সদ্য সুপ্রিম কোর্টের নিষ্কৃতি মৃত্যুর রায়ের পর চিন্তাভাবনা শুরু– ভারতে এই সংক্রান্ত আইন আনা সম্ভব কি না। অপব্যবহার হবে নো তো!
ভারতীয় সংবিধানে ‘নিষ্কৃতি মৃত্যু’-র উল্লেখ নেই। যদিও সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার যেমন জায়েজ, তেমনই মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুও তার অন্তর্ভুক্ত। অতীতে নিষ্কৃতি মৃতু্যর আরজি একাধিকবার খারিজ করে সুপ্রিম কোর্ট। তবে বছর বত্রিশের হরিশ রানার নিষ্কৃতি মৃত্যু প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রায় ফের বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জায়গা তৈরি করেছে।
প্রশ্ন উঠছে, জীবন থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার বা চাওয়ার অধিকার কতটা গ্রহণযোগ্য? কারণ, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ। থাকছে অপব্যবহারের আশঙ্কাও। একটি বিষয় মনে রাখা দরকার। যখন কোনও মানুষের পক্ষে আর চিকিৎসায় সেরে ওঠার সম্ভাবনা থাকে না, চিকিৎসা শাস্ত্র যখন উন্নত জীবনের আশা দিতে পারে না, তখন স্বেচ্ছামৃত্যুর আবেদন করা যেতেই পারে। আর শুধু সেই ব্যক্তিমানুষ নন, নিকট পরিজনেরাও অসহায় অবস্থায় তিলে তিলে শেষ হয়ে যান। মানসিকভাবে এবং আর্থিকভাবে। তাই হাসপাতালের অনৈতিক মুনাফা লাভের হাত থেকেও পরিবারের নিষ্কৃতি প্রয়োজন।
জীবন থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার বা চাওয়ার অধিকার কতটা গ্রহণযোগ্য? কারণ, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ। থাকছে অপব্যবহারের আশঙ্কাও।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরই চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছে, ভারতে নিষ্কৃতি মৃত্যু সংক্রান্ত আইন আনা সম্ভব কি না। কিন্তু আইন তৈরি হলেও তার অপব্যবহার রুখে সঠিক প্রয়োগ হবে কি না, সেটাও মাথায় রাখা জরুরি। সংশ্লিষ্ট রোগীর পরিজন চাইলেই শুধু হবে না, বিশেষজ্ঞ কমিটি, আইনজীবী, প্রশাসনের সমান দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে। যাতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মানবাধিকার লঙ্ঘিত না হয় বা কোনওভাবে পরিবার-পরিজনের অসৎ উদ্দেশ্য সাধিত না হয়। যাচাই করে দেখতে হবে এই মৃত্যুতে কেউ অনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে কি না পরিজনদের কোনও অভিসন্ধি আছে কি না।
তবে সবার আগে মাথায় রাখতে হবে, সারা জীবন যিনি সম্মানের সঙ্গে বেঁচেছেন, কোনওভাবেই তাঁকে যেন পরিজনের বোঝা হয়ে অসম্মানের শিকার হতে না হয়। মনে রাখতে হবে, সারা জীবন চিকিৎসা না-করানো বা কোনওভাবেই সুস্থ হতে না-পারলে মৃত্যুকে বেছে নেওয়া মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তাকে সম্মান জানানো উচিত। বহু চিকিৎসকও মনে করেন, যারা মারণ রোগের শিকার ও নিদারুণ শারীরিক-মানসিক ষন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটায়, তাদের মর্যাদার সঙ্গে নিষ্কৃতি দেওয়াই শ্রেয়। কিন্তু বাদ সাধে আইন, আমাদের দেশের প্রচলিত ব্যবস্থা। অথচ বিশ্বের বহু দেশেই নিষ্কৃতি মৃত্যু আইনসিদ্ধ।
বহু চিকিৎসকও মনে করেন, যারা মারণ রোগের শিকার ও নিদারুণ শারীরিক-মানসিক ষন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটায়, তাদের মর্যাদার সঙ্গে নিষ্কৃতি দেওয়াই শ্রেয়। কিন্তু বাদ সাধে আইন, আমাদের দেশের প্রচলিত ব্যবস্থা।
সুপ্রিম কোর্ট পরোক্ষে নিষ্কৃতি মৃতু্যকে কার্যত মান্যতা দেওয়ায় মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ে দেশ এক ধাপ এগেল। এই উত্তরণকে এবার আইনি পথে সুপ্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন। ‘নিষ্কৃতি মৃত্যু’-র মধ্যে যে গরিমা ও উচ্চস্থানাঙ্কের অনুভব নিহিত রয়েছে, তার সম্মান আমাদের সকলকেই রাখতে হবে।
