নেপাল ‘পরিবর্তন’ চেয়েছে। তাই ঘটল রাজনৈতিক পালাবদল। বলেন্দ্র শাহ ও আরএসপি ঝড়ে বেসামাল বাম-সহ সব রাজনৈতিক দল।
‘যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতে’। নেপালের সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফলাফল শুধুমাত্র রাজনৈতিক পালাবদলই নয়, এটি এক-অর্থে প্রজন্মের ক্ষোভ, হতাশা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত প্রকাশ। ভোটাররা স্পষ্টভাবে একটি অপেক্ষাকৃত নতুন রাজনৈতিক শক্তির হাতে ক্ষমতার ভার তুলে দিয়েছে। মাত্র চার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) যে বিপুল জনসমর্থন পেয়েছে, তা নেপালের রাজনীতিতে নজিরবিহীন।
কেপি শর্মা ওলি, পুষ্প কমল ধামাল এবং শের বাহাদুর দেউবা– এই তিনজন নেতাকে ঘিরেই দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ক্লান্তির প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে তরুণদের নেতৃত্বে এক অভূতপূর্ব আন্দোলনে নেপাল কেঁপে ওঠে। জেন-জেড প্রজন্মের সেই প্রতিবাদ ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্নীতি, স্বজনপোষণ এবং পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সরাসরি চ্যালেঞ্জ। সেই আন্দোলনের চাপেই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন ওলি এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নেন সুশীলা কার্কি। তাঁর নেতৃত্বে স্বল্প সময়ের মধ্যে তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া নেপালের গণতন্ত্রের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
তবে এই নির্বাচনের প্রকৃত নাটকীয়তা তৈরি হয়েছে আরএসপি-র উত্থানে। দলটির ভাগ্য বদলে যায় বলেন্দ্র শাহ রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসায়। এক সময়ের র্যাপ-শিল্পী থেকে রাজনীতির ময়দানে আসা এই তরুণ নেতা ২০২২ সালে কাঠমান্ডু শহরের মেয়র নির্বাচনে নির্দল প্রার্থী হিসাবে জয়ী হয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনায় এসেছিলেন। চলতি বছরে তিনি আরএসপি-তে যোগ দিয়ে দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হন। নির্বাচনে নিজের শক্ত ঘঁাটি ঝাপাতে প্রবীণ নেতা ওলিকে প্রায় ৫০ হাজার ভোটে হারিয়ে তিনি কার্যত নেপালের নব প্রজন্মের রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে ওঠেন।
নতুন নেতৃত্বের সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। বলেন্দ্র শাহ-র মেয়র হিসাবে কাজের সময় কিছু সমালোচনাও উঠেছিল। বিশেষত শাহর পরিচালনায় তঁার কিছু সিদ্ধান্তকে অনেকেই ‘অতিমাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর’ এবং ‘গরিব-বিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। ফলে তঁার নেতৃত্বে গঠিত সরকার যদি একই ধরনের প্রশাসনিক দূরত্ব বজায় রাখে, তাহলে পরিবর্তনের প্রত্যাশা দ্রুত হতাশায় পরিণত হতে পারে। নেপালের ভোটাররা এই নির্বাচনে যে-বার্তা দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে, তারা পুরনো ক্ষমতার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে নতুন পথ খুঁজতে চায়। কিন্তু সেই নতুন পথ কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারবে, তা নির্ভর করবে আরএসপি সরকারের নীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক সংযমের উপর। বিপুল জনসমর্থন যেমন সুযোগ এনে দেয়, তেমনই তা দায়িত্বও বাড়ায়।
