ধ্বংসের প্রতীক বুলডোজার। যার তলায় গুঁড়িয়ে যাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, মানবিকতা। আর সেই বুলডোজার কিনা ভাল লাগছে ছোটদের!
কখনও কখনও পরিস্থিতি এমন হচ্ছে, কী শহরের চেহারায়, বেআইনি বিপণি কিংবা বাড়ির আধিপত্যে, কী সামাজিক স্খলনে, কী রাজনৈতিক অহংকার, অনাচার, অত্যাচারে, কী নৈতিক উন্মার্গগামিতায় যে, মনে হয়, অন্তরের সমস্ত নিষেধ সত্ত্বেও, আমাদের হয়তো বুলডোজার ছাড়া আর উপায় নেই। বুলডোজারের ব্যাপ্ত ও অমোঘ ধ্বংসলীলা কোনও সুস্থ সমাজ ও শাসনব্যবস্থা চায় না। কিন্তু অন্যায়ের অচলায়তন ভাঙতে হয়তো শেষ পর্যন্ত বুলডোজারের নাম না নিয়েও উপায় থাকে না। কলকাতার খেলনার দোকানে নাকি ক্রমশ বাড়ছে বুলডোজারের চাহিদা। বুলডোজারের তর্জন ও নেশা নাকি শিশুদের খেলায় ক্রমে জাঁকিয়ে বসছে। বিচিত্র পর্যায়ে খেলা ভাঙার খেলা ইদানীং রাজনীতিতেও ক্রমিক ব্যাপ্তি অর্জন করছে।
খেলা ভাঙার খেলা, খেলার ছলে এমন ধ্বংসলীলার কথা ভাবতে পেরেছিলেন ৬২ বছরের রবীন্দ্রনাথ। এবং চমকে দেওয়ার মতো আইরনি হল, এই গানটি তাঁর ‘মায়ার খেলা’ গীতিনাট্যের শেষ গান রূপে সংযুক্ত করেছিলেন। এই গানের বার্তা এবং আহ্বান নাটকের অন্তরকথা। এবং আশ্চর্যের বিষয়, যে-নাটকের নানা বসন্ত কিংবা মায়ার খেলা, তার শেষ গানে রবীন্দ্রনাথ ডাক দিলেন, খেলা ভাঙার খেলার। সুখের বাসা ভেঙে বেরিয়ে আসার ডাক।
বুলডোজারের তর্জন ও নেশা নাকি শিশুদের খেলায় ক্রমে জাঁকিয়ে বসছে। বিচিত্র পর্যায়ে খেলা ভাঙার খেলা ইদানীং রাজনীতিতেও ক্রমিক ব্যাপ্তি অর্জন করছে।
ওই গানেই রবীন্দ্রনাথ বলছেন, বসন্ত কালেই, চারিদিকে মায়ার খেলার পরিবহে, ঝড়ের মেঘের ধ্বজা ওড়ে, হঠাৎ শুরু হয় কালবৈশাখীর নাচন। গানের শেষ দুই পঙ্ক্তিতে রবীন্দ্রনাথ ডাক দিচ্ছেন, জীবনের সামান্য হাসি-কান্নাকে অবলীলায় পায়ে ঠেলে, মরণ-বাঁচনের নাচ নাচতে আয়। অর্থাৎ আমাদের বেঁচে থাকার বাস্তবের মধ্যেই, যখন মনে হচ্ছে জীবন কী রঙিন সুখের, এবং চারিধারে বসন্ত জাগ্রত দ্বারে, তখনও যে কোনও মুহূর্তে কালবৈশাখী আসন্ন। এবং জীবন কোনও সময়েই বিপন্নতা মুক্ত নয়। নেপথ্যে সবসময় শুনতে পাওয়া যায় বুলডোজারের অনিবার্য আগমন ধ্বনি। প্রাচীন গ্রিকরা বুঝেছিল সবথেকে ভাল– বুলডোজারের অন্য নাম ‘নেমেসিস’, আমাদের পাওয়ার ফল, অন্যায়ের শাস্তি। বেঁচে থাকার বুননের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনিরুদ্ধ বুলডোজার। পালানোর পথ নেই।
মানুষ যুগে যুগে বুলডোজারের রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। মানুষের সমস্ত আন্দোলন, সমস্ত বিপ্লব, এবং স্বাধীন ভাবনার জন্য সমস্ত প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত বুলডোজারের বিরুদ্ধে লড়াই। আমরা এমন একটা সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছি, যা অনিশ্চিত, যা বিপন্নতা আক্রান্ত, এবং কোনটা ঠিক পথ, কোনটা ঠিক নয়, তা নির্ণয় করাও যেন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। তার একটা কারণ, নানা ভাবে মানুষ বিচিত্র অস্তিত্বের সংকট ও চাপে অস্থির হয়ে পড়ছে। মানুষ কি সত্যি তার আদর্শে স্থির থেকে, তার জীবনকে গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছে? অস্তিত্বের এই অহরহ চাপও কি নয় প্রত্যহের বুলডোজার? যার তলায় প্রতিদিন গুঁড়িয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন, আদর্শ, মূল্যবোধ, এমনকী সততা এবং মানবিকতা!
