অবলা প্রাণীদের প্রতি আমাদের প্রাণ কাঁদে, কিন্তু বাজারে, চোখের সামনে, প্রাণীহত্যা দেখে, আমাদের হৃদয় কাঁপে ? রুচিবোধ আহত হয়?
পৃথিবীর অধিকাংশ সভ্য দেশে চোখের সামনে প্রাণীহত্যা বা পাখি, এমনকী জীবন্ত মাছ কাটা শুধু অসহনীয় দৃশ্যই নয়, তা শাস্তিযোগ্য সামাজিক অপরাধ। আমাদের দেশে প্রতিদিন হাজার হাজার প্রাণীহত্যা হয় চোখের সামনেই। অবলা প্রাণীদের নিয়ে আমাদের লোক-দেখানো আতিশয্যের অভাব নেই। এই আতিশয্য কখনও-কখনও ন্যাকামি পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। কিন্তু বাজারে প্রতিদিন চোখের সামনে পাঁঠা, মুরগি, মাছের রক্তস্রোত বইতে থাকে। তাতে কারও কিছু যায়-আসে বলে মনে হয় না।
এ-কথা ঠিক, চোখের সামনে খাসিহত্যা হয়তো হয় না। মাংসের দোকানে বা বাজারে এই কাণ্ডটা একটা আড়াল টেনে ঘটানো হয়। কিন্তু আমরা পরমতৃপ্তিতে মাংসের দোকানে টাটকা হত্যা করা খাসি কিনি, যার গলা দিয়ে তখনও রক্তের ফোঁটা ঝরছে। আর মুরগির মাংস কেনার সময় তো মুরগিকে আমরা প্রাণী বলেই মনে করি না। তার মাথা কাটা থেকে ছটফট করা অঙ্গের পালক ছাড়ানো, আমাদের চোখের সামনেই ঘটে। বরফে রাখা মৃত মাছ কিনে আমরা ততটা তৃপ্ত হই না। জীবন্ত মাছ জলের গামলা থেকে তুলে তার মাথা কেটে আঁশ ছাড়াতে দেখে আমরা যারপরনাই হ্রাদিত হয়ে থাকি।
জ্যান্ত মাছ চোখের সামনে কাটিয়ে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি, ভাবটি আমাদের বিশেষ আনন্দ দেয়। মনে মনে বলি, মাছটা যে টাটকা এবং বিশেষ স্বাদ ও পুষ্টির, সন্দেহ নেই। যে-বাচ্চারা বাবা-মা'র সঙ্গে এ-দেশে বাজারে যাওয়ার আনন্দ পায়, তারা যে চোখের সামনে প্রাণীহত্যা এবং রক্তপাত দেখে অন্তত প্রাথমিক 'শক' পায় না, তাদের ভিতরটা কেঁদে ওঠে না, এমন নয়। কিন্তু সেই 'ন্যাকামি' তারা প্রকাশ করলে মানসিক দুর্বলতার জন্য তিরস্কৃত হয়। এবং তারাও কালে কালে কঠিন ও অভ্যস্ত হয়ে ওঠে নিত্য চোখের সামনে প্রাণীহত্যা ও রক্তপ্রবাহের প্রতি। মুরগি বা মাছের মৃত্যুতে তারা আর কোনওভাবেই স্পৃষ্ট হয় না। মাছ বা মুরগির গলা কাটলে যে ওদেরও লাগতে পারে এমন ভাবনার জায়গাই থাকে না তাদের মনে, অন্তত আমাদের দেশে। যেসব মুরগিকে কাটা হবে, তাদের শহরের রাস্তায় সাইকেলে মাথা নিচু করে ঝুলিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এবং তাদের গায়ে কামড় বসানোর জন্য পথকুকুররা তাড়া করে যাচ্ছে- এমন দৃশ্য লন্ডন বা নিউ ইয়র্কে দেখা অসম্ভব।
কিন্তু প্রাণীর এই বেদনা ও দুর্দশা আমাদের মনে বিন্দুমাত্র দয়ামায়া জাগায় না। এমনকী, রুচিবোধকেও আহত করে না। কারও কারও হয়তো মনে পড়ে রোয়াল্ড ডালের লেখা এক ভয়ংকর ছোটগল্প, যেখানে এক তরুণ ঢুকে পড়ে এক গরু-ভেড়ার স্লটারহাউজে। আচমকা তার পা আটকে যায় একটা ফাঁসে। মুহূর্তে উলটে যায় তার দেহ। মাথা উপরে পা নিচে, সে ঝুলতে ঝুলতে এগিয়ে যেতে থাকে। গলা কাটার অমোঘ যন্ত্রের দিকে। উল্টো দৃষ্টিতে সে দেখতে পায় তার সামনে সারিবদ্ধ মানব-মানবী এগিয়ে চলেছে, মাথা উপরে পা নিচে, স্লটার মেশিনের সামনে। ডালের বিদ্রূপ ও বোধ আমাদের মধ্যেও হয়তো কাউকে-কাউকে কাঁপিয়ে দিতে পারে।
