগিলেও বেড়াতে যাচ্ছে না? কিংবা মংপুতে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিসৌধর সিঁড়িতে বসে আইসক্রিমে কামড় বসাতে বসাতে ছবিতে ভরিয়ে দিচ্ছে না ফেসবুক– শীতজয়ের বিক্রমবার্তা দিয়ে?
শীতজয়ী বাঙালি বাড়লেও, শীতের কুয়াশা ভালবাসে, তাতে নিহিত রোমান্টিকতাকে মনেপ্রাণে আদর করতে পারে– এমন বাঙালির সংখ্যা সতি্য বিরল। কুয়াশা দৃশ্যমানতা কমিয়ে দেয়। চেনা পৃথিবী কেমন যেন অচেনা হয়ে যায়। প্রবল শৈতে্যর সঙ্গে নেমে আসে অদ্ভুত আবছায়া। বহুতলগুলো পরিণত হয় ভৌতিক কায়ায়। কিংবা একেবারে যায় মিলিয়ে। শীতের এই আবছামির সুররিয়্যালিস্টিক রোম্যান্টিকতার আবেদন সম্ভবত এখনও বেশিরভাগ বাঙালির কাছে তেমনভাবে পৌঁছয়নি। শীতের মেঘ-বৃষ্টি-কুয়াশাও কি এসেছে বাঙালির প্রেমের কবিতায়, তেমনভাবে? এই প্রসঙ্গে উত্তম-সুচিত্রার প্রথম ঘন প্রেমের ছবি ‘অগ্নিপরীক্ষা’র কথা মনে পড়ে। দার্জিলিংয়ে কুয়াশার মধে্য উত্তম শুনলেন সুচিত্রার মুখে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের সেই কালজয়ী গান, ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু’। বাংলা সিনেমায় সেই বোধহয় কুয়াশার প্রথম সেলিব্রেশন। এরপর বাঙালির প্রেমে কুয়াশাকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি! বাঙালি-প্রণয় কুয়াশার আড়াল ভালবেসেছে অবশ্যই।
